আল-জাজিরার বিশ্লেষণ
মোদির ইসরায়েল সফর পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
দ্বিতীয়বারের মতো ইসরায়েল সফরে গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বুধবার তেল আবিবে পৌঁছালে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা জানান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ২০১৭ সালের সফরের পর কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এটিই প্রথম ইসরায়েল সফর, ফলে এর কূটনৈতিক ও প্রতীকী গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে এবং গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক চলমান। এই প্রেক্ষাপটে মোদির সফরকে বিশ্লেষকেরা ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার বার্তা হিসেবে দেখছেন।
মোদির সফরের কয়েক দিন আগে নেতানিয়াহু মন্ত্রিসভায় ‘হেক্সাগন অব অ্যালায়েন্স’ বা ষড়ভুজ জোটের ধারণা উত্থাপন করেন। প্রস্তাবিত কাঠামোয় ভারতের পাশাপাশি গ্রিস, সাইপ্রাস এবং কিছু আরব, আফ্রিকান ও এশীয় দেশের অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। তার ভাষায়, লক্ষ্য হলো ‘উগ্রবাদী অক্ষ’ মোকাবিলা করা।
এই প্রস্তাব এমন সময়ে এসেছে, যখন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছেন। ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় জোট রাজনীতির নতুন বিন্যাস নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।
২০১৭ সালের পর ভারত–ইসরায়েল সম্পর্ক দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। ভারত বর্তমানে ইসরায়েলের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র ক্রেতা। এবারের সফরে প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা আলোচনায় রয়েছে।
আলোচিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে ‘আয়রন বিম’ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজার অস্ত্র এবং ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও যৌথ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও নতুন কাঠামো তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খান সফরটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, সম্ভাব্য বিশেষ কৌশলগত চুক্তি আঞ্চলিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ ভারত–ইসরায়েল সামরিক সহযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ২০২৫ সালের মে মাসে পেহেলগাম হামলার পর ভারত–পাকিস্তান চার দিনের সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও বাড়লে তা ইসলামাবাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
গবেষকেরা উল্লেখ করছেন, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং ইসরায়েলের ‘মোসাদ’-এর মধ্যে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে, যা এখন আরও সক্রিয় হতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য বড় প্রশ্ন উপসাগরীয় অঞ্চলে। সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যেমন বাড়ছে, তেমনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করেছে। ফলে ইসলামাবাদের কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা আরও জটিল হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও কানেকটিভিটি জোরদার করে পাকিস্তান বিকল্প ভূ-অর্থনৈতিক পথ খুঁজতে পারে। একই সময়ে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতিও আঞ্চলিক কৌশলগত চিত্রকে প্রভাবিত করছে।
সব মিলিয়ে মোদির ইসরায়েল সফর কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন, এই নতুন জোট রাজনীতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে কতটা প্রভাবিত করবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো কীভাবে নিজেদের কৌশল পুনর্গঠন করবে।



