ব্রাজিলে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় বসছেন বামপন্থী লুলা দা সিলভা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৬ এএম
সাও পাওলোতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল প্রকাশের পর সমর্থকদের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। সঙ্গে আছেন ফার্স্ট লেডি রোসাঞ্জেলা দা সিলভা ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেরাল্ডো আলকমিন। ছবি: এএফপি
ব্রাজিলের প্রবীণ বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়ে জিতে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি তার ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেছেন।
এটি লুলার চতুর্থ নির্বাচনী বিজয়। এর আগে ২০০৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি টানা দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সবশেষ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি ক্ষমতায় ফেরেন।
বিবিসির খবরে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
রোববার অনুষ্ঠিত রান-অফ নির্বাচনের জয়যাত্রা লুলার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। গত ৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত প্রথম দফার ভোটে লুলার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন বলসোনারো। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে সেই ফলাফল উল্টে দেওয়া লুলার পক্ষে সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান ছিলেন।
পাশাপাশি, ল্যাটিন আমেরিকার বর্তমান রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই জয় পেয়েছেন তিনি। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে এই অঞ্চলের দেশগুলোতে ভোটাররা ক্ষমতাসীনদের প্রত্যাখ্যান করে ডানপন্থী দলগুলোর দিকে ঝুঁকছে। বর্তমানে আর্জেন্টিনা, চিলি ও কলম্বিয়ার মতো বড় দেশগুলোতে রক্ষণশীল নেতারাই রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছেন।
প্রথম দফার পরাজয়ের পর লুলার নির্বাচনী প্রচারণায় নতুন গতি সঞ্চার হয়, যার পেছনে ছিল দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো প্রচারণা।
সাবেক এই কারখানা শ্রমিক ১৯৮৯ সালে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের লড়াইয়ে নামার পর থেকেই ব্রাজিলের বামপন্থী রাজনীতির প্রধান ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তবে ২০০৩ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় বসার পর বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তার জন্য সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৭ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন মেয়াদে লুলাকে দেশ ও বিদেশের নানা জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈরী মনোভাব তার জন্য অন্যতম বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
কলম্বিয়া বা হন্ডুরাসের মতো অন্যান্য দেশের ডানপন্থী প্রার্থীদের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ফ্লাভিও বলসোনারোকে সমর্থন না দিলেও এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ২১ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে ট্রাম্প প্রশাসন একজন রক্ষণশীল নেতাই চেয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রান-অফ ভোটের প্রাথমিক ফলাফল ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন লিবারেল পার্টির (পিএল) প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। ছবি: এএফপি
ল্যাটিন আমেরিকাকে নিজেদের প্রভাববলয় মনে করে হোয়াইট হাউস। তাই প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের নীতি সমর্থন করে এমন নেতারাই ক্ষমতায় থাকুক, এটিই ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের প্রত্যাশা। এ ছাড়া পশ্চিম গোলার্ধে চীনের প্রভাব কমাতেও তারা বেশ আগ্রহী।
তেলসমৃদ্ধ এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরল খনিজ সম্পদের ভাণ্ডার ব্রাজিলে লুলার জয় দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রমী ঘটনা। কারণ লুলার বিজয়ের পর একমাত্র বড় দেশ হিসেবে ব্রাজিলই এখন ডানপন্থী শাসনের বাইরে থাকল। তাছাড়া, লুলার চীন-ঘেঁষা নীতিও ওয়াশিংটনের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ।
ফ্লাভিও বলসোনারো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ব্রাজিলকে ওয়াশিংটনের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবেন। বিপরীতে, লুলা কড়া ভাষায় সতর্ক করেন, নির্বাচনে যেন যুক্তরাষ্ট্র নাক না গলায়।
হোয়াইট হাউসে লুলার বিজয় নিয়ে হতাশা থাকলেও পরিবেশবাদীরা এই ফলাফলে স্বস্তি পেয়েছেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, বলসোনারো জয়ী হলে ব্রাজিলের প্রভাবশালী কৃষি ও খনি ব্যবসায়ীরা আরও বেশি ক্ষমতা পেয়ে যাবে।
লুলার সমর্থকেরা উচ্ছ্বাসে মাতলেও নির্বাচনের ফল বলছে, দেশটি চরমভাবে দ্বিধাবিভক্ত। প্রায় ৪৮ শতাংশের বেশি ভোটার বলসোনারোকে বেছে নিয়েছেন। এই বিভাজন মেটানো লুলার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তার ওপর, ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ডানপন্থী কংগ্রেসের মোকাবিলা করতে হবে তাকে। এবারের নির্বাচনে বলসোনারোর লিবারেল পার্টি সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছে।
তবে এসবের মধ্যেও লুলার ওয়ার্কার্স পার্টি তৃণমূল পর্যায়ে বিশাল জনসমর্থন ও সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। নির্বাচনকে লুলা ‘ব্রাজিলের ভাগ্য পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তিনি বিভেদ দূর করে ‘নতুন ধারার সরকার’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নতুন এই শাসনব্যবস্থা কেমন হবে, তার বিস্তারিত না জানালেও তিনি একটি ন্যায্য ও সুযোগসমৃদ্ধ দেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তবে প্রতিকূল কংগ্রেসের কারণে লুলার জন্য এই লড়াই আগের তিন মেয়াদের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হবে। চতুর্থ মেয়াদের শেষে তার বয়স হবে ৮৫ বছর।
এদিকে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার বিজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ব্রাজিলের পরাজিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো। নির্বাচনে পাবলিক পরিবহনের সমস্যার কারণে ভোটগ্রহণের সময়সীমা বাড়ানোয় অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি এই ফল প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ব্রাসিলিয়া থেকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বলসোনারো বলেন, ‘এই ফলাফল মেনে নেওয়া অসম্ভব।’ সেই সঙ্গে তিনি পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিও তুলেছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।



