মার্কিন নির্বাচন : এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা, কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ট্রাম্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৭ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে, অনেক আসনের ভোটের ফলাফল শেষ হওয়ার পর বেসরকারি ফলাফলও প্রকাশ করা হয়েছে; আর এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফলে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির অগ্রগতির যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন।
২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি যখন শপথ গ্রহণ করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, সে সময় মার্কিন পার্লামেন্ট কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) উচ্চকক্ষ সিনেট—উভয়কক্ষেই রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন।
বিভিন্ন বেসরকারি উৎস থেকে পাওয়া সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বলছে, হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্রেটিক পার্টির হাতে হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল; সিনেটেও জয়ের পথে আছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। যদি দুই কক্ষই ডেমোক্রেটিক পার্টির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই রিপাবলিকান পার্টির নেতা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়বে।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে এবং প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবগুলোতে নির্বাচন হচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে কোনো দলকে কমপক্ষে ২১৮টি আসন এবং সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে হলে কমপক্ষে ৫১টি আসনে জয়ী হতে হবে।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ১০৩টি আসনের বেসরকারি ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। সেখান থেকে জানা গেছে, ৭১টি আসনে জয়ী হয়েছেন বর্তমান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা এবং এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ৩২টি আসনে।
আর সিনেটের যে ৩৫টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে ১৬ টির বেসরকারি ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। সেই ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেচে, ১১টি আসনে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা, বাকি ৫টিতে এগিয়ে রিপাবলিকানরা।
মার্কিন রাজনীতি ও নির্বাচন বিশ্লেষকদের উল্লেখযোগ্য অংশের মতে, ডেমোক্র্যাটরা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সম্ভবত সিনেটেরও নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এটি ঘটলে ওয়াশিংটনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়তে পারে এবং প্রেসিডেন্সির বাকি ২ বছরেরও বেশি সময়ে তার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে খর্ব হতে পারে।
রিপাবলিকান পার্টি হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ হারালে ডেমোক্র্যাট জনপ্রতিনিধিরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আইনি এজেন্ডাগুলোকে আটকে দেওয়ার ক্ষমতা পাবেন এবং প্রেসিডেন্ট ও তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্ত শুরু করার সুযোগ পাবেন। সিনেটেও যদি রিপাবলিকানদের পরাজয় ঘটে, তাহলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সক্ষমতা হুমকির মুখে পড়বে।
এই নির্বাচনটি ট্রাম্পের প্রতি এক ধরনের জাতীয় গণরায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে রিপাবলিকানদের প্রতি জনমত তীব্রভাবে নেতিবাচক হয়ে উঠছে।
০৩ নভেম্বর প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোটের পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উভয় কক্ষই রিপাবলিকানদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদে মাত্র তিনটি আসন এবং সিনেটে নিট চারটি আসন জয় করা প্রয়োজন।
কেন্টাকি ও ইন্ডিয়ানায় ভোটকেন্দ্রগুলো বন্ধ হতে শুরু করলে ওয়াশিংটনে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিস সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘একটি নাটকীয় পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে’ দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি বলেন, “আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যেখানে ডেমোক্র্যাটরা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নিজেদের হাতে তুলে নিতে যাচ্ছে।”
ট্রাম্প গত বছর ক্ষমতায় ফিরে আসার সময় দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি, শুল্ক বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার শুরু করা সংঘাতের কারণে জ্বালানির মূল্য বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক চাপের মুখে আছেন মার্কিনিরা।
৮০ বছর বয়সী ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বা ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং’ বর্তমানে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি ওঠানামা করছে, এই রেকর্ড ইতোমধ্যেই তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্টে পরিণত করেছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ভোটার টেলর কুক এএফপিকে জানান, জীবনযাত্রার ব্যয় বহনযোগ্য রাখা এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা—এই দুটি বিষয়ই এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
২৪ বছর বয়সী এই ভোটার বলেন, “বাড়ি ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, ইউটিলিটি বিল, সম্পত্তি কর—সবই ক্রমাগত বাড়ছে। আমি কংগ্রেসে এমন প্রতিনিধি চাই, যারা সত্যিই এই ব্যয় কমানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।”
অর্থনৈতিক অসন্তোষ
মঙ্গলবার প্রেমিডেন্ট ট্রাম্প ভোটারদের উদ্দেশ্যে টেলিভিশনে সরাসরি ফোন-ইন বার্তার মাধ্যমে ট্রাম্প নিজের শাসনামলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তার দাবি—অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন করে গড়ে তুলেছেন তিনি।
ফক্স টেলিভিশনের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, “আমাদের আমেরিকাকে মহান রাখতে হবে। আমরা এখন মহান অবস্থানে আছি। অথচ দুই বছর আগেও আমাদের অবস্থা ছিল শোচনীয়।”
রিপাবলিকানরা জোর দিয়ে বলছেন যে, ট্রাম্পের কর হ্রাস এবং অভিবাসনবিরোধী অবস্থান ভোটারদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। একই সঙ্গে তারা ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের ‘বামপন্থী উগ্রবাদী’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছেন—এমন বার্তা কিছু ভোটারের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলেও মনে হচ্ছে।
মিয়ামির বাসিন্দা কলম্বীয় বংশোদ্ভূত ৭০ বছর বয়সী ভোটার মারু রেস্ট্রেপো এএফপিকে বলেন, “ডেমোক্র্যাটরা আগে ভালো ছিল, কিন্তু এখন তারা পুরোপুরি সমাজতান্ত্রিক হয়ে গেছে।”
ট্রাম্প রিপাবলিকানদের প্রার্থীদের সহযোগিতার জন্য প্রচার চালিয়েছেন, বিভিন্ন প্রচারণা সভায় উপস্থিত হয়ে ভাষণ দিয়েছেন; তবে জনমত জরিপ বলছে, উল্টো তাঁর উপস্থিতির কারণেই হয়তো রিপাবলিকানরা খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সোমবারের জনসমক্ষে নিজের সর্বশেষ প্রচারণা-ভাষণে উপস্থিতিতে ট্রাম্প নির্বাচনের বিষয়ে প্রায় কিছুই বলেননি; বরং ওয়াশিংটনের ‘রিফ্লেক্টিং পুল' সংস্কারের সময় যে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছিল, তা নিয়েই দীর্ঘ ও অসংলগ্ন আলোচনা করেছেন।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, “তিনি যা যা প্রয়োজন ছিল তার সবই করেছেন। চার সপ্তাহ আগের তুলনায় রিপাবলিকানরা এখন অনেক ভালো অবস্থানে আছেন।”
তবে সিনেটের ডেমোক্র্যাটিক জনপ্রতিনিধি ও বিরোধীদলীয় নেতা চাক শুমার ট্রাম্পের শেষ ভাষণটিকে ‘শোচনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন।
ফলাফল নিয়ে বিতর্ক?
এই মুহূর্তে প্রাথমিকভাবে এগিয়ে থাকলেও ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য সিনেটে জয়লাভ করা একটি অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫৩-৪৭ ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তবে চলমান ক্ষুব্ধ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে লড়াইটি কানসাস, টেক্সাস, আইওয়া, ওহাইও এবং আলাস্কার মতো রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আসন ধরে রাখার লড়াই করতে হচ্ছে। এর মধ্যে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্য; সেখানে দলের অভ্যন্তরীণ তীব্র বিরোধের জেরে কংগ্রেসনেত্রী হ্যালি স্টিভেন্স সিনেটের ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদের পরিবর্তে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন জানিয়েছেন।
‘ডিসিশন ডেস্ক এইচকিউ’ এর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা ২৪১টি এবং রিপাবলিকানরা ১৯৪টি আসন পেতে পারে। এছাড়া সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা ৫২-৪৮ ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই নির্বাচনী প্রচারণায় রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের পেছনে ১১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। এছাড়া ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণায় প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছেন।
এমন আশঙ্কাও প্রবল যে, রিপাবলিকানরা যদি নির্বাচনে পরাজিত হন, তবে তারা ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করতে পারেন। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের পরাজয় উল্টে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তিনি বারবার ব্যাপক ভোটার জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন এবং কোনো প্রমাণ ছাড়াই ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে কারচুপির অভিযোগ এনেছেন।
মঙ্গলবার নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি হাউস নির্বাচনে ভোটিং মেশিনে ত্রুটি দেখা দেয়। এর ফলে ডানপন্থী প্রভাবশালীদের অনেকে ভিত্তিহীন জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন, যদিও স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে প্রতিটি ব্যালটই গণনা করা হবে।
সূত্র : এএফপি



