পানামায় ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প, বড় বিপর্যয় ঘোষণা করলেন প্রেসিডেন্ট
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৭ এএম
৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের আঘাতে রীতিমতো লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে পানামা। তবে এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পে মধ্য আমেরিকার এ দেশটির কোনো অঞ্চল থেকে হতাহতের খবর আসেনি।
গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫৬ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত ১টা) পানামায় আঘাত হানে এই উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ব জরিপ সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের (ইউএসজিস) বরাত দিয়ে জাতীয় জরুরি পরিষেবা সংস্থা ন্যাশনাল সিভিল প্রোটেকশন সিস্টেমের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কম্পণের স্থায়িত্ব ছিল ১ মিনিট এবং ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল এপিসেন্টার ছিল রাজধানী পানামা সিটি থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে হেরেরা প্রদেশের ছোট শহর পিতালেজো আরির্বায়, ভূপৃষ্ঠ থেমে মাত্র ১২ দশমিক ৫ কিলোমিটার গভীরে।
শুরুতে ইউএসজিএস ভূমিকম্পটির মাত্রা ৮.০ বলে ধারণা করেছিল, তবে পরে তা সংশোধন করে ৭.৭ নির্ধারণ করে।
ভূপৃষ্ঠের অগভীর অংশে এপিসেন্টার হওয়ায় কম্পণের মাত্রাও ছিল তীব্র। ৭৫ হাজার ৪১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশ পানামার জনসংখ্যা ৪৬ লাখ ২৭ হাজার। ন্যাশনাল সিভিল প্রোটেকশন সিস্টেমের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ শুক্রবারের ভূমিকম্পের ধাক্কা অনুভব করেছেন।
প্রাথমিক ভূমিকম্পের পর বেশ কয়েকটি পরাঘাতও (আফটারশক) হয়েছে পানামায়। দেশটির ভূ-বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ৮০টিরও বেশি পরাঘাত রেকর্ড করেছে, যার মধ্যে একটির মাত্রা ছিল ৬.০-এর বেশি।
সামাজিক যোগাযোগামাধ্যমে পোস্ট ও ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিওিচিত্রে দেখা গেছে, পানামা সিটির বহুতল ভবনগুলো থেকে মানুষ পড়িমরি করে বেরিয়ে আসছেন।
৪৬ বছর বয়সী সালোমন অ্যান্ডিয়ন এএফপি-কে বলেন, “আমি ভয় পেয়েছিলাম, কারণ কম্পনটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী। আলমারি, বিছানা এবং রান্নাঘরের সব ভারী জিনিসপত্র কাঁপছিল।" আফটারশকের (মূল ভূমিকম্প-পরবর্তী কম্পন) কারণে দ্বিতীয়বারের মতো নিজের ১৫ তলা ভবন থেকে বেরিয়ে আসার পর তিনি এ কথা বলেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ২০ তলারও বেশি উঁচু একটি ভবনের ছাদের সুইমিং পুল থেকে পানি নিচে পড়ছে।
আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, পানামা খালের ওপর একটি সেতু তীব্রভাবে কাঁপছে, তবে যানবাহন চলাচল অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও সেটি অক্ষত ও দাঁড়িয়ে আছে।
পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো বলেন, “আমরা একটি বড় ধরনের দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছি।” তিনি আরও জানান, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি রাস্তা ধসে পড়ায় সড়ক যেগাাযোগ নেটওয়ার্কের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
মধ্য কোকলে প্রদেশের পেনোনোমে শহরের একটি দোকানের ক্যাশিয়ার ৩৮ বছর বয়সী জুয়ানা আলভিও এএফপি-কে বলেন, “এটি ছিল ভয়াবহ, এমন অভিজ্ঞতা আমাদের আগে কখনো হয়নি। আমার মেয়ে স্কুলে আটকা পড়েছিল।”
বিশ্বের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কৃত্রিম বাণিজ্য জলপথ পানামা খাল এই পানামার ভূখণ্ডে অবস্থিত। ভূমিকম্পের পর পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। পানামা খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কারণে প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরকে সংযোগকারী এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়নি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফার্নান্দো বয়েড জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের কারণে হেরেরা, কোকলে এবং লস সান্তোস— এই তিন প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ায় লস সান্তোসের টোনোসি শহরটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
“আমরা আকাশপথে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কারণ স্থলপথে যাওয়া অসম্ভব”, এএফপিকে বলেছেন ফার্নান্দো বয়েড।
ভূমিকম্পের পর পানামা সিটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। দেশটির বেসামরিক বিমান পরিষেবা কর্তৃপক্ষ সিভিল অ্যারোনেটিক্স অথরিটির কর্মকর্তারা বলেছেন, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বেশ কয়েকটি ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়।
প্রতিবেশী কলম্বিয়া, ইকুয়েডর ও গুয়াতেমালা ইতোমধ্যে সংহতি প্রকাশ করে সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছে পানামার সরকারকে।
সূত্র : এএফপি, এনডিটিভি



