বিচারিক স্বাধীনতার মিথ—বাংলাদেশের অধস্তন আদালত কেন এখনো পুরোপুরি মুক্ত নয়
মাহাফুজ কাজী রিজু
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৫ এএম
মাহাফুজ কাজী রিজু,শিক্ষার্থী ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস দীর্ঘ এবং গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৭ সালে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক করা হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—এই পৃথকীকরণ কি বাস্তবে অধস্তন বিচারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করেছে?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বিচার বিভাগীয় পৃথকীকরণকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যায় না; বরং এটি একটি অসম্পূর্ণ সাংবিধানিক প্রকল্প। অধস্তন বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথক হলেও বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি, শৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেত্রে এখনো নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বা প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগের প্রশ্ন রয়েছে। ফলে বিচারিক স্বাধীনতা কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত হয়েছে—তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন।
সংবিধানের ১০৯ ও ১১৬ অনুচ্ছেদের প্রশ্ন
বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদ হাইকোর্ট বিভাগকে তার অধীনস্থ সব আদালত ও ট্রাইব্যুনালের ওপর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়েছে। অর্থাৎ অধস্তন আদালতের ওপর সাংবিধানিক তদারকির ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অন্যদিকে, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বিচারিক সার্ভিসে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগকারী ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি ও শৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাংবিধানিক কাঠামো নির্ধারণ করেছে।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হয়। একদিকে হাইকোর্ট বিভাগের অধস্তন আদালতের ওপর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রয়েছে; অন্যদিকে অধস্তন বিচারকদের প্রশাসনিক ও শৃঙ্খলাগত বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের ভূমিকার প্রশ্নও সামনে আসে। এই প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
মাসদার হোসেন মামলা: বিচারিক স্বাধীনতার সাংবিধানিক ভিত্তি
বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর একটি হলো ঝবপৎবঃধৎু, গরহরংঃৎু ড়ভ ঋরহধহপব া. গফ. গধংফধৎ ঐড়ংংধরহ ধহফ ঙঃযবৎং, ৫২ উখজ (অউ) ৮২ (১৯৯৯)।
এই ঐতিহাসিক মামলায় আপিল বিভাগ বিচারিক সার্ভিসকে সরকারের প্রশাসনিক সার্ভিস থেকে কার্যগত ও কাঠামোগতভাবে পৃথক হিসেবে বিবেচনা করে এবং অধস্তন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে।
মামলাটির গুরুত্ব বিশেষভাবে দেখা যায় সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের ক্ষেত্রে। রায়ে আপিল বিভাগ বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মতামত ও ভূমিকার গুরুত্বকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
অর্থাৎ, গধংফধৎ ঐড়ংংধরহ মামলা শুধু বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের অধস্তন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবেও বিবেচিত।
তবে প্রায় তিন দশক পরও একটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক—সেই সাংবিধানিক নির্দেশনার আলোকে অধস্তন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কি বাস্তবে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হয়েছে?
একজন বিচারকের স্বাধীনতা কতটা স্বাধীন?
ধরা যাক, একজন বিচারকের পদায়ন, বদলি বা পদোন্নতির মতো ক্যারিয়ার-সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে নির্বাহী বিভাগের কোনো ধরনের প্রভাব থাকে। তাহলে সেই বিচারক রাষ্ট্র বা সরকারের সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে মামলা শুনতে গিয়ে কতটা প্রশাসনিকভাবে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন—এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে পারে।
এখানে বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট বিচারককে নিয়ে নয়। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার প্রশ্ন।
বিচারিক স্বাধীনতা মানে শুধু বিচারক আদালতে বসে স্বাধীনভাবে রায় লিখবেন—এটুকু নয়। একজন বিচারকের নিয়োগ, পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি, শৃঙ্খলা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তার কাঠামোও এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে তিনি কোনো ধরনের অযাচিত চাপ বা প্রতিকূল প্রশাসনিক পরিণতির আশঙ্কা ছাড়াই আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
আর্থিক ও প্রশাসনিক নির্ভরতার প্রশ্ন
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনিক ও আর্থিক সক্ষমতা।
আদালতের অবকাঠামো, জনবল, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা এবং বাজেটের মতো বিষয়গুলো কার্যকর বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এসব ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রশাসনিক নির্ভরতা থাকলে বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু সাংবিধানিক ঘোষণার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাস্তব প্রশাসনিক সক্ষমতা ও পর্যাপ্ত সম্পদের বিষয়টিও জড়িত।
এর প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নটি মূলত সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে কেন্দ্র করে।
একজন সাধারণ নাগরিক আদালতে গিয়ে এই বিশ্বাস রাখতে চান যে তাঁর মামলা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক প্রভাব কিংবা ক্ষমতাবান কোনো পক্ষের অবস্থানের কারণে প্রভাবিত হবে না।
একটি স্বাধীন ও কার্যকর অধস্তন বিচারব্যবস্থা বিচারকদের আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, আদালতের কার্যক্রম আরও দক্ষ করা এবং বিচারিক বিলম্ব ও মামলাজট কমাতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
বিচারিক স্বাধীনতা: শেষ পর্যন্ত একটি অসমাপ্ত প্রকল্পবাংলাদেশে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অর্জন। কিন্তু পৃথকীকরণকে শুধু ২০০৭ সালের একটি প্রশাসনিক ঘটনা হিসেবে দেখলে বিষয়টির পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
গধংফধৎ ঐড়ংংধরহ মামলা অধস্তন বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য একটি শক্তিশালী সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করেছে। কিন্তু বিচারকদের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, পদায়ন, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ ও নির্বাহী প্রভাবের সম্ভাবনা থাকলে বিচারিক স্বাধীনতার প্রকৃত বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
সুতরাং বাংলাদেশের বিচারিক পৃথকীকরণকে একটি সম্পূর্ণ সমাপ্ত প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে একটি চলমান সাংবিধানিক প্রকল্প হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।
সত্যিকার বিচারিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হলে অধস্তন বিচার বিভাগের প্রশাসনিক, শৃঙ্খলাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক তত্ত্বাবধানকে কার্যকর রাখতে হবে এবং বিচার বিভাগের ওপর যেকোনো অযাচিত নির্বাহী প্রভাবের সুযোগ কমাতে হবে।
কারণ বিচারিক স্বাধীনতা শুধু বিচারকদের স্বার্থের বিষয় নয়। এটি প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
মাহাফুজ কাজী রিজু
শিক্ষার্থী আইন বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি



