Logo
Logo
×

মতামত

হাঙরের শাবক খুলছে জন্মস্থানের রহস্য

Icon

ম্যাথিউ পন্সফোর্ড

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:০১ পিএম

হাঙরের শাবক খুলছে জন্মস্থানের রহস্য

এই নবজাতক তিমি হাঙরটি এ পর্যন্ত দেখা হাতে গোনা কয়েকটির একটি এবং ইন্দোনেশিয়ার জলসীমায় এটিই প্রথম

হাঙর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাছ। কিন্তু এই বিশাল প্রাণী কোথায় জন্ম নেয়, তা এখনো রহস্য। ইন্দোনেশিয়ায় পাওয়া একটি নবজাতক তিমি হাঙর নতুন সূত্র দিয়েছে সেই রহস্যের। এর মাধ্যমে তিমির হাঙর হয়ে বেড়ে ওঠার জায়গা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যেতে পারে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

হয়তো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে বাসের সমান বিশাল একটি হাঙর কীভাবে মানুষের চোখের আড়ালে থাকতে পারে? হাঙর কোথায় জন্ম নেয়, সেই রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। তবে ইন্দোনেশিয়ার সুমবাওয়া দ্বীপের সালেহ উপসাগরে পাওয়া একটি নবজাতক তিমি হাঙরের এই রহস্যের সমাধানে নতুন সূত্র দিয়েছে।

ইন্দোনেশিয়ার সুমবাওয়া দ্বীপের সালেহ উপসাগর প্রায় পুরোপুরি ঘেরা একটি উপসাগর। সরু একটি জলপথ দিয়ে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা ও পুষ্টিসমৃদ্ধ পানি এখানে প্রবেশ করে। এই সমৃদ্ধ পানির কারণে উপসাগরে প্রচুর ম্যাকারেল ও স্কুইড পাওয়া যায়। স্থানীয় জেলেরা ‘বাগান’ নামে পরিচিত ভাসমান কাঠামো থেকে এসব মাছ ধরেন।

রাতে জেলেরা পানির নিচে আলো ফেলেন। এতে মাছগুলো আলো ও টোপের দিকে আকৃষ্ট হয়ে বাগানের নিচে থাকা জালে চলে আসে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভোরে তারা পানিতে নিজেদের একা মনে করেননি। ভোর সাড়ে ৪টার পর তারা স্থানীয় বিজ্ঞানীদের জানান, জালে একটি হাঙর আটকা পড়েছে।

ভিডিওতে দেখা যায়, প্রায় ১ দশমিক ৫ মিটার লম্বা হাঙরটি জালের মধ্যে ধীরগতিতে ঘুরছে। বিশাল মুখ আর সাদা ছোপ ছোপ দাগে ঢাকা কালচে শরীরটি দেখতে যেন রাতের আকাশের মতো।

তিমি হাঙর বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রজাতির মাছ। তবে পাওয়া হাঙরটি আকারে খুব ছোট—মাত্র প্রায় ৫ ফুট। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এর বয়স তখন মাত্র চার মাসের মতো। অর্থাৎ পূর্ণবয়স্ক হাঙরের দৈর্ঘ্যের প্রায় এক-দশমাংশ ছিল এটি।

কম অক্সিজেনযুক্ত সমুদ্রাঞ্চল নবজাতক তিমি হাঙরের জন্য ‘সমুদ্রের আড়াল’ হিসেবে কাজ করতে পারে, যেখানে তারা শিকারিদের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকতে পারে

সামুদ্রিক বিজ্ঞানী মোচামাদ ইকবাল হেরওয়াতা পুত্রার কাছে এই ছোট আকারই আবিষ্কারটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। কারণ এটি ইন্দোনেশিয়ায় শনাক্ত হওয়া প্রথম নবজাতক তিমি হাঙর এবং বিজ্ঞানীদের নথিভুক্ত করা এমন নবজাতকের সংখ্যা এখনো মাত্র কয়েক ডজন।

বিশাল আকৃতি ও বিশ্বের উষ্ণ সমুদ্রজুড়ে বিস্তৃত উপস্থিতি সত্ত্বেও বিজ্ঞানীরা এখনো কোনো তিমি হাঙরকে মিলিত হতে বা সন্তান জন্ম দিতে দেখেননি। তাই এই নবজাতক তিমি হাঙরের সন্ধান তাদের জন্মস্থান সম্পর্কে এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্রগুলোর একটি।

পূর্ণবয়স্ক একটি তিমি হাঙরের ওজন ছয়টি হাতির সমান হতে পারে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শীতল-রক্তের প্রাণী। একাকী চলাফেরা করা এই বিশাল মাছ জীবনের বড় একটি সময় খোলা সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায়।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত তিমি হাঙর সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জানাশোনা ছিল খুবই সীমিত। তবে ১৯৯০-এর দশকে দেখা যায়, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে তারা বিশ্বের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় দলবদ্ধ হয়ে আসে। মেক্সিকোর ইউকাতান উপদ্বীপের উপকূলে কখনো কখনো কয়েকশ তিমি হাঙরকেও একসঙ্গে দেখা গেছে।

এসব এলাকায় নিয়মিত উপস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানীরা তাদের শরীরে ট্র্যাকিং ট্যাগ লাগান। এর মাধ্যমে জানা যায়, তিমি হাঙর হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। একটি স্ত্রী তিমি হাঙর প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার সাঁতরে যাওয়ার রেকর্ডও রয়েছে।

শার্ক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক বেন ডি’অ্যান্টোনিও বলেন, বিশাল ও রহস্যময় তিমি হাঙর মানুষের মধ্যে বিস্ময়ের অনুভূতি তৈরি করে। কোটি কোটি বছর ধরে এসব প্রাণী পৃথিবীর সমুদ্রে বিচরণ করছে। সালেহ উপসাগরে পাওয়া এই নবজাতক তিমি হাঙরটি যদি মানুষের তৈরি হুমকি ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বেঁচে থাকতে পারে, তাহলে সম্ভবত ২১৫০ সাল পর্যন্তও বেঁচে থাকতে পারে।

হেরওয়াতা পুত্রার মতে, নবজাতক তিমি হাঙর খুঁজে পাওয়া এমন একটি জীবনের শুরুর পর্যায় দেখার বিরল সুযোগ, যা সাধারণত বিজ্ঞানীদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়।

সালেহ উপসাগর কি তিমি হাঙরের নার্সারি?

সালেহ উপসাগরে প্রচুর খাবার থাকায় তিমি হাঙরগুলো এখানে আসে। উপসাগর ঘিরে থাকা ম্যানগ্রোভ পরিবেশের কারণে এখানে প্রচুর ক্রিল পাওয়া যায়। ফলে ছোট তিমি হাঙরের জন্য জায়গাটি দ্রুত বেড়ে ওঠা ও ওজন বাড়ানোর আদর্শ পরিবেশ হতে পারে। একই সঙ্গে উপসাগরের আশপাশের তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ নীল হাঙরের মতো শিকারির হাত থেকেও ছোট হাঙরকে রক্ষা করতে পারে।

হেরওয়াতা পুত্রার ধারণা, এই সুরক্ষিত উপসাগর হয়তো তিমি হাঙরের জন্মস্থান অথবা জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহের নার্সারি এলাকা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে নবজাতকটি এখানেই জন্মেছিল, নাকি অন্য কোথাও জন্ম নিয়ে খাবারের সন্ধানে সালেহ উপসাগরে এসেছিল—তা এখনো নিশ্চিত নয়।

‘মেগামামা’ দিয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র

তিমি হাঙরের জন্মস্থান খুঁজে বের করার সবচেয়ে বড় সূত্রগুলোর একটি পাওয়া যায় ১৯৯৫ সালে তাইওয়ানে। স্থানীয় জেলেদের শিকার করা প্রায় ১০ মিটার লম্বা একটি স্ত্রী তিমি হাঙর পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা এর প্রজনন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পান। গবেষকরা তার নাম দেন ‘মেগামামা’।

তার দুটি জরায়ুতে ৩০৪টি নিষিক্ত ডিম ও ভ্রূণ পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে জানা যায়, তিমি হাঙর ডিম্বজ-জরায়ুজ প্রাণী। অর্থাৎ ডিম শরীরের ভেতরেই ফুটে যায় এবং পরে জীবিত, সাঁতার কাটতে সক্ষম বাচ্চা জন্ম নেয়। কোনো হাঙর প্রজাতির ক্ষেত্রে একসঙ্গে এত বেশি সংখ্যক বাচ্চা পাওয়ার ঘটনা এর আগে দেখা যায়নি।

২০১০ সালের জেনেটিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেগামামার সব সন্তান একই বাবার। এতে ধারণা আরও শক্ত হয় যে স্ত্রী তিমি হাঙর দীর্ঘ সময় ধরে শুক্রাণু সংরক্ষণ করে রাখতে এবং পরে ডিম নিষিক্ত করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত মাত্র ৩৩টি নবজাতক তিমি হাঙরের তথ্য নথিভুক্ত করতে পেরেছেন। এগুলো আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আরব সাগর এবং পাকিস্তান থেকে গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন উষ্ণ অঞ্চলে পাওয়া গেছে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় মেরিন বায়োলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের গবেষক ফ্রেয়া ওমার্সলি এসব স্থান বিশ্লেষণ করে একটি সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজেছেন। তিনি দেখেছেন, নবজাতক তিমি হাঙরগুলো স্থায়ীভাবে কম অক্সিজেন থাকা সমুদ্রের অঞ্চল বা ‘অক্সিজেন মিনিমাম জোন’-এর আশপাশে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।

এর কারণ কী হতে পারে? বিজ্ঞানীদের ধারণা, তিমি হাঙরের মা হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে এমন জায়গা বেছে নেয়, যেখানে কম অক্সিজেনের কারণে অনেক শিকারি প্রাণী যেতে চায় না। ফলে নবজাতকগুলো এক ধরনের প্রাকৃতিক নিরাপত্তা পেতে পারে। একই সঙ্গে এসব এলাকার সীমানায় প্ল্যাঙ্কটন জমে থাকায় ছোট তিমি হাঙরের জন্য পর্যাপ্ত খাবারও পাওয়া যায়।

তবে তিমি হাঙরের প্রজনন নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা। গবেষকরা আশা করছেন, ক্যামেরাসহ নতুন ধরনের ট্র্যাকিং ডিভাইস ব্যবহার করে তারা শিগগিরই আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন।

বিপন্ন তিমি হাঙর রক্ষায় নতুন আশা

১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে প্রতি বছর শত শত তিমি হাঙর মাংস ও পাখনার জন্য হত্যা করা হতো। এমনকি ‘মেগামামা’ও তাইওয়ানে বৈধভাবে শিকার করা হয়েছিল। ২০০০ সালে তিমি হাঙরকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হলেও এরপরও বহু বছর ধরে তাদের শিকার চলেছে। এখনো অবৈধভাবে মাছ ধরার খবর পাওয়া যায়।

বর্তমানে তিমি হাঙর জলবায়ু পরিবর্তন, মাছ ধরা ও জাহাজ চলাচলসহ নানা হুমকির মুখে রয়েছে। সালেহ উপসাগরেও একসময় স্থানীয় জেলেরা তাদের বিশাল আকৃতির কারণে ভয় পেতেন এবং নিজেদের মাছ ধরার প্রতিযোগী হিসেবে দেখতেন।

তবে সেই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। এখন তিমি হাঙরকে কেন্দ্র করে সেখানে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার ইকোট্যুরিজম শিল্প। তরুণ প্রজন্মও বাগানগুলোর আশপাশে স্নরকেলিং ও তিমি হাঙর দেখার সুযোগ তৈরি করছে।

কনজারভাসি ইন্দোনেশিয়া সালেহ উপসাগরের উত্তরাঞ্চলে একটি সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এটি সফল হলে ইন্দোনেশিয়ায় তিমি হাঙর সংরক্ষণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি প্রথম সামুদ্রিক অভয়ারণ্য হবে।

হেরওয়াতা পুত্রা বলেন, গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলগুলো চিহ্নিত করে সুরক্ষিত করা গেলে তিমি হাঙর সংরক্ষণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। সালেহ উপসাগরে ট্যাগ লাগানো ২৫টি তিমি হাঙরের বেশিরভাগই তাদের অধিকাংশ সময় উপসাগর ও এর আশপাশে কাটায়। মাঝে মাঝে তারা বাইরে গেলেও খাবারের প্রাচুর্যের কারণে আবার ফিরে আসে।

তার ভাষায়, ‘এই এলাকা তিমি হাঙরগুলোর বাড়ির মতো। আমরা যদি এই গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলকে সুরক্ষিত করতে পারি, তাহলে আঞ্চলিক তিমি হাঙরের সংখ্যা পুনরুদ্ধারে বড় ভূমিকা রাখতে পারব।’

বিবিসি থেকে ভাষান্তর: মাকসুদা রিনা

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন