আকাশি-নীল জার্সিতে এই কান্নাই কি মেসির শেষ দৃশ্য?
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৯ এএম
রূপকথার শেষ পাতাটা তো সব সময় আনন্দের রঙে আঁকা থাকে। কিন্তু নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের বিকেলটা লিওনেল মেসির জন্য কোনো রূপকথা আনেনি। এনেছে এক বুকভাঙা হাহাকার। ট্রফি মঞ্চের ঝলমলে আলোয় যখন তিনি রানার্সআপ মেডেলটা গলায় নিচ্ছেন, তখন ক্যামেরা জুম করল তাঁর মুখে। সেই চেনা চোখ, যা দিয়ে তিনি মাঠের সব ডিফেন্ডারের ফাঁকফোকর গলে বল বাড়িয়ে দেন, সেখানে কিছুক্ষণ পর শুধুই নোনা জলের ধারা।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল। স্পেনের লাল ঝড়ের সামনে নীল-সাদা স্বপ্নগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। আর্জেন্টিনাকে নাকানিচুবানি খাইয়ে স্পেন ম্যাচটা জিতে নিল ১-০ গোলে। কিন্তু মেসির চোখের জল কি শুধু একটি হারানো ট্রফির জন্য? নাকি এক মহাকাব্যের বিষাদময় শেষও?
মাঠের ওপাশে যখন স্প্যানিশ তরুণদের উল্লাস, ফক্স স্পোর্টসের স্টুডিওতে বসে জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ আর থিয়েরি অঁরিরা তখন কথা বলছিলেন মেসির শেষটা নিয়ে। ইব্রা বললেন, ‘এই বিশ্বকাপে আমরা ওকে মন ভরে উপভোগ করেছি। আমি জানি বিশ্বকাপটা জিততে না পেরে ও ভীষণ দুঃখী। কিন্তু ও একটা অবিশ্বাস্য বিশ্বকাপ কাটিয়েছে। একা হাতে এই দলটাকে টেনে নিয়ে গেছে। ও যা করেছে, তা স্রেফ জাদুকরি।’
৬ নম্বর বিশ্বকাপ খেলতে নেমেছিলেন মেসি। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যানে হয়তো এটাই তাঁর জীবনের সেরা বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টে ৮টি গোল আর ৪টি অ্যাসিস্ট! তবে পরিসংখ্যান তো স্রেফ সংখ্যার খেলা, মাঠে যা করেছেন, তা ছিল চোখের আরাম। প্রথম পাঁচ ম্যাচেই গোল। কোয়ার্টার ফাইনাল আর সেমিফাইনালে গোল না পেলেও বানিয়ে দিলেন ৩টি গোল। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয় কামব্যাকের ম্যাচে তাঁর বাড়ানো পাস দুটি তো ফুটবল ইতিহাসে জাদুঘরে রাখার মতো।
ইব্রাহিমোভিচ মেসির এই রূপটাকেই ব্যাখ্যা করলেন দারুণভাবে, ‘এই টুর্নামেন্টে কখনো মনে হয়েছে ও এই গ্রহেরই কেউ না, আবার কখনো একদম আমাদের মতো রক্তমাংসের মানুষ হয়ে উঠেছে!’
এই ৮ গোল মিলিয়ে বিশ্বকাপে মেসির মোট গোল এখন ২১টি। গ্রুপ পর্ব শেষেই বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড নিজের করে নিয়েছিলেন। টুর্নামেন্টের সিংহভাগ সময় রেকর্ডটা তাঁর নামের পাশেই ছিল। কিন্তু বাদ সাধলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। গত শনিবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে ফ্রান্সের এই তারকা মেসির কাছ থেকে রেকর্ডটা ছিনিয়ে নেন।
ফাইনালে রেকর্ডটা আর উদ্ধার করা হয়নি মেসির। আসলে স্পেনের কাছে পাত্তাই পায়নি আর্জেন্টিনা। পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা শট নিতে পেরেছে মাত্র দুটি, যার একটিও অন-টার্গেট ছিল না। মেসি নিজে একটা শট নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তার বাড়ানো পাঁচটি ক্রসের মধ্যে মাত্র একটি ঠিকঠাক জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে। স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশলে বন্দী হয়ে মেসিকে বড্ড একাকী লেগেছে।
কিন্তু থিয়েরি অঁরি মোটেও মেসির কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে রাজি নন। আর্সেনাল ও বার্সেলোনার এই কিংবদন্তি কৃতিত্ব দিচ্ছেন স্পেনের ট্যাকটিকসকে, ‘আপনি মেসির বিপক্ষে বাজি ধরতে পারেন না। আর্জেন্টিনাকে হারাতে হলে স্পেনের মতো একটা দলই লাগত।’
ফাইনালে মেসির পা থেকে চেনা জাদু বের হয়নি সত্যি, কিন্তু তাতে কি তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব এক বিন্দু কমে যায়? ডেনমার্কের সাবেক গোলকিপার ক্যাসপার স্মাইকেল তো পরিষ্কার বলে দিলেন, বিশ্বকাপের ট্রফি দিয়ে মেসির মতো ফুটবলারকে মাপাটাই বোকামি।
স্মাইকেলের কথা, ‘হ্যাঁ, ও বিশ্বকাপে জেতার চেয়ে ফাইনাল হেরেছে বেশি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ও-ই ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। যেকোনো বাচ্চা যখন ওর দিকে তাকাবে, সে বুঝতে পারবে ফুটবল মানে শুধু জেতা নয়। ফুটবল মানে আপনি খেলাটাকে কী দিয়ে গেলেন। আর মেসি এই খেলাটাকে যা দিয়েছে, তার কোনো তুলনা হয় না।’
একই সুরে সুর মেলালেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক তারকা অ্যালেক্সি লালাস, ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার পিটার ক্রাউচও। লালাস যেমন বলছিলেন, ‘ও একজন চ্যাম্পিয়ন। আর চ্যাম্পিয়নরা সব সময় সবকিছু জিততে চায়। ও তো ক্যারিয়ারে সবকিছুই জিতেছে, তাই আজকের হারটায় ও হতাশ হবেই। কিন্তু আমার মনে হয়, আজকের ম্যাচের স্কোরলাইন ভুলে আমাদের এখনই আলোচনা করা উচিত ও কতটা আইকনিক, কতটা গুরুত্বপূর্ণ আর কতটা অবিশ্বাস্য এক ফুটবলার।’
পিটার ক্রাউচ আবার স্পেনের বর্তমান দলটার উদাহরণ টেনে অন্য এক সত্য সামনে আনলেন, ‘আজ স্পেনের যে ছেলেরা চ্যাম্পিয়ন হলো, তাদের প্রায় সবাই ছোটবেলায় মেসিকে দেখে বড় হয়েছে, ওর খেলায় অনুপ্রাণিত হয়েছে। এই মানুষটা একটা জিনিয়াস। আর এটাই যদি ওর শেষ বিদায় হয়, তবে মনে রাখতে হবে আমরা ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলারটিকে বিদায় জানালাম।’
ফাইনালের পর পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে মেসির কান্নার ছবিটা এখন নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। রুপালি মেডেলটা যখন তাঁর গলায় ঝুলছিল, মেসির চোখ বেয়ে জল পড়ছিল। থিয়েরি অঁরি সেটা দেখে আবেগাপ্লুত, ‘দেখো, এই হারটা ওর কাছে কী ভীষণ কষ্টের! তোমাদের মনে যদি বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে যে এই বয়সেও ওর পেটে জেতার ক্ষুধা আছে কি না, তবে ওর মুখের দিকে তাকাও। দেখো এই কান্না কী অর্থ বহন করে। ও তো জীবনে সব জিতেছে। তাও এই কান্না কেন? কারণ, দেশের প্রতি ওর ভালোবাসা, ওর প্যাশন আর ও নিজের সবটুকু উজাড় করে দেয় মাঠে।’
এখন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: রানার্সআপ মেডেল গলায় নিয়ে এই কান্নাই কি আর্জেন্টিনার আকাশি-নীল জার্সিতে মেসির শেষ দৃশ্য? ইব্রাহিমোভিচ চান না মেসির এই রূপকথা এখানেই শেষ হয়ে যাক। জ্লাতান শেষ করলেন একবুক আশা নিয়ে, ‘আমি আশা করি ও যত দিন সম্ভব খেলা চালিয়ে যাবে, যাতে আমরা ওকে আরও বেশি উপভোগ করতে পারি। ও কি পরের বিশ্বকাপে থাকবে? আমি জানি না, ফুটবলে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। তবে ও খেলছে, এটাই আমাদের আনন্দ। যেদিন ও খেলা ছেড়ে দেবে, সেদিন আমাদের সবার মন খারাপ হবে।’



