ট্রাম্পের ‘শেষ সুযোগ’ আর ‘শেষ’ হয় না
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
ইরানকে একের পর এক ‘শেষ সুযোগ’ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কখনো সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন, কখনো বলেছেন শান্তিচুক্তি একেবারে দোরগোড়ায়। আবার শেষ মুহূর্তে সেই হুমকি থেকে সরে গিয়ে যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু এত কূটনৈতিক নাটকীয়তার পরও ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি হয়নি। বরং সংঘাত দীর্ঘ হয়েছে। দুই দেশের অবস্থান আরও জটিল হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম যৌথ হামলা শুরু হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। যুদ্ধের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য তেহরানকে আলটিমেটাম দেন। তিনি হুমকি দেন, প্রণালি খুলে না দিলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালাবে। তবে দুই দিন পরই তিনি হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করেন। কারণ হিসেবে জানান, আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। ২৬ মার্চ নতুন সময়সীমা ঘনিয়ে এলে আবারও হামলা ১০ দিনের জন্য পিছিয়ে দেন। এবার তার দাবি ছিল, অতিরিক্ত সময় চেয়েছে তেহরান।
এপ্রিলেও একই চিত্র দেখা যায়। ৭ এপ্রিল ট্রাম্প সতর্ক করেন, ইরান হরমুজ প্রণালি না খুললে ‘একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে’। কিন্তু সময়সীমা শেষ হওয়ার দুই ঘণ্টা আগে তিনি অবস্থান বদলান। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তবে সেই সময়ের মধ্যেও কোনো সমঝোতা হয়নি। এরপর ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর হামলার হুমকি দিলেও ২১ এপ্রিল তিনি আবার অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। তার ভাষ্য ছিল, পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মে মাসেও একই কৌশল অব্যাহত থাকে। ১৭ মে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি না করলে ইরানের ‘কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না’। কিন্তু পরদিনই তিনি জানান, হামলার সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। কারণ, ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে। তবে ২৭ মে আলোচনা ভেঙে পড়লে আবারও সামরিক হামলার প্রস্তুতি শুরু হয়।
জুনে পাল্টাপাল্টি হামলা আরও তীব্র হয়। ১১ জুন ট্রাম্প হুমকি দেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল ও গ্যাস খাতের ‘সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নেবে। কয়েক ঘণ্টা পরই আবার সামাজিক মাধ্যমে জানান, আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। ফলে হামলা স্থগিত করা হচ্ছে। ১৭ জুন দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারকে (এমওইউ) সই করে। যুদ্ধবিরতি এবং ৬০ দিনের আলোচনার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধে কয়েক দিনের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেঙে যায়। এরপর আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হয়।
২৭ জুলাই ট্রাম্প দাবি করেন, সম্ভাব্য চুক্তির মৌলিক কাঠামো নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, প্রয়োজন হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক অভিযান চালাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। চলতি সপ্তাহের সোমবারও তিনি দাবি করেন, যুদ্ধ শেষ করার আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে। একই সঙ্গে ইরানকে আবারও ‘শেষ সুযোগ’ দিয়ে বলেন, সমঝোতায় না এলে দেশটিকে ‘নেতৃত্বশূন্য’ করার মতো পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। তবে এখন পর্যন্ত এই হুমকির পর কোনো নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
শুধু হুমকিই নয়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বারবার শান্তিচুক্তির আশ্বাসও দিয়েছেন ট্রাম্প। প্রথম দিকে তিনি বলেছিলেন, যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হতে পারে। পরে দাবি করেন, যুদ্ধ ‘প্রায় শেষ’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান ‘সময়সূচির অনেক এগিয়ে’। আবার একই দিনেই বলেন, যুদ্ধ ‘শেষও, আবার শুরুও’। ২৩ মার্চ তার দাবি ছিল, ইরানের সঙ্গে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই সমঝোতা হয়েছে। দুই দিন পর বলেন, ইরান ‘খুব মরিয়া’ হয়ে চুক্তি করতে চায়। এরপর মন্ত্রিসভার বৈঠকে জানান, তেহরান ‘চুক্তির জন্য অনুরোধ করছে’।
এপ্রিলজুড়েও ট্রাম্প বারবার বলেন, দুই দেশ চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তার দাবি ছিল, ইরান ‘সব শর্ত মেনে নিয়েছে’, ‘এক-দুই দিনের মধ্যেই চুক্তি হবে’ এবং দুই পক্ষের মধ্যে বড় কোনো মতপার্থক্য নেই। মে মাসে তিনি বলেন, চুক্তির অধিকাংশ বিষয় চূড়ান্ত, শুধু আনুষ্ঠানিক অনুমোদন বাকি। জুনে আবার দাবি করেন, ইরান ‘যা চাই, সব দিতে প্রস্তুত’।
অন্যদিকে তেহরান ধারাবাহিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের বক্তব্য, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনা চলছে না। তারা শুধু ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ যোগাযোগ থাকতে পারে। তবে বাস্তবে এখনো কোনো শান্তিচুক্তি হয়নি। যুদ্ধও থামেনি। ফলে ট্রাম্পের বারবার দেওয়া ‘শেষ সুযোগ’ এবং ‘চুক্তি আসন্ন’—দুই দাবিই এখন পর্যন্ত বাস্তবে রূপ পায়নি।
এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যেও দেখা দিয়েছে অসঙ্গতি। কংগ্রেসে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। জাতির উদ্দেশেও আনুষ্ঠানিক ভাষণ দেননি ট্রাম্প। ফলে যুদ্ধের উদ্দেশ্য, সময়কাল ও লক্ষ্য নিয়ে প্রশাসনের বার্তা এসেছে খণ্ড খণ্ডভাবে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।
সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, অভিযানের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে রক্ষা করা এবং ইরানি শাসনের তৈরি ‘আসন্ন হুমকি’ দূর করা। তবে তিনি ওই হুমকির প্রকৃতি সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইসরায়েল ইরানে হামলা চালালে—যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নিক বা না- নিক—তেহরান পাল্টা হামলা চালাতে পারে, এমন আশঙ্কাই প্রশাসনের মূল উদ্বেগ ছিল। প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসনও একই ব্যাখ্যা দেন। তার ভাষ্য, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা থাকুক বা না থাকুক, হামলা চালাতে প্রস্তুত ছিল। আর সম্ভাব্য সেই ইরানি প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কাকেই ট্রাম্প প্রশাসন ‘আসন্ন হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরেছে।



