Logo
Logo
×

প্রযুক্তি

কেন আপনার চোখকে স্ক্রিন থেকে সরাতে চায় প্রযুক্তি বিশ্ব?

Icon

থমাস জার্মেইন

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০১:৪১ পিএম

কেন আপনার চোখকে স্ক্রিন থেকে সরাতে চায় প্রযুক্তি বিশ্ব?

মোবাইল ফোনের পর্দার দিকে কম সময় তাকিয়ে থাকার একটি ভবিষ্যৎ কল্পনা করছেন বিশ্বের কয়েকজন শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। তাদের মতে, আগামী দিনের প্রযুক্তি হবে আরও স্বাভাবিক, আরও মানবিক। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন—এটি কি সত্যিই স্ক্রিন-নির্ভরতা কমাবে, নাকি প্রযুক্তিকে মানুষের জীবনে আরও গভীরভাবে প্রবেশ করাবে?

প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী বছরই ক্যামেরাসংযুক্ত এয়ারপড বাজারে আনতে পারে অ্যাপল। তবে এই ক্যামেরা ছবি তোলার জন্য নয়। বরং ব্যবহারকারীর চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তা সিরিকে সরবরাহ করবে, যার মাধ্যমে নতুন ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা পাওয়া যাবে।

যদিও অ্যাপল এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি, তবুও প্রতিবেদনটি এমন একজন সাংবাদিকের সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে যিনি অ্যাপলের অভ্যন্তরীণ তথ্য ফাঁসের ক্ষেত্রে বেশ নির্ভরযোগ্য হিসেবে পরিচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি একটি বৃহত্তর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের অংশ। গত প্রায় ছয় দশক ধরে কম্পিউটার ব্যবহারের প্রধান মাধ্যম ছিল স্ক্রিন। কিন্তু এখন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এমন ডিভাইস তৈরি করছে, যা ব্যবহারকারীদের স্ক্রিনের দিকে কম তাকিয়েই ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের সুযোগ দেবে।

স্মার্ট গ্লাস, এআই পেনডেন্ট এবং অন্যান্য পরিধানযোগ্য ডিভাইসের মাধ্যমে ভবিষ্যতে কম্পিউটারের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের ধরন আমূল বদলে যেতে পারে।

সম্প্রতি স্ন্যাপচ্যাটের মূল প্রতিষ্ঠান স্ন্যাপ ‘স্পেকস’ নামে নতুন এআইচালিত স্মার্ট গ্লাস উন্মোচন করেছে। যুক্তরাজ্যে এর দাম ১ হাজার ৯৯৫ পাউন্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রে ২ হাজার ১৯৫ ডলার। এই চশমা অন্যান্য স্মার্ট গ্লাসের তুলনায় আকারে বড় ও ভারী হলেও কোম্পানির দাবি, এটি দীর্ঘ সময় পরেও আরামদায়কভাবে ব্যবহার করা যাবে।

স্ন্যাপের প্রধান নির্বাহী ইভান স্পিগেল বলেন, দশকের পর দশক কম্পিউটার আমাদের নিচের দিকে তাকাতে, স্থির হয়ে বসতে বা বাস্তব মুহূর্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য করেছে। স্পেকস কম্পিউটিংয়ের নতুন যুগের সূচনা।

বর্তমানের বেশিরভাগ স্মার্ট গ্লাস ফোনের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকলে কাজ করে না। তবে স্পেকস স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম বলে দাবি করেছে স্ন্যাপ।

অন্যদিকে, মেটার স্মার্ট গ্লাস ইতোমধ্যে বাজারে সবচেয়ে জনপ্রিয়। কোম্পানির তথ্যমতে, এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ লাখ জোড়া বিক্রি হয়েছে। তবে এসব ডিভাইসের সঙ্গে গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।

স্মার্ট গ্লাসের ক্যামেরা ব্যবহার করে অনেকেই অজান্তে অন্যদের ভিডিও ধারণ করছেন, যা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। যদিও মেটা ও স্ন্যাপের গ্লাসে রেকর্ডিংয়ের সময় একটি সতর্কতামূলক আলো জ্বলে ওঠে, সমালোচকদের মতে এটি যথেষ্ট নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সিএনবিসির সাংবাদিক ব্র্যান্ডি জাদরোজনি বলেন, একদিন সকালে দৌড়ানোর সময় একজন পার্ককর্মীর সঙ্গে কথা বলছিলাম। তিনি মেটার স্মার্ট গ্লাস পরে ছিলেন। একজন প্রযুক্তি সাংবাদিক হিসেবেও বিষয়টি আমার কাছে অস্বস্তিকর লেগেছে। এ নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে।

তবে মেটা ক্যামেরাবিহীন, শুধুমাত্র অডিওনির্ভর স্মার্ট গ্লাস তৈরির কথাও ভাবছে। আর গোপনীয়তার প্রশ্নে অনেকেই মনে করেন, অ্যাপলের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, কারণ প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাকে তাদের অন্যতম প্রধান ব্র্যান্ড বার্তা হিসেবে তুলে ধরে আসছে।

যদি এয়ারপডে ক্যামেরা যুক্ত হয়ও, তা দিয়ে ছবি বা ভিডিও ধারণ করা যাবে না। তাত্ত্বিকভাবে অ্যাপল ব্যবহারকারীর ফোনেই এসব তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারে, ফলে সেগুলো ক্লাউডে সংরক্ষণ বা পাঠানোর প্রয়োজন হবে না।

এ ধরনের প্রযুক্তির সম্ভাবনাও কম নয়। ব্যবহারকারী কোনো বস্তুর দিকে তাকিয়ে সেটি সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারবেন, ফ্রিজ খুলে ভেতরের উপকরণ দেখে রেসিপির পরামর্শ পেতে পারেন, কিংবা চারপাশের দৃশ্য বিশ্লেষণ করে পথনির্দেশনা নিতে পারবেন। এমনকি হাতের অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও ডিভাইস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতে পারে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান সিসিএস ইনসাইটের প্রধান বিশ্লেষক বেন উড বলেন, অ্যাপল এমন প্রযুক্তি যুক্ত করবে না যদি এর বাস্তব ও কার্যকর ব্যবহার না থাকে। মানুষ এসব ডিভাইস দিয়ে ভবিষ্যতে কী কী করবে, তা মূলত আমাদের কল্পনাশক্তির ওপর নির্ভর করছে।

তার মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো—কম্পিউটারের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলা, যেন আপনি কোনো সহকারীকে নির্দেশ দিচ্ছেন। অ্যাপলের নতুন এআইচালিত সিরি সেই দিকেই ধীরে ধীরে এগোচ্ছে।

তবে সব বিশ্লেষকই আশাবাদী নন। তাদের আশঙ্কা, স্ক্রিনবিহীন ডিভাইসগুলো স্মার্টফোনের বিকল্প হওয়ার বদলে নতুন আরেকটি প্রযুক্তিগত স্তর তৈরি করবে। ফলে মানুষ স্ক্রিনও ব্যবহার করবে, পাশাপাশি নতুন ডিভাইসের সঙ্গেও আরও বেশি সময় কাটাবে।

বেন উড বলেন, স্মার্টফোন কোথাও যাচ্ছে না। এটি এখন সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে প্রযুক্তি শিল্প এবং অনেক ব্যবহারকারীর মধ্যেই মাথা তুলে বাস্তব জগতের দিকে আরও বেশি তাকানোর একটি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি কি সত্যিই আমাদের স্ক্রিন থেকে মুক্ত করবে, নাকি আরও অদৃশ্য ও গভীরভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে বেঁধে ফেলবে? সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের ডিজিটাল পৃথিবীর রূপ।

সূত্র: বিবিসি

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন