ঝুঁকিমুক্ত প্রশাসন গড়তে সতর্ক বিএনপি সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৩ এএম
বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পদে শুধু আস্থাভাজন এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের রাখতে চায়। সরকারসংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ক্ষমতার প্রথম পাঁচ মাসে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে অনেক বিষয়ে কৌশলগত সংযম দেখানো হলেও এখন আর কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা গোষ্ঠীর কারণে সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সুযোগ রাখা হবে না।
সূত্রগুলোর দাবি, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এমন কাউকে রাখা হবে না, যাদের নিরপেক্ষতা বা সরকারের প্রতি আস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে ‘ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র’ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরকারের আস্থার বাইরে থাকা কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনাও নেই। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী বা তাদের সঙ্গে এখনো যোগাযোগ থাকতে পারে বলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের স্পর্শকাতর পদে না রাখার বিষয়ে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এ কারণে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতদের ওপর নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
তবে সরকারঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর দাবি, এ বিষয়ে কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, তথ্য যাচাই এবং সতর্ক মূল্যায়নের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন অভিযোগে ইতোমধ্যে প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ৬৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রশাসনের ৯ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে অর্ধশতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা, ১৩ জন সচিব, ২২ জন জেলা প্রশাসক এবং চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ১০১ জন কর্মকর্তাকেও অবসরে পাঠানো হয়েছিল।
সূত্র জানিয়েছে, সরকারের মূল্যায়নে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগের বার্তা দেওয়া হয়। পরে শুক্রবার তিনি পদত্যাগ করেন। একই সঙ্গে দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রে জড়িত হতে পারেন, এমন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিষয়েও সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এখনই কোনো নাম প্রকাশ করতে রাজি হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের সিনিয়র একাধিক মন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার পরিবর্তনের পর গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভবিষ্যতে কে কোন দায়িত্বে থাকবেন, তা যথাসময়ে স্পষ্ট হবে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগের বিষয় নয়। তাদের দাবি, আগের সরকারের ঘনিষ্ঠদের একটি অংশ এখনো দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে সরকারের কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টা করছে। তাই প্রশাসনে প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের অপসারণ জরুরি।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও সরকার অত্যন্ত সতর্ক কৌশল অনুসরণ করছে। অতীতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে বিএনপির অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। ২০০১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে পদত্যাগ করেন। পরে অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের মেয়াদকালেও রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার সরকার ঝুঁকি এড়িয়ে একজন অভিজ্ঞ, বিচক্ষণ এবং দলের নীতি-আদর্শের প্রতি আস্থাশীল ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে আনতে চায় বলে সূত্রের দাবি।
সরকারসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এই সতর্কতা শুধু অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বাইরের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের এক সাংবাদিকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্ট দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি করেছে। একই সময়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টিও সামনে আসে। এসব ঘটনার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সরকার ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার বক্তব্যকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। সামনে ৫ আগস্ট এবং ১৫ আগস্টকে ঘিরে কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে কি না, তা নিয়েও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নজরদারি বাড়িয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি মেট্রো স্টেশনের নিচ থেকে বোমা উদ্ধারের ঘটনাও সরকারের নজরে এসেছে। এসব ঘটনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং কারা নেপথ্যে থাকতে পারে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনার সঙ্গে কারা যোগাযোগ রক্ষা করছেন, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
সরকারের প্রভাবশালী একজন মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জানিয়েছেন, সম্ভাব্য সব ঝুঁকি সরকারের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। কারা সরকারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারেন এবং কারা রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করবেন, তা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেছেন, বিএনপি প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। তবে যারা রাষ্ট্রের ভেতরে থেকে রাষ্ট্রের ক্ষতির চেষ্টা করবে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা হবে না। তাঁর ভাষ্য, তদন্ত ও যাচাইয়ের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়াই গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার অংশ।
দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ উল্লেখ করেছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন সরকার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নিজেদের আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়োগ দেবে, সেটিই স্বাভাবিক। তাঁর মতে, অভ্যুত্থানের পরপরই রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দিলে প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারত। তাই ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে তাঁকে কিছু সময় দায়িত্বে রাখা হয়েছিল।
আলতাফ পারভেজ আরও উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ মূলত প্রতীকী। তার মূল্যায়ন, রাষ্ট্রপতি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়োগের মাধ্যমে সরকার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে চাইছে, যাতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়ানো যায়।



