Logo
Logo
×

আন্তর্জাতিক

ভারতে ‘গো-রক্ষকদের’ সাজা দিয়ে প্রাণনাশের হুমকিতে বিচারক

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ১০:১২ পিএম

ভারতে ‘গো-রক্ষকদের’ সাজা দিয়ে প্রাণনাশের হুমকিতে বিচারক

এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার দায়ে ১৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ভারতের একজন নারী বিচারক অনলাইনে নিপীড়ন ও প্রাণনাশের হুমকির লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। গত ১২ জুন মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের একটি আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তাবাসসুম খান ওই ১৪ ব্যক্তিকে হত্যা, হত্যার চেষ্টা, দাঙ্গা এবং অন্যায়ভাবে পথরোধ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেন।

২০২২ সালের এক রাতে ৫০ বছর বয়সী নাজির আহমদ নামের এক ব্যক্তি গবাদি পশু পরিবহন করছিলেন। সে সময় লাঠি ও রডধারী একদল তথাকথিত ‘‘গো-রক্ষক’’ তার পথরোধ করেন। হিন্দুরা গরুকে পবিত্র মনে করে এবং ভারতের বহু রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ।

অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নাজির আহমদ ও তার দুই সঙ্গীকে গাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে গরু পাচারের সন্দেহে নির্মমভাবে মারধর করেন। পরে নাজির আহমদ আহত অবস্থায় মারা যান। তবে তার সঙ্গীরা বেঁচে ফেরেন এবং আদালতে ঘটনার বিবরণ দেন।

রায়ে বিচারক তাবাসসুম বলেছেন, এই অপরাধটি ছিল দলগতভাবে পিটিয়ে হত্যার একটি স্পষ্ট ঘটনা। কিন্তু এই রায় তাকে ধর্মীয় বিদ্বেষের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। রায়ের পরদিন থেকেই অনলাইনে মুসলিম বিচারক তাবাসসুম খানকে গালিগালাজ ও হুমকির অসংখ্য ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওগুলোতে বলা হয়, দণ্ডিত ব্যক্তিরা হিন্দু হওয়ার কারণেই বিচারক তাবাসসুম খান তাদের বিরুদ্ধে ওই রায় দিয়েছেন।

সাধারণত রায়ের সমালোচনা করা হলেও খানের ওপর এই আক্রমণের ক্ষেত্রে তার আইনি যুক্তির চেয়ে ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে আনা হয়েছে। এই হেনস্তার মাত্রা এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, দেশটির শীর্ষস্থানীয় বিচার বিভাগীয় বিভিন্ন সংস্থা তার পাশে দাঁড়িয়েছে এবং তাকে পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে।

রায়ের পরপরই বিচারক খানের ওপর এই আক্রমণ শুরু হয়। ওই দিন দণ্ডিত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা আদালতের বাইরে জড়ো হয়ে রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান এবং পুলিশ ভ্যানকে বন্দীদের কারাগারে নিয়ে যেতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা বলেছেন, গরু বাঁচানোর অপরাধে এই পুরুষদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।

এর পরপরই শুরু হয় অনলাইনে হেনস্তার প্রচারণা। হিন্দু ডানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সাররা তাবাসসুম খানকে সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ এবং তাকে ধর্ষণ ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে ভিডিও প্রকাশ করতে শুরু করে।

একটি ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে হুমকি দিয়ে বলতে দেখা যায়, আগামী ১০ দিনের মধ্যে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মুক্তি না দিলে দেশজুড়ে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়া হবে। রোববার বিসিবির এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত বহু ভিডিও অনলাইনে দেখা গেছে; যেগুলো হাজার হাজার লাইক ও শেয়ার পাচ্ছে। হুমকি প্রদান ও সহিংসতা উসকে দেওয়ার সময় বক্তাদের মুখ এবং সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল স্পষ্ট দেখা যায়।

ডানপন্থী হিন্দি নিউজ চ্যানেল ‘সুদর্শন নিউজ’-এর একজন উপস্থাপক দণ্ডিত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বলেন, তারা হয়তো কখনোই ভাবেননি, তাদের পরিবারের সদস্যরা, যারা গরু বাঁচাতে সবকিছু বাজি রেখেছিলেন তাদের এর জন্য কারাবরণ করতে হবে। তিনি দর্শকদের উদ্দেশ্যে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, এখনই সময় গো-রক্ষকদের স্বার্থে লড়াই করার।

অনেক তথাকথিত গো-রক্ষা সংগঠন এবং হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীও এই রায়ের বিরুদ্ধে বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। গত ২২ জুন ‘গো রক্ষা পরিষদ’ পাঞ্জাব রাজ্যে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। সেখানে আন্দোলনকারীরা বিচারক খানের একটি কুশপুতুল মারধর করে এবং তা পুড়িয়ে দেয়। এর তিন দিন পর ‘রাষ্ট্রীয় বজরং দল’ উত্তরপ্রদেশ রাজ্যে বিক্ষোভ মিছিল করে এবং ‘গো-রক্ষকদের’ মুক্তির দাবি জানায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মার্কণ্ডেয় কাটজু বলেছেন, এই ভিডিও এবং বিক্ষোভ কেবল রায়ের সমালোচনাই করছে না, বরং বিচারক খানের পরিচয়কে ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা হিসেবে তার কর্তৃত্বকে অবৈধ প্রমাণের চেষ্টা করছে।

তিনি লেখেন, তার মুসলিম পরিচয়ই রায়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এটি ন্যায়বিচারের এক বিপজ্জনক উল্টো রূপ প্রদর্শন করে। বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্তগুলো আইনি যুক্তির মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত, যিনি রায় দিচ্ছেন তার ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে নয়।

কাটজু বলেন, তাবাসসুম খান তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি বার্তা পাঠিয়েছেন। বার্তায় খান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই হুমকি তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে এবং তার মনে হচ্ছে যেন রায় দিয়ে তিনি কোনও অপরাধ করে ফেলেছেন।

দেশটির এই নারী বিচারক ভারতের শীর্ষস্থানীয় বিচার বিভাগীয় সংগঠনগুলোর কাছ থেকেও সমর্থন পেয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট অ্যাডভোকেটস-অন-রেকর্ড অ্যাসোসিয়েশন (এসসিএওআরএ) এবং সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন (এসসিবিএ) তাকে হুমকির তীব্র নিন্দা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

এসসিবিএর সভাপতি বিকাশ সিং বিবিসিকে বলেছেন, একজন বিচারকের প্রতি হুমকি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। কারণ বিচার বিভাগ গণতন্ত্রের মূল ভিত্তির সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, আমরা যদি এটি হতে দিই, তাহলে কোনও বিচারকই ন্যায়বিচার করতে পারবেন না। একটি সামগ্রিক গণতন্ত্রে একজন বিচারককে কোনও ধরনের ভয় বা পক্ষপাত ছাড়া তার দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে।

এদিকে, পুলিশ কর্মকর্তা সুধাকর বারাসকর বিবিসিকে জানিয়েছেন, ভারতীয় দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাইবার সেল উসকানিমূলক ভিডিও শেয়ারকারীদের খোঁজ করছে এবং এ ধরনের কনটেন্টের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রমাগত নজরদারি চালাচ্ছে।

তবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে বলেছেন, বিচারক তাবাসসুম খানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগের আরও অনেক কিছু করা উচিত। আইনি নিউজ ওয়েবসাইট ‘লাইভ ল’-এর একটি নিবন্ধে হেগড়ে অতীতে একজন সাবেক বিচারকের হুমকির বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করা হয়েছিল তার উদাহরণ দেন।

বোম্বে হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি গৌতম প্যাটেল এবং তার পরিবার ২০২৪ সালে একটি মুসলিম সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ উত্তরাধিকার বিরোধের রায়ের পর ১০ মাসেরও বেশি সময় ধরে হুমকির সম্মুখীন হয়েছিলেন। তিনটি বিচার বিভাগীয় সংস্থার দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলার পর বোম্বে হাইকোর্ট মহারাষ্ট্র সরকারকে প্যাটেলের নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। আদালত মুম্বাই পুলিশ কমিশনারকে তদন্ত তদারকি করার নির্দেশ দেয় এবং রিপোর্ট তলব করে।

হেগড়ে লিখেছেন, হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক যদি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা এবং তার মামলার বিচার বিভাগীয় তদারকি পাওয়ার যোগ্য হন, তাহলে জেলা আদালতের একজন কর্মরত দায়রা জজও তার যোগ্য। এই নীতি পদের কাছে নতিস্বীকার করতে পারে না। এটি ধর্মের কাছে নতিস্বীকার করতে পারে না। এটি কোনও নির্দিষ্ট রায়ের চারপাশের রাজনৈতিক আবহাওয়ার কাছেও মাথা নত করতে পারে না।

গত সপ্তাহে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চেয়েছেন, বিচারক খানকে রক্ষা এবং হুমকির নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আদালত তার পুলিশি নিরাপত্তা অব্যাহত রাখারও নির্দেশ দিয়েছে।

সূত্র: বিবিসি।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন