Logo
Logo
×

ধর্ম

মাদরাসায় শিশু সুরক্ষায় কঠোর নীতিমালা ও জবাবদিহি জরুরি: আজহারী

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম

মাদরাসায় শিশু সুরক্ষায় কঠোর নীতিমালা ও জবাবদিহি জরুরি: আজহারী

মাদরাসা শুধু ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়, বরং শিশুদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধ গড়ে তোলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নির্যাতন প্রতিরোধ এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য।

কোনো শিক্ষার্থী যেন ভয়, নির্যাতন কিংবা অনিরাপদ পরিবেশের শিকার না হয়, সে জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি। এসব বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন ইসলামি আলোচক মিজানুর রহমান আজহারী।

শিশু সুরক্ষায় প্রয়োজন কার্যকর নীতিমালা

মাদরাসায় শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নির্যাতন প্রতিরোধ এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ইসলামি আলোচক মিজানুর রহমান আজহারী। এ লক্ষ্যে প্রতিটি মাদরাসায় শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা চালু এবং নির্যাতনের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন তিনি।

রোববার (২৫ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন আজহারী। তিনি বলেন, ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে মাদরাসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, পাঠদানের মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সংস্কারও জরুরি।

আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের সুযোগ থাকতে হবে

আজহারীর মতে, মাদরাসায় ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং আত্মসমালোচনার সুযোগ থাকা উচিত। নিজেদের উদ্যোগে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ সমাধানের ব্যবস্থা না নিলে বাইরের পক্ষগুলো এসব বিষয়কে কাজে লাগাতে পারে। এর ফলে পুরো মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা চাপের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি মনে করেন, সমস্যা আড়াল করার পরিবর্তে সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধানে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বাড়বে, অন্যদিকে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতাও শক্তিশালী হবে।

অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে গুরুত্ব

মাদরাসার অবকাঠামো, পাঠদানের মান, শিক্ষক নিয়োগ এবং তদারকি ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন আজহারী। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অনুযায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, কার্যকর নজরদারি এবং অভিযোগ জানানোর উপযুক্ত ব্যবস্থা রাখার কথা বলেন তিনি।

পাশাপাশি, শিক্ষকদের শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই করলেই চলবে না; শিশু মনস্তত্ত্ব, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ এবং শিশুদের মানসিক বিকাশ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, একজন শিক্ষকের আচরণ শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস ও শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

শারীরিক শাস্তি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান

শিশুদের শারীরিক শাস্তি, মারধর, নির্যাতন কিংবা অনুপযুক্ত স্পর্শের মতো আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করেন আজহারী। তার মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা রক্ষার নামে শিক্ষার্থীদের প্রতি অমানবিক আচরণের সুযোগ থাকা উচিত নয়। বরং শাসন ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মানবিকতা, দায়িত্বশীলতা এবং শিশুর মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হবে।

তিনি প্রতিটি মাদরাসায় কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়নের ওপর জোর দেন। এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা ভয়ভীতি ছাড়াই এবং নিজেদের পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার যথাযথ সুরক্ষা বজায় রেখে অভিযোগ জানাতে পারে। অভিযোগ জানানোর পর শিক্ষার্থী যেন কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক আচরণ বা হয়রানির শিকার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।

অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা

কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে বলে মনে করেন আজহারী। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।

গুরুতর অপরাধে জড়িত শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ব্যক্তিদের দায়িত্বে নিয়োগের ঝুঁকি প্রতিরোধ করতে হবে। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি— দুটিই জোরদার হবে।

নিবন্ধন, নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা জরুরি

মাদরাসার অনুমোদন ও নিবন্ধন, পাঠ্যক্রম, শিক্ষক নিয়োগ এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন আজহারী। এ ক্ষেত্রে আলেম-ওলামা, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, অভিভাবক, শিক্ষা কর্তৃপক্ষ এবং শিশু সুরক্ষায় কাজ করা সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

তার মতে, শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে সীমিত সম্পদের কারণে যেসব মাদরাসা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হিমশিম খাচ্ছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।

মাদরাসার মর্যাদা রক্ষায় প্রয়োজন ইতিবাচক সংস্কার

আজহারীর বক্তব্যের উদ্দেশ্য মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়। বরং শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মাদরাসার প্রতি মানুষের আস্থা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখাই তাঁর বক্তব্যের মূল লক্ষ্য।

মাদরাসা শিক্ষার ইতিবাচক দিকগুলো ধরে রাখার পাশাপাশি যেসব ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও সংস্কার প্রয়োজন, সেগুলোতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা আরও নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি অভিভাবকদের আস্থা আরও সুদৃঢ় হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি নৈতিক, মানবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও। মাদরাসায় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পরিবেশ, নিরপেক্ষ তদন্ত, যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক, কার্যকর তদারকি এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা— এসবের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা।

মাদরাসার প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা করতে হলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আড়াল না করে সেগুলোর ন্যায়সংগত সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা এবং অপরাধের ক্ষেত্রে যথাযথ জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা গেলে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা আরও দায়িত্বশীল, আস্থাশীল ও মানসম্মত হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হোক মাদরাসা শিক্ষার উন্নয়ন ও সংস্কারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন