ছবি : সংগৃহীত
শবেবরাত ইসলাম ধর্মে অনুসারীদের আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার অন্যতম একটি মাধ্যম। কারণ ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ নাজাত বা মুক্তি। অর্থাৎ শবেবরাত হলো মুক্তির রাত। এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগত বান্দাদের ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। তবে কিছু লোক আছেন, যারা আল্লাহর কাছ থেকে এই রাতেও ক্ষমা পাবেন না। এই রাতে তাদের ভাগ্যে ক্ষমা নেই।
ক্ষমালাভের এমন বিশেষ সময়েও যারা আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হবেন তাদের পরিচয় সম্পর্কে হাদিসে এসেছে। বিখ্যাত সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন— ‘আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে অর্থাৎ শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫)
হাদিস শরিফে আরও বর্ণিত হয়েছে, এই রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। কিন্তু সাত শ্রেণির মানুষের জন্য কোনো ক্ষমা বা কল্যাণের অংশ থাকে না। তারা হলো:
১. জাদুকর
২. শরাবখোর তথা মদ্যপানকারী বা নেশাকারী
৩. জিনাকারী তথা ব্যভিচারী ব্যক্তি
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী
৫. পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান
৬. গিবত বা পরনিন্দাকারী
৭. কৃপণ ব্যক্তি (দান ও কল্যাণে) এবং সেই হিংসুক ব্যক্তি যে তিন দিনের বেশি অপর মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ রাখে।
এ ছাড়াও আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানের রাতে পৃথিবীবাসীর প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ছাড়া তার সৃষ্টির সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৩৯০)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, শবে বরাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জন্য করুণা ও ক্ষমার দরজা উন্মুক্ত করে দেন। কিন্তু দুই দল মানুষকে এই রাতেও ক্ষমা করা হয় না। তারা হলো—মুশরিক (অংশিবাদী) ও মুশাহিন (হিংসুক)।
১. মুশরিক
শিরকে লিপ্ত ব্যক্তিকে মুশরিক বলা হয়। শিরক মানে বিশ্বজাহানের একচ্ছত্র অধিপতি মহান আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা। মূর্তিপূজা, কবরপূজা, পীরপূজা—ইত্যাদি যেকোনোভাবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করাই শিরক।
শিরক আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত ও জঘন্যতম পাপ। কোরআনে শিরককে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জুলুম বলা হয়েছে এবং বিভিন্ন আয়াতে বারবার শিরক থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করা ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর যে আল্লাহর সঙ্গে শরিক করে, সে এক মহাপাপ করে।’ (সুরা নিসা: ৪৮)
২. মুশাহিন
মুশাহিন সেই ব্যক্তি, যার অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ ও পরশ্রীকাতরতা রয়েছে। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী বা মুসলমান ভাইয়ের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে এবং অন্যের অকল্যাণ কামনা করে।
ইসলাম সবার কল্যাণকামী হওয়ার নির্দেশ দেয় এবং হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করতে নিষেধ করে। নবীজি (সা.) মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে সম্প্রীতি ও ভালোবাসা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, হিংসা করো না, সম্পর্ক ছিন্ন করো না এবং আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (সহিহ মুসলিম: ৬২৯৫)
ইসলামে হিংসা অত্যন্ত ঘৃণিত ও নিষিদ্ধ কাজ। হিংসার কারণে মানুষের নেক আমল ধ্বংস হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাকো। হিংসা নেক আমল ধ্বংস করে দেয়, যেমন আগুন লাকড়ি ধ্বংস করে দেয়।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯০৫)
হিংসা কোনো মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। ইমান ও হিংসা পরস্পর সাংঘর্ষিক। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘কোনো বান্দার অন্তরে ইমান ও হিংসা একত্রিত হতে পারে না।’ (সুনানে নাসাঈ: ৩১০৯)
অতএব, যার অন্তর হিংসা-বিদ্বেষে কলুষিত থাকে, সেও শবে বরাতে আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও রহমত থেকে বঞ্চিত হয়।



