Logo
Logo
×

বিশেষ সংবাদ

যে ঘাসের ওপর তৈরি হবে বিশ্বকাপের ইতিহাস

Icon

জনি কাফম্যান

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম

যে ঘাসের ওপর তৈরি হবে বিশ্বকাপের ইতিহাস

ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। টুর্নামেন্টের ১০৪টি ম্যাচ যে ঘাসের মাঠে অনুষ্ঠিত হবে, সেই ঘাসের গুরুত্ব বিশাল। যদিও দর্শকদের চোখে তা প্রায়ই আড়ালেই থেকে যায়। আর সেই নিখুঁত মাঠ তৈরির পেছনে কাজ করছেন দুই বিজ্ঞানী। যারা কয়েক দশক ধরে গবেষণা করে যাচ্ছেন বিশ্বের সেরা কৃত্রিম ঘাসের মাঠ বা টার্ফ মাঠ বানানোর জন্য।

২০২৪ সালের কোপা আমেরিকার একটি ম্যাচে ঘটনাটি ঘটে মাত্র আট মিনিটের মাথায়। আর্জেন্টিনার তারকা ফুটবলার আঞ্জেল দি মারিয়া কানাডার এক ডিফেন্ডারের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলেন গোলের দিকে। সামনে শুধু গোলরক্ষক। কিন্তু হঠাৎই বল নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত তিনি দুর্বল এক শট নেন, যা সহজেই ঠেকিয়ে দেন গোলকিপার।

ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও কোচ অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার আটলান্টা স্টেডিয়ামের ঘাসের মান খেলার ওপর প্রভাব ফেলেছে। সাধারণত ওই স্টেডিয়ামে কৃত্রিম ঘাস ব্যবহৃত হলেও টুর্নামেন্টের কয়েক দিন আগে সেখানে অস্থায়ী প্রাকৃতিক ঘাস বসানো হয়েছিল।

খেলোয়াড়েরা অভিযোগ করেন, বল স্প্রিংবোর্ডের মতো লাফাচ্ছিল এবং মাঠটিকে দুর্যোগ বলে বর্ণনা করেন। পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্টেডিয়ামের মাঠ নিয়ে সমালোচনা চলতে থাকে।

২০২৬ বিশ্বকাপ সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—এই তিন আয়োজক দেশ আর এমন সমালোচনা শুনতে চায় না। তাই মাঠ প্রস্তুত করতে তারা নিয়োগ দিয়েছে বিশেষজ্ঞদের একটি দলকে।

গত আট বছরে গবেষকেরা বল বাউন্স করিয়েছেন, বুট দিয়ে মাটি পিটিয়েছেন, ঘাসের বিভিন্ন প্রজাতি পরীক্ষা করেছেন এবং মিলিমিটার ধরে মেপেছেন ঘাসের উচ্চতা। উদ্দেশ্য একটাই বিশ্বকাপের জন্য নিখুঁত টার্ফ মাঠ তৈরি।

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন সোরোচান। তিনি ফিফার হয়ে ১৬টি বিশ্বকাপ স্টেডিয়ামের মাঠের তত্ত্বাবধান করছেন। তিনি বলেন, ‘চাপটা অনেক বেশি। বিশেষ করে যেসব স্টেডিয়াম গম্বুজাকৃতির, সেগুলো নিয়ে আমি বেশি চিন্তিত। কারণ সূর্য উঠবে ঠিকই, কিন্তু স্টেডিয়ামের ভেতরে নয়। গাছের তো আলো দরকার।’

ভেলক্রো না নরম কার্পেট?

সোরোচান ও তার দল অসংখ্য পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন, মাত্র পাঁচ মিলিমিটার ঘাসের পার্থক্যই ঠিক করে দিতে পারে মাঠটি শক্তভাবে আটকে থাকা বা ভেলক্রোর মতো ধীর হবে নাকি দ্রুতগতির পাসিংয়ের জন্য উপযুক্ত নরম কার্পেটের মতো হবে।

তাদের গবেষণাগারে ছোট ছোট মাঠে বিশেষ যন্ত্র দিয়ে বল ছুড়ে তার গতি ও বাউন্স মাপা হয়েছে। আরেকটি ভারী যন্ত্র দিয়ে ফুটবল বুটের আঘাত অনুকরণ করে মাঠের স্থিতিস্থাপকতা পরীক্ষা করা হয়েছে।

তারা শুধু বলের আচরণ নয়, খেলোয়াড়দের পায়ের গ্রিপ, মাঠে গর্ত তৈরি হওয়া, পানি জমে থাকা এবং ইনজুরির ঝুঁকিও বিশ্লেষণ করেছেন।

বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলো ভিন্ন ভিন্ন আবহাওয়ায় অবস্থিত—মেক্সিকো সিটির আর্দ্র গরম থেকে টরন্টো ও বোস্টনের ঠান্ডা পর্যন্ত। তাই প্রতিটি স্টেডিয়ামের জন্য আলাদা ঘাস, আলাদা সেচব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উষ্ণ অঞ্চলে ব্যবহার হবে বারমুডা ঘাস, আর ঠান্ডা অঞ্চলে কেন্টাকি ব্লুগ্রাস ও পেরেনিয়াল রাইগ্রাসের মিশ্রণ।

মাঠকে আরও শক্তিশালী ও সমান রাখতে কৃত্রিম টার্ফে ব্যবহৃত প্লাস্টিক ফাইবারও মাটির সঙ্গে মেশানো হয়েছে।

ঘাসের গুরু ও তার শিষ্য

মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ট্রে রজার্স তৃতীয় ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো গম্বুজাকৃতির স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রাকৃতিক ঘাস বসানোর কাজে যুক্ত হন। তখন তিনি ফুটবল বিশ্বকাপ সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না। মজা করে তিনি বলেন, ‘আমি নাকি বলেছিলাম- বিশ্বকাপ আবার কী?’

সেই প্রকল্পেই ছাত্র হিসেবে কাজ করেছিলেন জন সোরোচান। তখন থেকেই তিনি ঘরের ভেতরে কীভাবে ভালো ঘাস জন্মানো যায়, তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

ফিফার আশা, টার্ফগ্রাস নিয়ে জন সোরোচান (বামে) ও ট্রে রজার্সের (ডানে) কয়েক দশকের গবেষণা বিশ্বকাপের মাঠগুলোকে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখতে সাহায্য করবে

এবারের বিশ্বকাপে তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ আরও বড়। কারণ অনেক মাঠ ম্যাচের মাত্র ১০ দিন আগে বসানো হবে।

সূর্যের বদলে বেগুনি আলো

যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো অঙ্গরাজ্যের এক বিশাল টার্ফ ফার্মে এখন বিশ্বকাপের জন্য বিশেষ ঘাস প্রস্তুত হচ্ছে। কর্মীরা সেখানে সার, সিলিকা, সামুদ্রিক শৈবাল এবং নানা উপাদান ব্যবহার করে ঘাস পরিচর্যা করছেন।

গম্বুজাকৃতির স্টেডিয়ামে ঘাস বসানোর পর সেখানে থাকবে বিশাল এলইডি গ্রো-লাইট। বেগুনি আভাযুক্ত এসব আলো সূর্যের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।

সোরোচান বলেন, ‘আপনি আলোয়ের নিচে দাঁড়িয়ে ঘাস কাটতে পারবেন, আর একই সময়ে ঘাস বাড়তেই থাকবে।’

কোটি ডলারের গবেষণা

ফিফা জানিয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের ঘাস গবেষণায় তারা ৫০ লাখ ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছে।

যদিও দর্শকেরা সাধারণত মাঠের ঘাস নিয়ে খুব একটা ভাবেন না, কিন্তু খেলাটির গতি, সৌন্দর্য এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করে এর ওপর।

অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের টার্ফ বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ গুয়ের্টাল বলেন, ‘এই গবেষণার সুফল ভবিষ্যতে স্থানীয় স্কুল মাঠ থেকেও শুরু করে সব স্তরের খেলায় কাজে লাগবে।’

বিশ্বকাপের উত্তেজনা, নাটকীয়তা আর কোটি মানুষের স্বপ্নের পেছনে তাই এবার নীরবে কাজ করবে এক টুকরো ঘাস।

বিবিসি থেকে ভাষান্তর: মাকসুদা রিনা

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন