শিশু নিরাপত্তায় ব্যর্থ হওয়ায় মেটার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় রায়
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪২ এএম
শিশুদের জন্য নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের ঝুঁকি সম্পর্কে জনসাধারণকে সতর্ক করতে ব্যর্থ হওয়ায় মেটাকে নতুন করে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একটি আদালত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্টটির বিরুদ্ধে শিশু নিরাপত্তা ইস্যুতে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় রায়।
এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, নতুন ৫৬৭ মিলিয়ন ডলারের সঙ্গে আগের ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের জরিমানাও যুক্ত হয়েছে। ফলে এই মামলায় মেটার বিরুদ্ধে মোট জরিমানার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪২ মিলিয়ন ডলার। বিচারক মেটার কার্যক্রমকে একটি কারখানার সঙ্গে তুলনা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মেটার বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট হচ্ছে পণ্য, আর শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন শোষণ হচ্ছে সেই কারখানার ‘দূষণ’, যা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
তবে মেটা আদালতের রায়ের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে আপিল করার কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তারা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের নিরাপদ রাখতে কাজ করে এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট ও অপরাধীদের শনাক্ত ও অপসারণের জটিলতা সম্পর্কে স্বচ্ছ রয়েছে।
ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং থ্রেডসের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। প্রতিষ্ঠানটির একজন মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা এই রায়ের সাথে দ্বিমত পোষণ করি এবং রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব।’ নিউ মেক্সিকোর মামলাটি শুরু হয় ২০২৩ সালে। অঙ্গরাজ্যটির অ্যাটর্নিরা অভিযোগ করেন, মেটার প্ল্যাটফর্মগুলো শিশুদের যৌন হয়রানি, যৌন কনটেন্ট এবং যৌন অপরাধীদের সংস্পর্শে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
মামলার প্রথম পর্যায়ে আদালত দেখতে পায়, নিউ মেক্সিকোর ‘আনফেয়ার প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট’ বারবার লঙ্ঘন করেছে মেটা। প্রতিষ্ঠানটির সুপারিশ অ্যালগরিদম তরুণ ব্যবহারকারীদের ক্ষতিকর কনটেন্ট ও ক্ষতিকর ব্যক্তিদের দিকে পরিচালিত করেছে বলেও মনে করেন আদালত।
দ্বিতীয় পর্যায়ের রায়ে বিচারক বলেন, মেটার প্ল্যাটফর্মের কারণে সৃষ্ট ক্ষতির মাত্রা ‘পাবলিক নিউসেন্স’-এর পর্যায়ে পৌঁছেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শিশু, পরিবার, স্কুল, হাসপাতাল এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ওপরও সামাজিক বোঝা তৈরি করে বলে আদালত উল্লেখ করেন।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, নতুন তহবিলের প্রায় ৪২০ মিলিয়ন ডলার শিশুদের ইতিমধ্যে হওয়া ক্ষতির চিকিৎসায় ব্যয় করা হবে। এর মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণগত চিকিৎসার জন্য ক্লিনিক্যাল প্রোগ্রাম ও পেশাজীবীদের অর্থায়ন করা হবে। শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক প্রশিক্ষণেও ব্যয় করা হবে জরিমানার এসব অর্থ।
এ ছাড়া আদালত মেটাকে একাধিক নতুন নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী কোনো ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট যেন প্রাপ্তবয়স্কদের কাছে সুপারিশ না করা হয় এবং কোনো প্রাপ্তবয়স্ক যেন অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীকে বার্তা পাঠাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের নগ্ন ছবি বা ভিডিও পাঠানো ও গ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি শিশু যৌন শোষণে জড়িত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে ‘ওয়ান-স্ট্রাইক’ নীতি চালুর নির্দেশ দেওয়া দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের জন্য ‘লাইক’ সংখ্যা সরিয়ে ফেলা, রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত এবং স্কুল চলাকালে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত পুশ নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে মাসে সর্বোচ্চ ৯০ ঘণ্টা ব্যবহারের সীমা নির্ধারণের নির্দেশও দেয়া হয়েছে।
মেটা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শিশু নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে হাজারো মামলার মুখোমুখি। নিউ মেক্সিকোর রায়ের পাশাপাশি চলতি বছর লস অ্যাঞ্জেলেসেও একই ধরনের একটি মামলায় প্রতিষ্ঠানটি হেরেছে। আগামী সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ায় মেটার বিরুদ্ধে আরেকটি বড় মামলার বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে প্রায় ৩২টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শিশুদের গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছেন।



