বাইরে তেলাপোকা, ভেতরে ঘুণ! দীর্ঘ লড়াইয়ে মোদি-শাহ, আরএসএস-বিজেপি, বিরোধী-জেন জি?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৪ পিএম
কথায় আছে ‘মশা মারতে কামান দাগা’। কিন্তু, দিল্লিতে তেলাপোকা মারতে কী দাগালেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ? অথবা, তেলাপোকা দমনে কী ‘দাওয়াই’ দিলো বিজেপি সরকার? মোদি-শাহের তেলাপোকাবিরোধী লড়াই শেষ, নাকি শুরু?
সবাই জানেন যে, গত ১০ অক্টোবর তেলাপোকায় ভয় না পাওয়া নরেন্দ্র মোদি দিল্লির বিশাল অংশ ‘সিলগালা’ করে দিয়েছিলেন, যাতে মাছিও ঢুকতে না পারে। তার বাসভবনের সামনের সড়ক বন্ধ ছিল বলে নিন্দুকেরা দেখতে পায়নি—‘৫৬ ইঞ্চি’ ছাতির প্রধানমন্ত্রীর ঘরের দরজা-জানালাও বন্ধ ছিল কিনা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে জানা গেল—দিল্লির রাজপথে ‘তেলাপোকা’ খুঁজতে ড্রোন উড়িয়েছিল অমিত শাহের নিয়ন্ত্রণে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কোথাও একটি বা দুটি ‘তেলাপোকা’ দেখলেই সেখানে ছুটে গিয়েছিল ১০০ বা ২০০ পুলিশ।
আরও জানা যায়—নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের দমনে বিজেপি সরকার মোতায়েন করেছিল নানান বিভাগের সশস্ত্র বাহিনী। পুলিশের পাশাপাশি আধা সামরিক বাহিনীও নেমেছিল আরশোলা দমনে। তাদের কাজ ছিল গণতান্ত্রিক উপায়ে মত প্রকাশকারীদের ‘টুঁটি’ চেপে ধরা।
গত ১১ অক্টোবর ভারতীয় দৈনিক আনন্দবাজার থেকে জানা যায়—দিল্লিতে অনলাইনভিত্তিক অরাজনৈতিক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভের দিন, অর্থাৎ ১০ অক্টোবর সারাদিনে ৭ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করে পুলিশ।
সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের দিল্লির বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের ভেতর নারী পুলিশ কর্মকর্তাদের দিয়ে অভিনব কায়দায় আটক করা হয়। দেশটির মানুষ এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখেননি। কেননা, কখনো এমনভাবে কোনো দাগি আসামিকেও ধরতে অভিযান চালায়নি ভারত সরকার, মন্তব্য মোদিবিরোধীদের।
‘যন্তর মন্তর’ গেল জাতিসংঘে, কোটি মানুষের ঘরে
একইদিনে আনন্দবাজার জানায়—দিল্লির পরিস্থিতি নিয়ে ১০ অক্টোবর রাতেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল জাতিসংঘ।
এরপর নয়াদিল্লি বার্তা দেয়—‘ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এটা অবান্তর হস্তক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই নয়।’
কড়া ভাষায় বিশ্বের শীর্ষ সংস্থাটিকে পরামর্শ দিয়ে নয়াদিল্লি আরও বলে, ‘নিরপেক্ষতা ও পক্ষপাতহীনতার যে দায়িত্ব জাতিসংঘের রয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের উচিত বিশ্বের অন্যত্র সংগঠিত বিক্ষোভগুলোর দিকেও সমান নজর দেওয়া।’
বিবৃতিতে ভারত সরকার দাবি করে, তারা বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ। তাদের সংবিধান শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার সবাইকে দিয়েছে। আরও দাবি করা হয়—ভারতে বিচারব্যবস্থা স্বাধীন, সংবাদমাধ্যমও স্বাধীন।
সমালোচকদের অনেকের দৃষ্টিতে, মোদি সরকারকে এখন নিজের ‘ঢোল’ নিজেকেই পেটাতে হচ্ছে। কারণ, আরশোলারা তাদের অহিংস প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মাধ্যমে মোদি-শাহকে শুধু জাতির কাঠগড়ায় তোলেনি, জাতিসংঘের চৌকাঠও পার করে দিয়েছে।
গত ১০ অক্টোবর মধ্যরাতে ভারতবাসী যখন ঘুমাতে যান, তখন বৈশ্বিক গণমাধ্যমগুলোয় ‘আরশোলাদের ওপর ভারতের মোদি সরকারের দমনপীড়ন’-এর খবর শীর্ষ শিরোনাম হিসেবে জ্বলজ্বল করছিল।
প্রতিবেদনগুলোয় তুলে ধরা হয়েছিল, ভারত সরকার কীভাবে দিল্লিকে দুর্ভেদ্য করে রেখেছিল। তারা কীভাবে নিরীহ বিক্ষোভকারীদের গণহারে আটক করেছে।
সেদিন বিজেপিপন্থি অনেককেই বলতে শোনা যায়—আরশোলাদের আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। তবে তা কতটা ‘ব্যর্থ’ হয়েছে এর ব্যঙ্গাত্মক জবাব পাওয়া গেল এক জেন জি বিক্ষোভকারীর কথায়। সেই বিক্ষোভকারী এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘হাজারো মানুষের কাছ থেকে যন্তর মন্তরের রাস্তা আটকে রেখে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ যন্তর মন্তরকেই কোটি কোটি মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন।’
দিল্লিতে ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ তৈরি করে মোদি-শাহ-বিজেপি বুঝিয়ে দিলো তরুণ-যুবাদের আন্দোলনকে কতটা আমলে নেওয়া হয়েছে—এমন মন্তব্যও করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
দিল্লিতে ‘চম্বলের ডাকাত’?
গত ১০ অক্টোবর ‘ভারতের আরশোলাদের বিক্ষোভে পুলিশি দমনের সময় বিবিসি কী দেখলো’ এমন এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমটি জানায়—বিক্ষোভের জন্য সরকারিভাবে নির্ধারিত স্থান যন্তর মন্তরকে পুলিশ ‘দুর্গের মতো দুর্ভেদ্য’ বানিয়ে রেখেছে।
প্রতিবেদনটি থেকে আরও জানা যায়—আরশোলা দমনে সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৪০ হাজার সদস্যকে মোতায়েন করেছিল। সংঘাতপ্রবণ রাজ্য ও সীমান্ত এলাকা থেকে আধা সামরিক বাহিনীদের দিল্লি আনা হয়েছে।
দিল্লির রাজপথে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়েছে। গণপরিবহনগুলোর বিশাল অংশ বন্ধ রাখা হয়েছিল। ইন্টারনেটও বন্ধ ছিল।
মাইক দিয়ে বারবার সতর্ক করা হচ্ছিল কেউ যেন জমায়েত না করেন। দিল্লির কেন্দ্রস্থলে পদে পদে ব্যারিকেড ও পুলিশি প্রহরা ছিল।
বিক্ষোভে যোগ দিতে আসা এক ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমটির কাছে প্রশ্ন রাখেন, সরকার যদি নিজেকে ‘সঠিক’ মনে করে তাহলে ট্রেন, মেট্রো, বাস—সবকিছু বন্ধ করে দিয়েছে কেন? টেলিফোনে ‘জ্যাম’ কেন?
প্রতিবেদনটিতে আরও জানানো হয়—যারা সমাবেশে অংশ নিতে সমবেত হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তাদের অনেককেই পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। সংবাদমাধ্যমটিকে বিক্ষোভকারীরা পুলিশের বর্বরতার কথা শুনিয়েছেন। একজন বলেছেন, ‘আমার দেশের পুলিশ আমাদের সন্তানদের সঙ্গে এমন নৃশংস আচরণ করছেন।’
সংবাদমাধ্যমগুলোর ভিডিওতে দেখা গেল—সমাবেশে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করা নারী-পুরুষ নির্বিশেষ সবাইকে ধরে পুলিশের সদস্যরা গাড়িতে তুলছে। কোথাও দেখা গেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের টেনে-হিঁচড়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
শুধু বিক্ষোভকারীই নন, যেসব ইউটিউবার এই আন্দোলনের দৃশ্য ধারণ করতে এসেছিলেন, তাদের অনেককে পুলিশ আটক করেছে।
এমন পরিস্থিতিতেও আটক ব্যক্তিদের অনেকে জোর গলায় স্লোগান তুললেন—‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।
এসব দৃশ্য দেখে সিজেপি-প্রধান অভিজিৎ দীপকের মা-বাবা ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, দিল্লিতে এত পুলিশ কেন? এত এত শিক্ষার্থীকে পাকড়াও করা হচ্ছে কেন? তারা আরও প্রশ্ন তোলেন, ‘এই ছাত্ররা কি চম্বলের ডাকাত?’
অনেকেই জানেন—ভারতের মধ্য ও উত্তরপ্রদেশের চম্বল উপত্যকা ডাকাতদের অভয়ারণ্য হিসেবে কুখ্যাত ছিল। সেখানকার এক ডাকাত ফুলন দেবীর নাম এখনো অনেকের মুখে মুখে ফেরে।
দীর্ঘ লড়াইয়ের শুরু?
সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে দিল্লিতে পুলিশি শাসনের দৃশ্য শুধু ভারতবাসীরই নয়, বিশ্ববাসীর দৃষ্টিগোচর হলো। তারা দেখলো—প্রতিবাদ-সমাবেশের কারণে নয়, বরং তা প্রতিরোধে সরকারের নেওয়া কঠোর ব্যবস্থায় কার্যত অচল হয়ে পড়লো ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি।
তাই সেদিন আরশোলাদের ‘যন্তর মন্তর’ অভিযানকে বিজেপি সরকার সর্বশক্তি দিয়ে রুখে দেওয়ার পর অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবি কি মিইয়ে গেল?
সেদিন রাতেই মিললো এমন প্রশ্নের জবাব। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানালো—সিজেপি বলেছে, তারা পিছু হটছে না। তারা আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরছে।
শুধু জ্ঞানেশবিরোধী বিক্ষোভের আয়োজকরাই নন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই বলেছেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
একই দিনে এক বিক্ষোভকারী বিবিসিকে বলেন, ‘যতদিন আন্দোলন চলবে ততদিন এখানে আসার চেষ্টা করবো।’
‘ইজ ইন্ডিয়া সাপ্রেসিং ইয়াং ভোটারস?’—শিরোনামে ডয়েচে ভেলের এক ভিডিও প্রতিবেদনেও এমন চিত্র দেখা গেল।
এদিকে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এগিয়ে এসেছে পরিস্থিতিকে আমলে নিয়ে।
গত ১১ অক্টোবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু’র এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়—সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ধরপাকড় বন্ধ করতে এবং মেট্রো ও ইন্টারনেট খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
একই দিনে ভারতের অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়ে দিলো—রোববারও উত্তপ্ত ছিল দিল্লি। আরশোলা নেতৃত্ব আরও জানিয়ে দিলো—জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা না দেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
বিক্ষোভের দিন দিল্লির অদূরে গাজিয়াবাদ থেকে আসা এক তরুণ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে বলেন, ‘সরকারের বিরুদ্ধে আমরা এক দীর্ঘ লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছি। এটা একদিনের লড়াই নয়। আমরা কী দাবি করছি সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘এই সময়’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ‘শনিতেই শেষ নয়, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে প্রতিদিন দিল্লির যন্তর মন্তরে মিছিল করার ডাক দিয়েছেন সিজেপির নেতা অজিঙ্কা শিন্ডে। নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থলে পৌঁছাতে না পারলেও অন্যত্র প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়েছে সিজেপি।’
তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে, ভারতে নানান বয়সী মানুষের জ্ঞানেশবিরোধী আন্দোলন শেষ তো হয়নি; বরং শুরু হলো মাত্র।
জ্ঞানেশ এখন বিজেপির বোঝা?
গত ১ অক্টোবর ভারতীয় সাংবাদিক অনিকেত চট্টোপাধ্যায় এক পডকাস্টে বলেছিলেন, ‘বিজেপির স্বার্থেই জ্ঞানেশ বিসর্জন অনিবার্য।’
তার মতে, জ্ঞানেশকে ‘বিসর্জন’ দেওয়া ছাড়া বিজেপির আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। তবে জ্ঞানেশকে ‘বলির পাঁঠা’ বানালেও পুরো সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না।
অন্যান্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্যে শোনা গেল—বিজেপির অনেকে মনে করছেন, জ্ঞানেশ এখন দলটির জন্য ‘বোঝা’ হয়ে গেছেন। কেননা, জ্ঞানেশকে নিয়ে বিজেপি যে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছিল তা হয়ে গেছে।
তাদের ভাষ্য: জ্ঞানেশের ‘কল্যাণে’ বিজেপি এখন ভারতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। এখন তাকে তাড়ানো বিজেপির জন্যই মঙ্গলময়। এই সুযোগে বিজেপির উচিত জ্ঞানেশকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
অর্থাৎ, জ্ঞানেশের পদত্যাগ যখন ‘সময়ে দাবি’, তখন সত্যিই কি তা জোরালো হচ্ছে ক্ষমতাসীন বিজেপির অন্দরেও?
গত ২ অক্টোবর দ্য ওয়াল-এর মুখ্য সম্পাদক শঙ্খদীপ দাস এক পডকাস্টে বলেন, ‘জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এটা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য এটা উদ্বেগজনক।’
তার ভাষ্য: বিরোধীরা বার বার বলছে, জ্ঞানেশ কুমার রাজনৈতিক দলের লোকের মতো কথা বলছেন। জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে বিজেপি জবাব দিচ্ছে। জ্ঞানেশ কুমারের আচরণ বিজেপির মুখপাত্রের মতো লাগছে।
‘জ্ঞানেশ কুমার যদি ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদে থাকেন তাহলে, আমি বলবে যে তার ব্যক্তিগত ক্ষতির তুলনায় বিজেপির ক্ষতি বেশি,’ যোগ করেন তিনি।
বিরোধীদের অভিযোগ জ্ঞানেশ কুমার বিজেপির লোক। ‘সত্যি (যদি) জ্ঞানেশ কুমার বিজেপির লোক হন, তাহলে তিনি বিজেপির উপকারে লাগবে না। তার কলমের প্রতিটা আঁচড় নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। মানুষ সন্দেহ করবে,’ মন্তব্য শঙ্খদীপ দাসের।
বাইরে তেলাপোকা, ভেতরে ঘুণ?
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এখন শুধু বাইরের ‘তেলাপোকা’ নয় ভেতরের ‘ঘুণপোকা’ও মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
দ্য ওয়াল-এর মুখ্য সম্পাদক শঙ্খদীপ দাসের মতে: নরেন্দ্র মোদি সরকারের ১৫ বছর হয়ে গেছে। এটা অনেক সময়। এই দীর্ঘ সময়ে সরকারবিরোধী মনোভাব শক্তিশালী হয়। যেকোনো সরকারই যত ভালো কাজ করুক না কেন, সবাইকে খুশি করা যায় না। সবাইকে খুশি করা না গেলে একটা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়।
তাই বিরোধীরা যদি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের আন্দোলন জিইয়ে রাখতে পারে তাহলে তা নির্বাচন কমিশনের জন্য এমনকি, শাসক দলের জন্যও মাথাব্যথার কারণ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে গত ৭ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সাংবাদিক সুব্রত বসু তার এক পডকাস্টের শিরোনামে প্রশ্ন রাখেন—‘৭ মন্ত্রী কি মোদির হাতের বাইরে?’ এতে সিজেপি নেতা সৌরভ দাসের এক টুইট তুলে ধরা হয়। এতে লেখা আছে, বিজেপির বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি দলের প্রতি নাখোশ। তারা ‘দুর্নীতিবিরোধী মামলার’ ভয়ে দল ছাড়তে পারছেন না।
এ ছাড়াও, গত ১০ অক্টোবর শ্রীজা মুখার্জির ‘বাইরের থেকেও মোদির বিপদ বেশি ঘরে’ পডকাস্ট থেকে জানা গেল, বিজেপির এখন ঘরে-বাইরে শত্রু। সেই প্রসঙ্গে তিনি তুলে ধরেন দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর কথা।
সবাই জানেন—গত ২৫ সেপ্টেম্বর এই দৈনিকটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন প্যানেলের পদক্ষেপ নিয়ে গত ১০ মাসে ১৪ বার অভিযোগ জানিয়েছিলেন ২ নির্বাচন কমিশনার। এতে তুলে ধরা হয়, কীভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সংবিধান লঙ্ঘন করে কাজ করেছেন। কীভাবে তার একক সিদ্ধান্ত দেশটির ভোটার তালিকা তৈরিতে প্রভাব ফেলেছিল।
এরপর ফুঁসে ওঠে সারা দেশ।
শ্রীজা মনে করেন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ‘কীর্তি’ প্রথম জনসম্মুখে তুলে ধরেছে; কারণ, আরএসএস-বিজেপির একটি অংশ নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
তিনি মনে করেন, ‘বিপদ একেবারে মোদির ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।’
এর আগেও অন্যদের পডকাস্ট থেকে জানা যায়, অযোধ্যায় অসমাপ্ত রামমন্দির উদ্বোধনকে ঘিরে আরএসএসপন্থি হিন্দু ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বিজেপি তথা নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের সঙ্গে দ্বন্দ্ব ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, বিজেপির একটি অংশও চায় ৭৬ বছর বয়সী নরেন্দ্র মোদি এবার ক্ষমতা ছাড়ুক।
পরিশিষ্ট
জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবির পাশাপাশি অনেক বিক্ষোভকারীর মুখে ভারতে শাসক দলের পরিবর্তনের দাবিও শোনা গেছে। এমন বাস্তবতায় বিজেপির শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছাড়ার দাবিতে খুশি নন অনেকে।
তাই, গতকাল ১২ অক্টোবর কলকাতার রাজপথে আওয়াজ উঠেছে—‘বিজেপি ভারত ছাড়ো’!
সেদিনই ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানালো—জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ চেয়ে দক্ষিণের রাজ্য কেরালার বিধানসভায় প্রস্তাব তোলা হচ্ছে। দিল্লির যন্তর মন্তরকে আর বিক্ষোভস্থল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার ভয়ে আছেন। তিনি রাতে ঘুমাতে পারছেন না।’
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, বিরোধীরা যদি জ্ঞানেশবিরোধী আন্দোলন চলমান রাখতে পারেন, বা একে ‘ধিকি ধিকি’ করে জ্বালিয়ে রাখতে পারেন তাহলে শুধু জ্ঞানেশ নয় মোদি-শাহ-আরএসএস-বিজেপি দেশটির বিরোধী জোট ও আরশোলা-বাহিনী তথা জেন জিদের কাছে ‘নাস্তানাবুদ’ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
তবে, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগেই যে ভারতের সার্বিক পরিস্থিতি শান্ত হবে এমনটি আশা করা যায় কি?



