পোস্টারহীন প্রচারে ঝুঁকছে রাজনীতি, অনলাইনে বাড়ছে ডলার ব্যয় ও নজরদারির প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪৫ এএম
নির্বাচনী প্রচারের চেনা দৃশ্যপট এবার বদলে গেছে। দেয়ালজুড়ে স্লোগান, অলিগলিতে পোস্টারের জঙ্গল বা ব্যানার–ফেস্টুনের ভিড় আর চোখে পড়ছে না। নির্বাচন কমিশনের বিধিমালায় পোস্টার ও দেয়াললিখন নিষিদ্ধ হওয়ায় প্রার্থীরা প্রচারের ধরন বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। সেই শূন্যতা পূরণ করছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সংবাদভিত্তিক, বিনোদন ও ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট।
এর ফলে প্রচারের বাজেটেও এসেছে বড় পরিবর্তন। পোস্টার ছাপা, দেয়াল রং কিংবা ব্যানার লাগানোর খরচ কমিয়ে প্রার্থীরা অর্থ ঢালছেন ডিজিটাল মাধ্যমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন, কনটেন্ট তৈরি, পেজ পরিচালনা, ডেটা বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে গড়ে উঠছে আলাদা ‘ডিজিটাল টিম’। ডিজিটাল প্রচারের এই বিস্তার নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করলেও ব্যয়, স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে।
ডিজিটাল প্রচার প্রসঙ্গে সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এটি এখন বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। তবে অপব্যবহার ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনের একটি আলাদা মনিটরিং ইউনিট থাকা প্রয়োজন।
প্রার্থীদের ডিজিটাল টিমগুলো নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি, পোস্টের রিচ বাড়ানো, মন্তব্যে প্রতিক্রিয়া জানানো এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রচার নজরদারির কাজ করছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ফেসবুক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুধু সাম্প্রতিক এক সপ্তাহেই ফেসবুক বিজ্ঞাপনে প্রার্থীদের ব্যয় হয়েছে ৪১ হাজার ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫০ লাখ টাকারও বেশি।
ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যয়ের দিক থেকে এখন পর্যন্ত শীর্ষে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৭ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হুমাম কাদের চৌধুরী। আর অনুসারীর সংখ্যায় এগিয়ে আছেন ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা। প্রচারের বাকি দিনগুলোতে এই ব্যয় আরও বাড়বে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
মেটার ‘অ্যাড লাইব্রেরি’ তথ্য অনুযায়ী, ১৭ থেকে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে ব্যয় হয়েছে ৪১ হাজার ৯১৫ ডলার। ২৫ ডিসেম্বর থেকে ২৩ জানুয়ারি এক মাসে এই ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ডলার এবং তিন মাসে ২ লাখ ৭২ হাজার ডলারের বেশি।
ডিজিটাল প্রচারে কর্মী নিয়োগেও ব্যয় বাড়ছে। কেউ অর্থের বিনিময়ে, কেউ স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে কাজ চালাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন ডা. তাসনিম জারা। তিনি ফেসবুকে ৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে ক্যাম্পেইন শুরু করে ২৪ ঘণ্টায়ই পেয়েছেন ৮ হাজারের বেশি সাড়া।
নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহেও অনলাইন মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফেসবুকে ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যে তাসনিম জারা সংগ্রহ করেছেন প্রায় ৪৭ লাখ টাকা। জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ একাধিক দলও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তহবিল সংগ্রহ করছে।
এদিকে রিলস প্রতিযোগিতা, সমর্থকদের মতামত নেওয়া, ভিডিও ও গান প্রকাশসহ নানা কৌশলে চলছে প্রচার। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্কতার কথা বলছেন। ফ্যাক্টচেকিং প্রশিক্ষক শুভাশীষ দীপ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য বা এআই দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই প্রচারকারী ও দর্শক—দুই পক্ষকেই সচেতন থাকতে হবে।
মেটার তথ্য অনুযায়ী, গত সাত দিনে ডলার ব্যয়ের শীর্ষ ২০ পেজের মধ্যে ১৫টিই রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক দল–সংশ্লিষ্ট। তবে অনেক নামহীন বা ছদ্মনামের পেজ থেকেও প্রচার চালানো হচ্ছে। ফলে প্রকৃত ব্যয়ের সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের বিষয়ে বিধিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। নির্বাচন শেষে প্রার্থীদের ডিজিটাল ব্যয়ের হিসাব দাখিল করতে হবে এবং তা যাচাই করা হবে।
তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক প্রার্থী এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম–সংক্রান্ত তথ্য জমা দেননি। এ অবস্থায় ডিজিটাল প্রচার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে নজরদারি, স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ।



