Logo
Logo
×

রাজনীতি

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির ওয়ার্ড কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের অসন্তোষ

Icon

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি :

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৫, ০৩:৫২ পিএম

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির ওয়ার্ড কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের অসন্তোষ

ছবি -কমিটি বাতিলের দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ

চট্টগ্রাম নগর বিএনপির ওয়ার্ড কমিটি নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কমিটিতে দলের ‘ত্যাগী’ নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ তাঁদের। তাঁরা কমিটি বাতিলের দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভও করেছেন। ঘটেছে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও

মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় গত বছরের ৩ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নগরের সাংগঠনিক ১৫টি থানা ও ৪৩টি ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে নগর বিএনপি। পরে সাংগঠনিক ওয়ার্ড আরও পাঁচটি বাড়িয়ে করা হয় ৪৮টি। এরপর গত ৪ জুন নগরের ৩৫টি ওয়ার্ডে আহ্বায়ক, যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব নিয়ে ৩ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ২৪ জুন ৩১টি ওয়ার্ডে পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে কমিটি গঠন করা হয়েছে ৩১ সদস্যের।

পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন হওয়া ৩১টি ওয়ার্ডের মধ্যে অন্তত ২০টিতে কমিটিকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। এতে ‘ত্যাগী নেতাদের’ মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অভিযোগ তোলেন বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা। কমিটি পুনর্গঠন করা না হলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।
নগর বিএনপির অনেক নেতাও কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে তৃণমূলে অসন্তোষ দেখা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেন, দলে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় নেতাকর্মীদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা না হলে তাঁদের নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

চট্টগ্রামে গত বছরের ৭ জুলাই এরশাদ উল্লাহকে আহ্বায়ক ও নাজিমুর রহমানকে সদস্যসচিব করে আংশিক নগর কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। ওই বছর ৪ নভেম্বর ঘোষণা করা হয় ৫৩ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি। এর আগে চট্টগ্রাম নগর বিএনপিতে শাহাদাত হোসেন সভাপতি, আবুল হাশেম সাধারণ সম্পাদক ও আবু সুফিয়ান সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন। সদ্য গঠিত বিভিন্ন ওয়ার্ড কমিটিতে এই তিন নেতার অনুসারীদের বেশির ভাগই বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানতে চাইলে নগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব আবুল হাশেম বলেন, যাঁরা দুঃসময়ে দলের হাল ধরেছেন, হামলা-মামলার শিকার ও গ্রেপ্তার হয়েছেন, এ রকম ত্যাগী নেতাকর্মীদের বেশির ভাগ ওয়ার্ড কমিটিতে পদ পাননি। এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কমিটি গঠনের আগে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাছ থেকেও ত্যাগী নেতাদের বিষয়ে মতামত নেওয়া হয়নি।

কমিটি গঠনের পর বিক্ষোভ কর্মসূচি হয়েছে নগরের জালালাবাদ, পাঁচলাইশ, উত্তর চান্দগাঁও, মোহরা, পূর্ব ষোলশহর, পশ্চিম ষোলশহর, উত্তর পাহাড়তলী, লালখান বাজার, বাগমনিরাম, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, দেওয়ান বাজার, পাঠানটুলি, আলকরণ, আন্দরকিল্লা, গোসাইলডাঙ্গা, উত্তর পতেঙ্গা, মধ্যম হালিশহর, আমিন শিল্পাঞ্চল ও দক্ষিণ চান্দগাঁও ওয়ার্ডে। এ ছাড়া উত্তর পতেঙ্গা, রামপুর, পশ্চিম মাদারবাড়ি, উত্তর পাঠানটুলি, দক্ষিণ কাট্টলীসহ অন্তত সাতটি ওয়ার্ডে নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।


আগের কমিটির ৯৬ জনের মধ্যে পদ পেয়েছেন মাত্র ৩ জন

নগরের ৩ নম্বর পাঁচলাইশ ওয়ার্ডে বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়েছে শামসুল আলমকে। সদস্যসচিব করা হয়েছে সোলায়মান বাদশাকে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা জানান, শামসুল আলম দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। গত ১০ বছর দলীয় কোনো কর্মকাণ্ডে ছিলেন না। আর সদস্যসচিব সোলায়মান বাদশা নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ২০১৭ সালে তিনি দেশে আসেন।

পাঁচলাইশ ওয়ার্ডে বিগত কমিটিতে সভাপতি ছিলেন মো. ইলিয়াস। এস এম আবুল কালাম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কালামের নামে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলা হয় ১২টি। এবার আহ্বায়ক পদপ্রত্যাশী ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁকে কমিটিতেই রাখা হয়নি। এস এম আবুল কালাম নগর বিএনপি নেতা আবুল হাশেম ও সুফিয়ানের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
দলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক পদ পাওয়া শামসুল আলম দীর্ঘদিন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়। তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ নেই। কমিটিতে নতুন যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে খোরশেদ আলমকে। তিনিও নিষ্ক্রিয় রয়েছেন দীর্ঘদিন। আগের কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম কমিটি থেকে বাদ পড়েছেন। এ ছাড়া সদস্যপদ পাওয়া মো. মনসুর, মো. তৈয়ব, মো. আতিকসহ কয়েকজন বিএনপির সমর্থক হিসেবে পরিচিত হলেও দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন না।

আগের কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম আবুল কালাম বলেন, ‘আমাদের ৯৬ জনের কমিটির মধ্যে মাত্র ৩ জনকে নতুন কমিটিতে রাখা হয়েছে, তা–ও সদস্য হিসেবে। যাঁরা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের কাউকে রাখা হয়নি। আমরা যাঁরা পুলিশি গ্রেপ্তার এড়াতে মাসের পর মাস বাইরে রাত কাটিয়েছি, লাঠিপেটা খেয়ে মিছিলে অংশ নিয়েছি, তাঁরা কেউ কমিটিতে নেই। যাঁরা বিদেশে ছিলেন, নিষ্ক্রিয় ছিলেন, তাঁদের টাকার বিনিময়ে রাখা হয়েছে।’

পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের আগেই পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের আংশিক কমিটি বাতিলের দাবিতে ৪ ও ৯ জুন নগরের অক্সিজেন নয়াহাট এলাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ হয়। এতে বক্তারা বলেন, হাইব্রিড ও আওয়ামী দোসরদের নিয়ে করা কমিটি বিলুপ্ত করে ত্যাগীদের দিয়ে নতুন কমিটি করতে হবে। নইলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা।


পদবঞ্চিত ব্যক্তিদের মিছিলে হামলা

২৮ নম্বর পাঠানটুলি ওয়ার্ডে মো. জসিমকে আহ্বায়ক, ইয়াসিন রাজুকে সদস্যসচিব এবং জিয়াউর রহমানকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের আংশিক আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয় জুন। কিন্তু ইয়াসিনকে দলে নিষ্ক্রিয় দাবি করে তাঁকে সদস্যসচিব করায় কমিটি বাতিলের দাবি জানায় দলের নেতাকর্মীদের একটি অংশ। তাঁরা কমিটি গঠনের পরদিন আগ্রাবাদের বাদামতলী মোড়ে ঝাড়ুমিছিল বের করেন। নতুন কমিটির পক্ষের লোকজন ওই মিছিল হামলা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনায় তিনজন আহত হন। এ সময় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা ইয়াসিনকে ধাওয়া দিলে তিনি একটি ভবনে গিয়ে আশ্রয় নেন। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে।

কমিটি বাতিলের দাবিতে করা ওই মিছিলে ছিলেন এলাকার প্রবীণ বিএনপির কর্মী কবির আহমদ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দোসরদের নিয়ে কমিটি হয়েছে। এই কমিটি বিলুপ্ত করতে হবে।


আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠদের পদ দেওয়ার অভিযোগ

১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ড বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়েছে মোহাম্মদ মহিউদ্দিনকে। তিনি ওই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিনের ছোট ভাই। একই ওয়ার্ডে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে মোহাম্মদ আইয়ুবকে। তাঁর বড় ভাই মোহাম্মদ হারুনর রশীদ একই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের হয়ে কাউন্সিলর ছিলেন। ওয়ার্ডে বিএনপির সদস্যসচিব করা হয়েছে প্রায় ১৬ বছর ধরে দলে নিষ্ক্রিয় মোহাম্মদ আজগরকে।

৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছে কামাল পারভেজকে। তিনি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বিএনপি ছেড়েছিলেন। এরপর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক কাউন্সিলর জহুরুল আলমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। জহুরুলের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতেও অংশ নিতেন।

১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া ওয়ার্ডের বিএনপির সদস্যসচিব করা হয়েছে এয়াকুব চৌধুরীকে। তিনি ওই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সাবেক কাউন্সিলর নুরুল আলম মিয়ার ভাগনে। আবার এয়াকুবের স্ত্রী শিউলি শবনম মুন্সিগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক। ১২ ফেব্রুয়ারি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে হামলার মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই ওয়ার্ডের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইউনুছের ভাগনে ওয়ার্ড ছাত্রলীগের নেতা। ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ড বিএনপির সদস্যসচিব করা হয়েছে মোস্তাফিজুর রহমানকে। তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

নতুন কমিটির বেশির ভাগ নেতা আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগ করেন নগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান। তিনি বলেন, ত্যাগীদের যদি মূল্যায়ন করা না হয়, আর স্বৈরাচারের সঙ্গে আঁতাতকারীদের যদি দলে পদ দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। যার খেসারত সবাইকে দিতে হবে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন পর ওয়ার্ড কমিটিগুলো হচ্ছে। দলে হাইব্রিডরা যাতে আসতে না পারেন যাচাই-বাছাই হয়েছে। এরপরও ভুলত্রুটি হতে পারে। দলের ত্যাগী যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁদের থানা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এত বড় দলে সবাইকে সমানভাবে খুশি করা যায় না। সবাই পদ প্রত্যাশী। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কারও কাছ থেকে অনৈতিক কোনো সুবিধা নিয়ে পদ দেওয়া হয়নি। কে কার অনুসারী তা দেখা হয়নি, বিএনপির কর্মী এটিই বড় পরিচয় হিসেবে দেখা হয়েছে।



Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন