Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

​এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে সুগন্ধা নির্বাচন: রাজপথের রক্ত, অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ ও রিজভীর উত্থান

Icon

শফিকুল ইসলাম বেবু

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম

​এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে সুগন্ধা নির্বাচন: রাজপথের রক্ত, অভ্যন্তরীণ মেরুকরণ ও রিজভীর উত্থান

​বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ইতিহাস যেমন স্বৈরাচারবিরোধী রাজপথের লড়াইয়ের ত্যাগে রক্তিম, তেমনি এর ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচ, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্বের নাটকীয় উত্থান-পতনের নানা অধ্যায়। বিশেষ করে ১৯৮০-র দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৯০-র দশকের প্রথমার্ধ ছিল ছাত্রদলের রাজনীতির জন্য সবচেয়ে উত্তাল ও সংকটময় সময়। ছাত্রদলের ইতিহাসের সেই কঠিন সন্ধিক্ষণে যেসব নাম রাজনৈতিক সমীকরণকে বদলে দিয়েছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। কুড়িগ্রামের সন্তান ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির প্রতিকূল হাওয়া পেরিয়ে ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তার পেছনে রয়েছে এক রোমাঞ্চকর রাজনৈতিক স্মৃতিকথা।  

​বাবলুর মৃত্যু, জালালের পলায়ন এবং গভীর সংকট--

​১৯৮৭ সালের ৯ মার্চ ছাত্রদলের তৎকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক বাবলু নিহত হওয়ার পর দলে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন জালাল আহমেদ। কিন্তু  জালাল আহমেদ, মাহবুবুল হক বাবলু নিহত হওয়ার আগেই স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের সঙ্গে গোপনে হাত মিলিয়ে সংগঠন ত্যাগ করেন এবং বিদেশে পাড়ি জমান। জালাল আহমেদের এই আচমকা প্রস্থান ও মাহবুবুল হক বাবলু নিহত হওয়ার পর ছাত্রদলের অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে।

​এ সংকটময় মুহূর্তে আসাদুজ্জামান রিপনকে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং আমানুল্লাহ আমানকে করা হয় ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। ওই কমিটিতে রুহুল কবির রিজভী সহ-সভাপতি থাকলেও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলধারার শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ ছাত্রদলের কর্মীদের কাছে তখন খুব একটা পরিচিত মুখ ছিলেন না।

​ধানমন্ডির ২৭ নম্বর: এক খয়েরী শার্ট পরা রাজপথের বীর--

​১৯৮৮ সালের অক্টোবরের দিকে ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি আসাদুজ্জামান রিপন একটি ছাত্র কনভেনশনে যোগ দিতে আমেরিকা ও Canada সফরে যান। সভাপতি দেশের বাইরে থাকায় ভারপ্রাপ্ত সভাপতির পদ খালি হয়ে যায়। তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সানাউল হক নীরু, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক গোলাম ফারুক অভিসহ ছাত্রনেতারা ধানমন্ডির ২৭ নম্বরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জড়ো হন। সেসময় বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া নিয়মিত ধানমন্ডি কার্যালয়ে বসতেন।

​ছাত্রনেতারা ম্যাডাম খালেদা জিয়ার কাছে জানতে চান, ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে? জবাবে বেগম জিয়া সাফ জানান, কোনো যোগ্য ও ত্যাগী ছাত্রনেতাকেই এ পদের জন্য বেছে নেওয়া হবে। তৎকালীন সহ-সভাপতিদের মধ্যে সালাউদ্দিন আহমেদ (বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী) বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগ দিয়েছেন। অন্যদিকে অন্যান্য ঢাকা কেন্দ্রীক সহ-সভাপতিদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে নেতাকর্মীদের ভেতরেই বিরূপ মনোভাব ছিল।  

​এক শরতের সন্ধ্যায় ধানমন্ডি কার্যালয়ে বেগম খালেদা জিয়ার সামনে খয়েরী শার্ট পরা এক তেজস্বী ও বাকপটু যুবক দাঁড়িয়ে ওজস্বী বক্তব্য পেশ করলেন। উপস্থিতি তরুণনেতারা মুগ্ধ হয়ে তাঁর বক্তব্য শুনলেন। সেই খয়েরী শার্ট পরা যুবকের পরিচয় জানতে চাইলে তিনি জানান, তাঁর বাড়ি কুড়িগ্রাম শহরের সর্দার পাড়ায় এবং স্থানীয় মিতালী সিনেমা হলের মালিক মোয়াজ্জেম হোসেন তাঁর চাচা।

​রাজনীতির সাধারণ কর্মীরা তখন জানতে পারেন, এই যুবক আর কেউ নন—রুহুল কবির রিজভী। ১৯৮৪ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে তিনি পঙ্গুত্ব বরণ করেছিলেন। রিজভীর দলীয় আনুগত্য ও ত্যাগের কথা বিবেচনা করে বেগম খালেদা জিয়া ওই দিনই তাঁকে ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করেন।

​অপরাজেয় বাংলা থেকে 'ডাকসু-রাকসু'র ময়দান---

​ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে এসে রুহুল কবির রিজভী নিজেকে দ্রুত প্রমাণ করতে শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪টি হলের বেশ কয়েকটি সম্মেলনের মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে তাঁর মূল অভিষেক ঘটে। প্রখ্যাত চিকিৎসক ও বিএনপির প্রভাবশালী নেতা পরবর্তীতে শিক্ষামন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি ড. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর উপস্থিতিতে  অক্টোবর ১৯৮৮ বেশ কয়েকটি ছাত্রদল হল শাখার সম্মেলনে সারগর্ভ বক্তব্য দেন রিজভী। তাঁর প্রাঞ্জল সাবলীল বক্তব্য শোনার জন্য শত শত শিক্ষার্থী ঢাবির হলে হলে ভিড় জমাতেন। অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে তাঁর দীর্ঘ বক্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি কাড়তে সমর্থ হয়। ঢাবির রাজনীতিতে তাঁর এই শক্ত ভিত্তি তৈরিতে তৎকালীন তুখোড় ছাত্রনেতা সানাউল হক নীরুর বড় ধরনের প্রচ্ছন্ন ভূমিকা ছিল।

​পরবর্তীতে ১৯৮৯ ও ১৯৯০ সালের উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ডাকসু ও রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ডাকসু নির্বাচনে দুদু-রিপন প্যানেলের পরাজয়ের পর ১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ছাত্রদলের ভেতর চরম মতদ্বৈততা দেখা দেয়। সানাউল হক নীরু, গোলাম ফারুক অভি, কামরুজ্জামান রতনসহ প্রভাবশালী নেতারা দুদু-রিপন প্যানেল পুনরায় দেওয়ার পক্ষে থাকলেও বেগম খালেদা জিয়া সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি ‘আমান-খোকন-আলম’ পরিষদ ঘোষণা করেন। প্যানেল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বেগম জিয়ার সঙ্গে নীরু ও অভি গ্রুপের তীব্র দূরত্ব সৃষ্টি হয়, যার পরিণতিতে তৎকালীন জনপ্রিয় বেশ কয়েকজন ছাত্রনেতা দল থেকে বহিষ্কৃত হন। এর মাঝেই রাকসু নির্বাচনে রিজভী-হারুন প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে রুহুল কবির রিজভী বিপুল ভোটে ভিপি নির্বাচিত হন।

​সুগন্ধার ঐতিহাসিক নির্বাচন: ৯২-এর ভোটযুদ্ধ--

​১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর এরশাদ সরকারের পতন ঘটে। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করার পর ছাত্রদলকে সুসংগঠিত করতে সম্মেলনে গুঞ্জন শুরু হয়। রুহুল কবির রিজভী ততদিনে সারা দেশের ছাত্রদলের কর্মীদের কাছে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক রাজনীতিবিদদের একটি অংশ ঢাকার বাইরের বা ‘যমুনার ওপার’ থেকে আসা কাউকে ছাত্রদলের শীর্ষ পদে মেনে নিতে নারাজ ছিল।

​এই চরম রাজনৈতিক মেরুকরণের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের এমফিল গবেষক শফিকুল ইসলাম বেবু ও তৎকালীন সাধারণ ছাত্রনেতারা এবং কবি জসীম উদ্দীন হলের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা কামরুজ্জামান লালসহ একটি বড় অংশ রিজভী আহমেদের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। ঢাকা কলেজের ভিপি মীর সরাফত আলী সপু ও ঢাবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আলী আক্কাস নাদিম রিজভীর সমর্থনে শক্ত প্রাচীর গড়ে তোলেন।

​অবশেষে ১৬ জুন ১৯৯২ সালে ঢাকার 'সুগন্ধা'য় ছাত্রদলের ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের ফলাফল ছিল নিম্নরূপ:

​সভাপতি পদ: রুহুল কবির রিজভী ৮৮ ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খাইরুল কবির খোকন পান ৫৩ ভোট, নাজিমুদ্দিন আলম ২৫ ভোট এবং ফজলুল হক মিলন পান ১৮ ভোট।

​সাধারণ সম্পাদক পদ: ইলিয়াস আলী ৯৩ ভোট পেয়ে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রফিকুল ইসলাম জগলু পান ৫৭ ভোট।

​সাংগঠনিক সম্পাদক পদ: আব্দুল মালেক ৮১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন এবং হাবিবুল ইসলাম হাবিব পান ৫৩ ভোট।

​সংঘাত, কমিটি বাতিল ও আপসহীন এক নেতা-

​গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলেও রিজভী-ইলিয়াস কমিটিকে পরাজিত গোষ্ঠী কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। নির্বাচনের মাত্র আড়াই মাসের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হল ও জসিম উদ্দীন হলে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তিনজন নেতাকর্মী নিহত হন। এই মর্মান্তিক ঘটনাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ গোষ্ঠী বেগম খালেদা জিয়াকে বুঝিয়ে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটি বাতিল করিয়ে দেয়।

​তবে রাজনীতিতে পদ-পদবি হারানোর পরও রিজভী আহমেদ আদর্শ থেকে চ্যুত হননি বা দল ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাননি। দীর্ঘ রাজনৈতিক ধৈর্যের পর পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন। ১/১১-এর সেনাসমর্থিত সরকারের ক্রান্তিকাল থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রতিটি রাজনৈতিক সংকটে রিজভী আহমেদ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। বহুবার গ্রেফতার, পুলিশের শারীরিক নির্যাতন ও দীর্ঘ জেলজুলুম সহ্য করলেও তিনি দলের প্রতি অনড় থেকেছেন। অনুসারীদের মতে, যাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি ধাপে ত্যাগ আর সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে, সেই রিজভী আহমেদের অভিধানে 'আাঁতাত' বা 'আপস' শব্দটির কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন