নির্বাচনী ইশতেহার
চাকরি নয় কর্মসংস্থান ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি জামায়াতের
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:৩৯ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ দলটির প্রার্থীরা। প্রচারণায় ভোটারদের সামনে প্রচলিত ধাঁচের বাইরে গিয়ে বাস্তবভিত্তিক ও চমকপ্রদ প্রতিশ্রুতি দিতে শোনা যাচ্ছে তাদের কণ্ঠে।
এই প্রেক্ষাপটে বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করছে জামায়াতে ইসলামী। দলীয়ভাবে এই ইশতেহারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। রাজধানীর বনানীতে হোটেল শেরাটনে সন্ধ্যায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইশতেহারটি প্রকাশ করা হবে।
অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার, কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
ইশতেহার প্রণয়নে যুক্ত জামায়াতের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, এটি কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়; বরং রাষ্ট্র সংস্কারের একটি সমন্বিত ঘোষণাপত্র। সহানুভূতির ভাষা নয়, অধিকার, ন্যায্যতা ও বাস্তবায়নযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করেই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের ইশতেহারে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও শুদ্ধাচারের অঙ্গীকারের পাশাপাশি বেকার যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুদমুক্ত ঋণ, নারীর সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রদান এবং ব্যবসায়ীদের জন্য স্থিতিশীল ও নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশের প্রতিশ্রুতি থাকছে। ট্যাক্স না বাড়িয়ে বিদ্যমান কর আদায় নিশ্চিত করা, তেল-গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ঘোষণাও রয়েছে এতে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আমরা চাকরিনির্ভর রাষ্ট্র চাই না। উৎপাদন, উদ্যোগ ও দক্ষতার মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি জানান, জনগণের সরাসরি মতামতের ভিত্তিতে ইশতেহার প্রণয়নের লক্ষ্যে ‘জনতার ইশতেহার’ নামে ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়। গত ১০ ডিসেম্বর চালুর পর এ প্ল্যাটফর্মে ৩৭ হাজারের বেশি মতামত পাওয়া গেছে, যা জাতীয়, পেশাভিত্তিক ও অঞ্চলভিত্তিক নানা ক্যাটাগরি থেকে এসেছে। লিখিত মতামতের পাশাপাশি অডিও ও ভিডিও মতামতও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ইশতেহারে তিন ধরনের প্রতিশ্রুতি থাকছে— স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। জামায়াত দেশের সবচেয়ে বড় সামাজিক সংকট হিসেবে বেকার যুবসমাজকে চিহ্নিত করছে। এ কারণে সরকারি চাকরির সংখ্যা বাড়ানোর বদলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
শিল্প, কৃষি, আইটি ও সেবা খাতকে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় এনে জেলা পর্যায়ে কারিগরি ও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, যুব উদ্যোক্তাদের জন্য সুদমুক্ত স্টার্টআপ তহবিল এবং ফ্রিল্যান্সিং ও রিমোট কাজের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা কাঠামোর কথা থাকছে ইশতেহারে।
নারী ইস্যুতে জামায়াতের অবস্থান নিরাপত্তা ও মর্যাদাকেন্দ্রিক। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, ডে-কেয়ার সুবিধা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনে দ্রুত বিচারের অঙ্গীকার রয়েছে ইশতেহারে। পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা ও গৃহভিত্তিক শিল্পে প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও থাকছে।
কৃষকদের ক্ষেত্রে ভর্তুকিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছে জামায়াত। ন্যায্যমূল্য আইন, উৎপাদন খরচ নির্ধারণ করে ন্যূনতম মূল্য ঘোষণা এবং সুদমুক্ত কৃষিঋণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইশতেহারে। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, ইউনিয়ন পর্যায়ে হিমাগার এবং কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বিশেষ উদ্যোগের কথাও বলা হয়েছে।
অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ব্লু ইকোনমিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। মৎস্য, জাহাজ নির্মাণ, নৌপরিবহন ও সামুদ্রিক পর্যটন খাতকে একীভূত করে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকছে ইশতেহারে। উপকূলভিত্তিক আলাদা ইকোনমিক জোন ও সামুদ্রিক গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তাকে দয়া নয়, রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে তুলে ধরে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে স্বচ্ছতা ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বাস্তবভিত্তিক ও সম্মানজনক বেতন কাঠামো এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ার ঘোষণাও ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ ও উৎকোচমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে আগামী দুই বছর গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াতের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে নতুন করে কর না বাড়িয়েও রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই ‘জনতার ইশতেহার’-এ একটি ন্যায়ভিত্তিক, জনবান্ধব ও দায়িত্বশীল বাংলাদেশের রূপরেখা তুলে ধরা হবে।



