Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

দুই পা হারিয়ে ৮ মাস লুকিয়ে ছিলেন গর্তে—ইউক্রেনীয় সেনার বেঁচে ফেরার অবিশ্বাস্য গল্প

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৯ পিএম

দুই পা হারিয়ে ৮ মাস লুকিয়ে ছিলেন গর্তে—ইউক্রেনীয় সেনার বেঁচে ফেরার অবিশ্বাস্য গল্প

ড্রোন হামলায় এক পা উড়ে গেছে, অন্য পাটিও বাঁচাতে নিজেই ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেছেন। এরপর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি স্কুলের বয়লারঘরের নিচে ছোট্ট গর্তে কেটেছে টানা আট মাসেরও বেশি সময়। চারপাশে শত্রুর ড্রোন, উদ্ধারে গেলেই মৃত্যুর ঝুঁকি—এমন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। কিন্তু মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা সেই সেনাকেই শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করল বিশাল এক উড়ন্ত ড্রোন। মাটি থেকে ৭০ মিটার ওপরে ঝুলিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে। 

ইউক্রেনীয় সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকোর (৪৯) এই অবিশ্বাস্য উদ্ধার অভিযানটি গত ৪ অক্টোবর সম্পন্ন হয়। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, পাঁচ বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এটিই কোনো সেনাকে আকাশপথে ড্রোনের সাহায্যে উদ্ধারের প্রথম  ঘটনা।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি হাসপাতালে শুয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান ভ্লাসেনকো। তার দুই পায়ের কাটা অংশ তখনও ব্যান্ডেজে মোড়ানো।

তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে আগেই মৃত ভেবে নিয়েছিলাম। জানতাম, আর কোনো আশা নেই।’

ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য ভ্লাসেনকো গত বছরের মে মাসে খারকিভ অঞ্চলের একটি সম্মুখসারির অবস্থানে দায়িত্ব পালন করতে যান। সেখানে তার সঙ্গে ছিলেন ‘বাসকি’ সাংকেতিক নামের আরেক সেনাসদস্য।

ছোট্ট একটি মাটির বাংকারে তাদের থাকতে হতো। প্রতিদিন ড্রোনের মাধ্যমে খাবারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল।

কিন্তু ওই অবস্থান থেকে সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। ভ্লাসেনকোর ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে প্রতিস্থাপন করতে যাওয়া দুই সেনা নিহত হন। পরে তাদের মরদেহ উদ্ধারে যাওয়া আরও দুই সেনাও প্রাণ হারান।

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, এটাই সম্ভবত সবকিছু বদলে দেওয়ার মুহূর্ত। এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’

প্রায় ১০ মাস একসঙ্গে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাদের বাংকারে পানি ঢুকে পড়ে। বাধ্য হয়ে তারা আশ্রয় নেন কাছের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল ভবনে।

সেখানে শুকনো কাপড় ও খাবারের একটি প্যাকেট সংগ্রহ করতে বাইরে বের হলে তাদের শনাক্ত করে রাশিয়ার একটি নজরদারি ড্রোন। এরপর হামলা চালায় আরেকটি রুশ ড্রোন। হামলায় নিহত হন বাসকি—সেদিন ছিল তার ৫০তম জন্মদিন।

বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পায়ের পাতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন ডান পায়েও।

চলাফেরার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলা ভ্লাসেনকো আশ্রয় নেন স্কুলের পুরোনো বয়লারের নিচে থাকা প্রায় ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার আকারের একটি গর্তে।

ধীরে ধীরে তার বাঁ পায়ের ক্ষতস্থানের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। ডান পায়ের নিচের অংশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। হাড় বেরিয়ে এসেছিল বাইরে।

একপর্যায়ে বেঁচে থাকার তাগিদে কঠিন সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নিজের ছুরি দিয়ে ডান পায়ের পাতাও কেটে ফেলেন এবং রক্তপাত বন্ধ করতে টুর্নিকেট ব্যবহার করেন।

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমাকে পায়ের পাতাটি কেটে ফেলতেই হয়েছিল। সেটি আমার পেছনে টেনে টেনে চলছিল। হাড়ও ক্রমেই আরও বেশি বেরিয়ে আসছিল।’

তার ভাষায়, ‘তখন আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট ছিল না।’

আট মাসেরও বেশি সময় গর্তে বন্দিজীবন

ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলের নিচে সেই ছোট্ট গর্তে প্রায় আট মাস আটকে ছিলেন ভ্লাসেনকো। ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে তার মোট অবস্থানের সময় ছিল ৪৯১ দিন।

এলাকাটি পরিচিত ‘কিল জোন’ নামে। কারণ, আকাশজুড়ে অসংখ্য ড্রোন টহল দেওয়ায় সেখানে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। আহত সেনাদের পিকআপ বা সাঁজোয়া যান দিয়ে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

ইউক্রেনীয় সেনারা মাটিতে চলাচলকারী চালকবিহীন যান ব্যবহার করেও উদ্ধার অভিযান চালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ভ্লাসেনকোর কাছে পৌঁছানোর জন্য পাঠানো দুটি যানই রুশ ড্রোনের হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়।

উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা ‘অ্যালেক্স’ সাংকেতিক নামের এক কর্মকর্তা জানান, একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল, ভ্লাসেনকোকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।

ঠিক তখনই তাদের নজরে আসে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান গুরজুফ ডিফেন্সের তৈরি একটি নতুন ভারী মালবাহী ড্রোন।

ছয় প্রপেলারের বিশাল ড্রোনে উদ্ধার

ড্রোনটির ছয়টি উল্লম্ব রোটর এবং কালো কাঠামো দেখতে বিশাল কোনো পোকামাকড়ের মতো। এটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে।

দীর্ঘদিন সম্মুখসারিতে থাকার কারণে ভ্লাসেনকোর ওজন কমে আনুমানিক ৭০ কেজিতে নেমে এসেছিল বলে ধারণা করেছিলেন কর্মকর্তারা। ফলে ড্রোনটি দিয়ে তাকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

তবে অভিযানটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বড় আকারের ইউক্রেনীয় ড্রোন প্রায়ই রাশিয়ার ছোট এফপিভি ড্রোনের হামলার শিকার হয়। এসব ড্রোনের সাহায্যে দূর থেকে বসেই সরাসরি দৃশ্য দেখে আক্রমণ চালাতে পারেন চালকেরা।

অক্টোবরের শুরুর দিকে ভ্লাসেনকোর কাছে নিয়মিত সরবরাহের প্যাকেটের সঙ্গে পৌঁছায় একটি বিশেষ নিরাপত্তা বেল্ট বা হারনেস এবং নির্দেশনামূলক ভিডিওসহ একটি ফোন। তিনি বুঝতে পারেন, তাকে উদ্ধারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

ঝুঁকি সম্পর্কে জানলেও তার সামনে আর কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না।

পরদিন, ৪ অক্টোবর, সেখানে পৌঁছায় বিশাল ছয় প্রপেলারের ড্রোনটি। ভ্লাসেনকো একটি ক্যারাবিনারের সাহায্যে ড্রোনের উইঞ্চে ঝোলানো হারনেসের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এরপর ড্রোনটি তাকে প্রায় ৭০ মিটার বা ২৩০ ফুট উচ্চতায় তুলে নেয়।

উদ্ধার অভিযানে মূল ড্রোনটির সঙ্গে ছিল আরও তিনটি ছোট ছয় প্রপেলারের ড্রোন। এগুলোর কাজ ছিল রুশ আক্রমণকারী ড্রোনগুলোকে বিভ্রান্ত করা।

এ ছাড়া চারটি ইউক্রেনীয় এফপিভি ড্রোন দল, কামান এবং বড় স্থির-পাখার ড্রোন দিয়ে রুশ ড্রোনের পরিচিত অবস্থানগুলোতে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে হামলা চালানো হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল শত্রুপক্ষের আক্রমণ ঠেকিয়ে উদ্ধার অভিযানের পথ নিরাপদ করা।

সব শঙ্কা কাটিয়ে প্রায় ১৫ মিনিটের উড়ান শেষে ভ্লাসেনকোকে বহনকারী ড্রোনটি নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছায়। নিরাপত্তার কারণে সেই স্থানের সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেনি ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী।

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা

দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা ভ্লাসেনকোর জন্য এই উদ্ধার ছিল অবিশ্বাস্য এক পরিবর্তন। যে মানুষটি একসময় নিজের বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তিনিই শেষ পর্যন্ত আকাশপথে ফিরে এলেন নিরাপত্তার আশ্রয়ে।

তবে ড্রোনে ঝুলে আকাশে ওড়ার সময়ও ভয় তাকে ছাড়েনি। এত বিপদের মধ্যেও তার সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল পানিতে পড়ে যাওয়া।

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছিলাম না যে কোথাও বনের মধ্যে পড়ে যাব। কিন্তু পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল, কারণ আমি সাঁতার জানি না।’

রয়টার্স জানিয়েছে, ভ্লাসেনকোর অভিজ্ঞতার বিবরণ ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী ও উদ্ধারকারী ড্রোনে থাকা ক্যামেরার ভিডিওর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তার বর্ণনার সব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সংবাদমাধ্যমটি।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন