আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় হাজার বছরের জ্ঞানতীর্থ
অনলাইন ডেস্ক :
প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৩ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ইসলামি ঐতিহ্য, আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান এবং উন্নত চিন্তাধারার এক অপূর্ব সমন্বয় হলো আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। ফাতেমীয় খিলাফতের স্বর্ণালি যুগে কায়রোর পুণ্যভূমিতে যে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, কালের বিবর্তনে সেই মসজিদটিই আজ বিশ্বজুড়ে ‘আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। ‘আল-আজহার’ নামকরণের মূলে রয়েছে মহীয়সী রমণী রাসূলকন্যা হজরত ফাতেমা (রা.)-এর পবিত্র স্মৃতি। তার মহিমান্বিত উপাধিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ‘আয-যাহরা’, যার অর্থ ‘উজ্জ্বল (Luminous)’ বা ‘দীপ্তিমান (Fulgente)’। দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় একটি সাধারণ মসজিদ থেকে বিশ্বখ্যাত ‘আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়’ হয়ে ওঠার ইতিবৃত্ত সংক্ষেপে নিচে তুলে ধরছি।
ফাতেমীয় শাসনামল
ফাতেমীয় খলিফা আল-মুইজ-এর শাসনামলে ৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে মিশর জয়ের পর সেনাপতি জওহর আল-সিকিল্লি নতুন রাজধানী ‘আল-কাহিরা’ (কায়রো) গড়ে তোলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৯৭০ থেকে ৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয় ঐতিহাসিক আল-আজহার মসজিদ। শুরুতে আল-আজহার ছিল শুধু একটি ইবাদতখানা। যেখানে ইবাদতের পাশাপাশি ছোট পরিসরে মক্তবভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হতো। তবে কয়েক দশক পর জ্ঞানী ও দক্ষ শিক্ষকদের হাত ধরে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। দশম শতাব্দীর শেষের দিকে ইবনে কিলিস (৯৩০-৯৯১ খ্রি.) ও ইবনে নুমান (৯০৩-৯৭৪ খ্রি.)-এর মতো বিখ্যাত আইনবিদরা এখানে যোগ দিলে আল-আজহারের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীরা এখানে ভিড় করতে শুরু করেন। তৎকালীন পাঠ্যসূচিতে কুরআন ও ইসলামি আইনের (ফিকহ) পাশাপাশি যুক্তিবিদ্যা, আরবি ব্যাকরণ, দর্শন এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের চন্দ্রগণনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে এখানে প্রথম ছাত্রাবাস নির্মিত হয় এবং ইবনে কিলিসের বিশেষ অনুরোধে তৎকালীন খলিফা শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি বৃত্তি চালু করেন। পরবর্তী সময়ে ১০০৫ সালে একটি সমৃদ্ধ গবেষণা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজার হাজার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত ছিল। এমনকি জ্ঞানচর্চায় উৎসাহ দিতে পণ্ডিতদের বিনামূল্যে কাগজ, কলম ও কালি সরবরাহ করা হতো। তৎকালীন খলিফা এবং ধনীদের উদার অনুদানের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান বিদ্যাপীঠে পরিণত হয়।
আইয়ুবির শাসনামল
ফাতেমীয়দের পতনের পর ১১৬০-এর দশকের শেষে সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবি ক্ষমতা গ্রহণ করলে আল-আজহারের ইতিহাসে এক বড় পরিবর্তন আসে। বিদ্যাপীঠটি মূলত শিয়া মতাদর্শে চলত এবং সেখানকার অনেক শিক্ষকই ছিলেন শিয়া মতাদর্শী। কিন্তু নতুন শাসক সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ছিলেন সুন্নি মতের অনুসারী। মতাদর্শের এ পার্থক্যের কারণে তিনি এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি তেমন আগ্রহী ছিলেন না। ফলে সরকারিভাবে শিক্ষকদের বেতন এবং শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও উপবৃত্তি দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আর এ আর্থিক সংকটে পড়ে অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। এ সময় ফাতেমীয়দের তৈরি বিশাল লাইব্রেরিটিও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আল-আজহারের প্রতি কঠোর মনোভাব থাকলেও সালাউদ্দিন মিশরে কলেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় এক স্থায়ী অবদান রাখেন। এ ব্যবস্থার ফলে মসজিদের আঙ্গিনায়ই আলাদা শ্রেণিকক্ষসমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত ছাত্রাবাস গড়ে ওঠে। বিদ্যাপীঠটিতে নতুন ব্যবস্থাপনার ফলে ১২৫৮ সালে প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ আবদুল লতিফের (১১৬২-১২৩১ খ্রি.) মতো বিখ্যাত গুণী মানুষ এখানে শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন।
মামলুক শাসনামল
১২৬০-এর দশকে মামলুকরা ক্ষমতায় আসার পর আল-আজহারকে আবারও সক্রিয় করে তোলেন এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া শুরু করেন। আইয়ুবি আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি ও উপবৃত্তি এবং শিক্ষকদের বেতন চালু করার পাশাপাশি তারা এ প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য প্রচুর অর্থ ও সম্পদ দান করেন। ১৩৪০ সালে মসজিদের পাশে একটি বিশাল কলেজ ভবন নির্মাণ করা হয়, যা শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত করে। মামলুকদের শাসনামলে আল-আজহার ইসলামি আইন ও আরবি শিক্ষার জন্য বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং সারা দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে আসতে শুরু করেন। এ সময় অন্ধ বালকদের পড়ালেখায় উৎসাহিত করতে বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়। মামলুকদের দেওয়া সম্মান ও সুযোগ-সুবিধার কারণে ১৩৮৩ সালে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুনের (১৩৩২-১৪০৬ খ্রি.) মতো বিশ্বখ্যাত পণ্ডিতরা এখানে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৪০০-এর দশকের শেষের দিকে মামলুকদের ১৮তম সুলতান কায়েতবে (১৪১৬-১৪৯৬ খ্রি.) পুরো মসজিদটি সংস্কার করেন এবং শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য নতুন ও আধুনিক ছাত্রাবাস নির্মাণ করে আল-আজহারের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেন।
অটোমান বা তুর্কিদের শাসনামল
১৫১৭ সালে অটোমান তুর্কিরা মিশর দখলের সময় কায়রোতে অনেক যুদ্ধবিগ্রহ চালালেও আল-আজহারে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের ক্ষতি করেনি এবং এ প্রতিষ্ঠানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখায়। তুর্কিদের শাসনামলে আল-আজহার সারা বিশ্বের মুসলমানদের প্রধান শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। এ সময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান পদের নাম দেওয়া হয় ‘শায়খুল আজহার’, যা আজ পর্যন্ত চালু আছে। প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য তখন শিক্ষার্থীদের জাতীয়তা ও মাজহাব অনুযায়ী আলাদা আলাদা দলে ভাগ করা হয়েছিল। সে সময় আল-আজহারে আধুনিক বিজ্ঞানের চর্চা খুব একটা ছিল না। তা সত্ত্বেও ১৭৪৮ সালে কায়রোর তুর্কি শাসক আহমেদ পাশা (১৬৯১-১৭৪৮ খ্রি.) গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে পণ্ডিতদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য একটি সূর্যঘড়ি (Sundial) উপহার দিয়েছিলেন।
ফরাসি শাসনামল
১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের মিশর জয়ের মাধ্যমে আল-আজহারে আধুনিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। ফরাসিদের আনা মুদ্রণযন্ত্রের (Printing Press) ফলে শিক্ষার্থীরা মুখস্থ করার বদলে প্রথমবারের মতো মূল বই পড়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায়। ফরাসিদের মাধ্যমে আসা পাশ্চাত্য জ্ঞান ও সংস্কৃতির প্রভাবে ১৮৩০-এর দশকে আল-আজহারের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা (Rector) ফরাসি ভাষা শেখেন এবং পরবর্তী সময়ে পাঠ্যসূচিতে গণিত ও বিজ্ঞানের মতো আধুনিক বিষয়গুলো যুক্ত করেন।
আধুনিকায়ন ও বর্তমান পরিসর
১৮৮২ সালে ব্রিটিশরা মিশর দখল করলে তাদের শাসনামলে আল-আজহারকে আধুনিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার কাজ গতি পায়। এ সময় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশাল কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য আধুনিক ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। ১৮৮৫ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন আইনি সংস্কারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো ও ছাত্র সংসদ গড়ে তোলা হয়। একইসঙ্গে মিশরের তৎকালীন গ্র্যান্ড মুফতি মুহাম্মদ আবদুহ (১৮৪৯-১৯০৫ খ্রি.) নিয়মিত পরীক্ষা পদ্ধতি ও নতুন কোর্স চালু করে শিক্ষার মান বৃদ্ধি করেন। দীর্ঘদিনের এসব সংস্কার ও আধুনিকায়নের ফলে ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করে। দীর্ঘ সংস্কার প্রক্রিয়ার পর ১৯৩৬ সালে আল-আজহার আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসাবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করে।
১৯৫২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গামাল আবদেল নাসের প্রতিষ্ঠানটিকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন এবং ১৯৫৮-৫৯ সালে উচ্চশিক্ষার এক হাজার বছর পূর্তি উদ্যাপন করেন। এরপর ১৯৬১ সালে একটি যুগান্তকারী আইনের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এখানে নারীদের উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করা হয় এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও ইসলামি ঐতিহ্যের সমন্বয়ে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়।
বর্তমানে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান অর্জনের এক বিশাল ও প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সমকালীন তথ্য অনুযায়ী কায়রোসহ মিশরের বিভিন্ন প্রান্তে বিস্তৃত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৮১টি অনুষদ (Faculties) এবং ৩৬০টিরও বেশির বিভাগ (Department) রয়েছে, যেখানে ইসলামি শাস্ত্রের পাশাপাশি চিকিৎসা, প্রকৌশল, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পড়ানো হয়। বর্তমানে এখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষাধিক, যাদের একটি বিশাল অংশ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে আসা বিদেশি শিক্ষার্থী। এ বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীকে শিক্ষা প্রদানে প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষক ও গবেষক নিরন্তর নিয়োজিত আছেন। আর এভাবেই হাজার বছরের ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে ‘আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়’ আজ মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে প্রভাবশালী বিদ্যাপীঠ হিসাবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ



