প্রকৃত সাংবাদিককে সম্মান দিন, ভুয়া পরিচয়ধারীকে আইনের আওতায় আনুন
মীর আব্দুল আলীম
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৫ পিএম
বাংলাদেশে সাংবাদিক কতজন? এই প্রশ্নের একটি গ্রহণযোগ্য উত্তর হয়তো কোনো একক জায়গা থেকে পাওয়া কঠিন। কিন্তু তার চেয়েও কঠিন প্রশ্ন হলো, দেশে ভুয়া সাংবাদিক কতজন? রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, জাতীয় সংবাদমাধ্যম থেকে স্থানীয় পত্রিকা, টেলিভিশন থেকে অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ফেসবুক থেকে ইউটিউব সবখানেই সাংবাদিক পরিচয়ের বিস্তার ঘটেছে। অথচ প্রকৃত সাংবাদিক, আংশিকভাবে সাংবাদিকতা করেন এমন ব্যক্তি, নাগরিক সাংবাদিক এবং সম্পূর্ণ ভুয়া পরিচয়ধারী এই চারটি শ্রেণিকে আলাদা করে দেখার মতো কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডাটাবেজ নেই। ফলে ‘ভুয়া সাংবাদিকের সংখ্যা কত’ এর সুনির্দিষ্ট উত্তর আজও অজানা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সমস্যাটি সংখ্যার চেয়ে অনেক বড়।
একসময় সাংবাদিক হতে হলে কোনো সংবাদপত্র, বার্তা সংস্থা, রেডিও বা টেলিভিশন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হতে হতো। সম্পাদকের অধীনে কাজ করতে হতো, সংবাদ সংগ্রহের নিয়ম জানতে হতো, তথ্য যাচাই করতে হতো এবং প্রকাশিত সংবাদের দায় নিতে হতো। এখন ডিজিটাল প্রযুক্তি সেই কাঠামোকে আমূল বদলে দিয়েছে। একটি স্মার্টফোন, একটি ফেসবুক পেজ এবং একটি ইউটিউব চ্যানেল দিয়েই অনেকে সংবাদ প্রচার করছেন। এটি নিজে কোনো সমস্যা নয়। বরং নাগরিক সাংবাদিকতা ও ডিজিটাল সাংবাদিকতা গণতান্ত্রিক তথ্যপ্রবাহকে শক্তিশালী করেছে। সমস্যা তখনই, যখন সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে কেউ সংবাদ নয়, ব্যক্তিগত স্বার্থের ব্যবসা শুরু করেন।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন অনেক ব্যক্তিকে দেখা যায়, যাঁদের গলায় প্রেস লেখা পরিচয়পত্র, হাতে ক্যামেরা বা মোবাইল ফোন। তাঁরা সরকারি অফিসে যান, থানায় যান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যান, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যান, বিভিন্ন অনুষ্ঠান কাভার করেন। কিন্তু তাঁদের সংবাদমাধ্যম কোথায়, সম্পাদক কে, নিয়োগপত্র আছে কি না, প্রকাশিত সংবাদ কোথায় এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় অস্পষ্ট। কেউ কেউ একাধিক প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করেন। আবার এমন ঘটনাও শোনা যায়, একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও তার পুরোনো পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সাংবাদিকতা চালিয়ে যাচ্ছেন কেউ কেউ।
আরও উদ্বেগজনক হলো, সাংবাদিকতার নামে সংগঠন ও পরিচয়পত্রের বিস্তার। নানা নামে সাংবাদিক সংগঠন, প্রেস ক্লাব, অনলাইন মিডিয়া, সাংবাদিক ফোরাম কিংবা গণমাধ্যম পরিষদ গড়ে উঠছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সবগুলোকে ভুয়া বলা অবশ্যই অন্যায় হবে। অনেক সংগঠন প্রকৃত সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষা ও কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এর আড়ালে কিছু অসাধু ব্যক্তি যদি শুধু পরিচয়পত্র বাণিজ্য কিংবা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করেন, তাহলে সেটি সাংবাদিকতার জন্য ভয়ংকর।
ভুয়া সাংবাদিকতার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগটি জড়িয়ে থাকে তা হলো চাঁদাবাজি বা ভয় দেখিয়ে সুবিধা নেওয়া। কোথাও বলা হয়, ‘আপনার বিরুদ্ধে নিউজ হবে’; কোথাও কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের অভিযোগ তুলে অর্থ দাবি করা হয়; আবার কোথাও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে ফোন করে সাংবাদিক পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়। সব অভিযোগ সত্য নয়, কিন্তু এমন অভিযোগের অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে সাংবাদিকতার পরিচয়কে কেউ কেউ অপব্যবহার করছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রকৃত সাংবাদিকরা। কারণ সাধারণ মানুষ তখন প্রকৃত সাংবাদিক ও ভুয়া পরিচয়ধারীর মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না।
একজন প্রকৃত সাংবাদিকের শক্তি তাঁর পরিচয়পত্রে নয়, তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতায়। তিনি কোনো সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই করেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করেন, তথ্যের উৎস সংরক্ষণ করেন এবং ভুল হলে সংশোধন করেন। সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো বিশ্বাস। এই বিশ্বাস একদিনে তৈরি হয় না; বছরের পর বছর সততা, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে তৈরি হয়। কিন্তু একজন ভুয়া সাংবাদিকের একটি অপকর্মও পুরো পেশাটির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো, ভুয়া সাংবাদিক চিহ্নিত করবে কে? এখানেই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। দেশে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব নিয়োগব্যবস্থা আছে, সাংবাদিক সংগঠন আছে, প্রেস ক্লাব আছে, প্রেস কাউন্সিল আছে, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আছে। কিন্তু সব ধরনের সাংবাদিককে নিয়ে একটি একক, আধুনিক ও যাচাইযোগ্য জাতীয় ডাটাবেজ নেই। ফলে কেউ কোনো একটি সংবাদমাধ্যমের নাম ব্যবহার করছেন কি না, তাঁর নিয়োগ বৈধ কি না, প্রতিষ্ঠানটি বাস্তবে সক্রিয় কি না এসব যাচাই করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের অনলাইন ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে সময়ের সঙ্গে সাংবাদিকতার ধরন বদলেছে। শুধু প্রিন্ট মিডিয়া নয়, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, টেলিভিশন, রেডিও, বার্তা সংস্থা এবং বৈধ ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদেরও একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন। তবে সেই ডাটাবেজ যেন স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর অযাচিত নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার না হয় সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকের পরিচয় যাচাই দুটি আলাদা বিষয়। পরিচয় যাচাইয়ের নামে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত করা যাবে না। আবার স্বাধীনতার অজুহাতে যে কেউ সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করবে, সেটিও মেনে নেওয়া যায় না। একটি গণতান্ত্রিক দেশে দুটির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ভুয়া সাংবাদিকতার আরেকটি বড় ক্ষেত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফেসবুকে হাজার হাজার পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে প্রতিদিন খবরের মতো কনটেন্ট প্রকাশ হচ্ছে। ইউটিউবে অসংখ্য চ্যানেল নিজেদের ‘নিউজ চ্যানেল’ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। এর মধ্যে অনেকেই অত্যন্ত দায়িত্বশীলভাবে কাজ করছেন। আবার কেউ কেউ যাচাই-বাছাই ছাড়াই গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন কিংবা চটকদার শিরোনাম দিয়ে দর্শক ও অনুসারী বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। সাংবাদিকতা তখন পরিণত হচ্ছে ভিউয়ের ব্যবসায়।
‘ব্রেকিং নিউজ’ শব্দটির অপব্যবহারও কম নয়। একটি ঘটনা ঘটলেই যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট, লাইভ বা ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে। পরে তথ্য ভুল প্রমাণিত হলেও সংশোধন বা ক্ষমা চাওয়ার সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় না। অথচ ভুল সংবাদও মানুষের জীবন, সম্মান ও নিরাপত্তার ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এখানে সাংবাদিকতার প্রশিক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতা শুধু ক্যামেরা ধরার নাম নয়, শুধু মাইক্রোফোন হাতে নেওয়ার নামও নয়। তথ্য যাচাই, উৎসের গোপনীয়তা, মানহানি আইন, শিশু ও নারীর বিষয়ে সংবেদনশীলতা, ছবি ব্যবহারের নীতি, সংঘাতের সংবাদ, আদালতের সংবাদ, দুর্ঘটনার সংবাদ প্রতিটি ক্ষেত্রেই পেশাগত জ্ঞান প্রয়োজন। তাই সাংবাদিকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও নৈতিক মানদণ্ড জোরদার করা দরকার। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যম মালিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। একজনকে শুধু ‘প্রেস কার্ড’ দিয়ে মাঠে পাঠিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। নিয়োগপত্র, দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট পরিধি, আচরণবিধি এবং সংবাদ প্রকাশের নীতিমালা থাকা উচিত। কোনো সাংবাদিক অপরাধ করলে প্রতিষ্ঠানকেও তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
প্রশাসনেরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। শুধু গলায় প্রেস কার্ড দেখলেই কোনো ব্যক্তিকে সাংবাদিক হিসেবে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। সাংবাদিক পরিচয় যাচাইয়ের একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত সাংবাদিক যাতে তথ্য সংগ্রহে হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সাংবাদিকতার পরিচয়কে সামাজিক মর্যাদা হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতার পরিচয় নয়; এটি দায়িত্বের পরিচয়। একজন সাংবাদিকের হাতে কলম যেমন থাকে, তেমনি থাকে জবাবদিহি। তিনি ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করবেন, দুর্বল মানুষের কথা তুলে ধরবেন, অনিয়ম প্রকাশ করবেন এবং নিজের সংবাদকর্মের জন্য জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।
বাংলাদেশে ভুয়া সাংবাদিকের সঠিক সংখ্যা আজও জানা নেই। তাই ‘দেশে ১০ হাজার’, ‘২০ হাজার’ কিংবা ‘৫০ হাজার ভুয়া সাংবাদিক’ এমন সংখ্যা কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি উৎস ছাড়া বলা দায়িত্বশীল হবে না। বরং সত্য হলো, ভুয়া সাংবাদিকের সংখ্যা নির্ধারণের মতো সমন্বিত সরকারি হিসাবই নেই। এই তথ্যের অনুপস্থিতিই সমস্যার গভীরতা বোঝায়। তাই এখন সময় এসেছে একটি জাতীয় সাংবাদিক ডাটাবেজ তৈরির। সেখানে সংবাদমাধ্যমের নাম, সাংবাদিকের পদ, কর্মস্থল এবং পেশাগত পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও ন্যূনতম পেশাগত নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, ভুয়া সাংবাদিক নির্মূলের নামে প্রকৃত সাংবাদিককে হয়রানি করা যাবে না। সমালোচনামূলক সাংবাদিকতাকে ভুয়া সাংবাদিকতার সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করলেই কেউ ‘ভুয়া’ হয়ে যাবেন এমন সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য আরও বিপজ্জনক।
শেষ কথা হলো, সাংবাদিকের পরিচয় কার্ডে নয়, তাঁর সততায়। ক্যামেরায় নয়, তাঁর দায়িত্ববোধে। মাইক্রোফোনে নয়, তাঁর সত্য বলার সাহসে। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত ‘সাংবাদিক কমানো’ নয়, প্রকৃত সাংবাদিক চিহ্নিত করা এবং সাংবাদিকতার নামে অপব্যবহার বন্ধ করা।
বাংলাদেশে ভুয়া সাংবাদিক কতজন এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর আজ আমাদের হাতে নেই। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত সাংবাদিকতার নামে যে পরিচয়-বাণিজ্য, প্রভাব বিস্তার ও অপতৎপরতা চলছে, তা বন্ধ করতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ সাংবাদিকতা যখন পেশা থেকে পরিচয়ের ব্যবসায় পরিণত হয়, তখন শুধু সাংবাদিকতা নয়, মানুষের তথ্য জানার অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মীর আব্দুল আলীম
সাংবাদিক, কলামিস্ট



