ছবি : সংগৃহীত
শীতের মৌসুমে বাজারে পাওয়া যায় রকমারি ফল। এর মধ্যে পুষ্টিগুণে ভরপুর ফল কমলালেবু, জলপাই ও আমলকীর জুড়ি মেলা দায়। এসব ফল শীতকালে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখা ভীষণ জরুরি। কারণ প্রতিটি ফলের মধ্যে রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, এসব ফলের উপকারিতা সম্পর্কে—
আমলকী
আমলকী একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ভেষজ ফল, যা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ‘অমৃতফল’ হিসেবে পরিচিত। এটি বিশেষ করে ভিটামিন সি'র একটি শক্তিশালী উৎস এবং বহু রোগপ্রতিরোধের প্রাকৃতিক ক্ষমতা রয়েছে।
এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে, যা শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে এবং ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এ ছাড়া হজমশক্তি উন্নত করতে এবং ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর। এটি কোষ্ঠকাঠিন্য, অ্যাসিডিটি দূর করে এবং হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। প্রতিদিন একটি আমলকী খাওয়ার অভ্যাস সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
প্রতিদিন একটি করে আমলকি খাওয়ার করুন। কারণ আমলকী আপনার স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। বলা হয়, একটি আমলকী ২০টি কমলার সমান ভিটামিন-সি বহন করে থাকে। খেতে পারেন আমলকীর আচার কিংবা মোরব্বা। এই ছোট্ট ফলটি আপনাকে দেবে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার নিশ্চয়তা।
চলুন জেনে নেওয়া যাক আমলকীর বিশেষ কিছু উপকারী গুণাগুণ—
১. চুলের যত্নে আমলকী অপ্রতিদ্বন্দ্বী। আমলকী চুলের গোড়া শক্ত করে এবং অকালে চুল পাকা রোধ করে।
২. হজম শক্তি বৃদ্ধি করে আমলকী। এটি লিভারের কার্যক্ষমতা বাড়ায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে দ্রুত কাজ করে।
৩. আমলকী রক্ত পরিষ্কার করে। এটি রক্ত থেকে টক্সিন বের করে শরীরকে ভেতর থেকে সতেজ রাখে।
৪. চোখের যত্নে আমলকী ভীষণ উপকারী। মধুর সঙ্গে আমলকীর রস মিশিয়ে পান করলে দৃষ্টিশক্তি উন্নত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি চোখের ভেতরের চাপকে হ্রাস করে, দূরের জিনিস দেখতে পায় এবং ছানি পড়তে দেয় না।
৫. বয়সের ছাপ পড়তে দেয় না আমলকী। আর আমলকী শরীরের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে শরীরে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত হাইপারলিপিডেমিয়া বন্ধ করে। মুক্ত কোষগুলো যেমন বলিরেখা ও বয়সের ছোপ পড়ে না।
জলপাই
জলপাই একটি টক স্বাদযুক্ত পুষ্টিকর ফল, যা মূলত এর ঔষধি গুণ ও তেল উৎপাদনের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এটি ভিটামিন, খনিজ ও শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের একটি চমৎকার উৎস। এ ফল সাধারণত হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। জলপাইয়ে থাকা মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমিয়ে হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে। এ ছাড়া পরিপাকতন্ত্রের উন্নতি ঘটায়। এতে প্রচুর পরিমাণে আঁশ (ফাইবার) রয়েছে, যা হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে এবং গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।
জলপাই সাধারণত শীতের শুরু থেকেই বাজারে পাওয়া যায়। টক স্বাদের এ ফলটি দিয়ে মুখরোচক আচার বানিয়ে বছরজুড়ে খেতে পছন্দ করেন অনেকেই। আবার তরকারি ও ডালে টক স্বাদ নিয়ে আসার জন্যও জলপাই বেশ উপাদেয়। টক এ ফলটিতে মেলে উপকারী নানা ধরনের ভিটামিন ও মিনারেল। এটি ভিটামিন-ই এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের চমৎকার উৎস। স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে এর উপকারিতাও অনেক।
চলুন জেনে নেওয়া যাক জলপাইয়ের বিশেষ কিছু গুণাগুণ—
১. হার্টের সুরক্ষা করে জলপাই । একে হার্টের বন্ধু বলা হয়। এতে থাকা মনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট খারাপ কোলেস্টেরল কমিয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এতে থাকা ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁত মজবুত করতেও সাহায্য করে জলপাই।
২. ক্যানসার প্রতিরোধ করে জলপাই। এর ফিনোলিক যৌগ শরীরে ক্যানসার কোষ গঠনে বাধা দেয়।
৩. ত্বক ও চুলের যত্নে জলপাই ভীষণ উপকারী। কালো জলপাইয়ের তেলে রয়েছে ফ্যাটি অ্যাসিড ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা ত্বক ও চুলের যত্নে কাজ করে। জলপাইয়ের তেল চুলের গোড়ায় লাগালে চুলের গোড়া মজবুত হয়। এতে চুল পড়ার সমস্যা দূর হয়।
৪. কালো জলপাই লৌহের বড় উৎস। রক্তের লোহিতকণিকা অক্সিজেন পরিবহন করে। শরীরে লৌহের অভাব হলে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। এ কারণে শরীর দুর্বল হয়।
৫. চোখের যত্নে জলপাই বড় উপকারী। জলপাইয়ে ভিটামিন 'এ' পাওয়া যায়। ভিটামিন 'এ' চোখের জন্য ভালো। যাদের চোখ আলো ও অন্ধকারে সংবেদনশীল, তাদের জন্য ওষুধের মতো কাজ করে জলপাই। এ ছাড়া জীবাণুর আক্রমণ, চোখ ওঠা ও চোখের পাতায় সংক্রমণজনিত সমস্যা দূর করে জলপাই।
কমলালেবু
শীত মৌসুমে বাজারে প্রচুর পরিমাণে কমলালেবু পাওয়া যায়। কমলালেবু দেখতে যেমন চমৎকার, এর পুষ্টিগুণও অনেক বেশি। কমলালেবু শুধু স্বাদে অনন্য নয়, এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ফাইবার, পটাশিয়াম এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। ভিটামিন 'সি' রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং আয়রন শোষণে সহায়তা করে। ১০০ গ্রাম কমলায় প্রায় ৫০ মিলিগ্রাম ভিটামিন 'সি' থাকে। এটি একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর শীতকালীন ফল, যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। এটি ক্যানসার প্রতিরোধ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ত্বকের স্বাস্থ্য রক্ষায় ভীষণ কার্যকরী। এ ছাড়া কমলালেবুতে থাকা ফাইবার হজমে সহায়তা করে এবং পেটের চর্বি কমাতে সহায়তা করে। তাই কমলালেবু খেতে খেতেই শরীরের জন্য করতে পারেন বেশ কিছু উপকার।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, কমলালেবুর কিছু উপকারিতা—
১. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে কমলালেবু। এতে থাকা উচ্চমাত্রার ভিটামিন-সি শরীরকে সাধারণ ফ্লু ও সর্দি-কাশি থেকে রক্ষা করে।
২. ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে তোলে। কারণ এটি অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ হওয়ায় ত্বকের কোলাজেন উৎপাদন বাড়ায়। ফলে ত্বক থাকে টানটান ও সতেজ।
৩. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে কমলালেবু। এতে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত কমলা খেলে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।
৪• টক স্বাদের কমলা খেলে শরীরের চর্বি কমে যায়। তবে শরীরে বেশিমাত্রায় ও অনেক দিনের মেদ জমে থাকলে খুব একটা উপকার পাওয়া যায় না। সদ্য মেদ জমতে শুরু করলে, সেটি ঝরিয়ে ফেলতে বেশ উপকারী কমলালেবু।



