‘আমার লাশ জেলখানা থেকে বের করতে হবে’: কারাবাস ও মামলার বেড়াজালে আপসহীন রিজভীর এক সকাল
শফিকুল ইসলাম বেবু
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম
ঢাকার আদাবরের একটি সাধারণ ভাড়া বাসা। আর দশটা সাধারণ ঘরের মতো চাকচিক্য নেই, তবে ঘরজুড়ে বইয়ের গন্ধ। মিনি লাইব্রেরির ছোট ঘরটিতে একটি সাধারণ খাটে শুয়ে আছেন এক রাজপথের যোদ্ধা—বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১০ এপ্রিল, ঘড়িতে তখন সকাল ঠিক ৮টা। ঢাকার বাইরে থেকে এসে সেই কামরায় ঢুকতেই চেনা মুখে ভেসে উঠল এক পরম শ্রদ্ধার হাসি। ৩৮টি বছর পেরিয়ে গেলেও শ্রদ্ধেয় রিজভী ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে এতটুকু ঘাটতি পড়েনি।
প্রাতঃরাশ শেষ করে মামলার হাজিরা দিতে আদালতের উদ্দেশে প্রস্তুত হলেন তিনি। কোনো বিলাসী বহর নেই, সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে উঠে পড়লেন সাধারণ একটি কারে। ড্রাইভার মান্নান গাড়ি স্টার্ট দিলেন। সামনের সিটে ব্যক্তিগত সহকারী তুষার, আর পেছনে আমি ও আমার অতি শ্রদ্ধেয় রিজভী ভাই।
গাড়ি যখন ঢাকার সিএমএম কোর্টের উদ্দেশ্যে ছুটছে, কথাপ্রসঙ্গেই জানতে চাইলাম- ‘ভাই, মামলার সংখ্যা এখন কত ছুঁয়েছে?’ রিজভী ভাই স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে মৃদু হেসে বললেন, ‘২১৮ পর্যন্ত হিসাব মনে রেখেছিলাম, এরপর আর কত মামলা যোগ হয়েছে জানা নেই।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে কুড়িগ্রামে চার দশক ধরে বিএনপির রাজনীতির পাশাপাশি আমি একসময় একটি কলেজে পরিসংখ্যান পড়াতাম। সেই পরিসংখ্যানের শিক্ষক হিসেবে আইনজীবী না হয়েও হিসাব কষে বলেছিলাম, ‘ভাই, এসব মিথ্যা ও গায়েবি মামলায় যদি ফাঁসি না হয়, তবে অন্তত ৭ থেকে ৮ শত বছর জেল হতে পারে!’
আমার কৌতুকমাখা উদ্বেগেও তার মুখমণ্ডলে কোনো দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ল না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আজই কি জেলে যেতে হতে পারে?’ তিনি সোজা ড্রাইভারের সিটের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই সরকার তো যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। আমি যদি আজ জেলে যাই, বেবু, তুমি কিন্তু এই গাড়িতে একা ফেরত যাবে।’
বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। টিভিতে বহুবার দেখেছি কীভাবে রাজপথে পুলিশ তাকে টেনেহিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তুলেছে। চোখের সামনে ভেসে উঠল একের পর এক নির্যাতনের দৃশ্যপট। নিজেকে সামলে নিয়ে আকুল কণ্ঠে চেপে থাকা শেষ প্রশ্নটি করেই ফেললাম- ‘এই সরকারের পতন না হলে আপনার শেষ পরিণতি কী হবে, ভাই?’
শ্রদ্ধেয় রিজভী ভাই গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের শহরের দিকে একনজর তাকালেন। এরপর আমার দিকে ফিরে স্থির, অবিচল কণ্ঠে যা বললেন, তা আজও আমার কানে বাজে- ‘তাহলে আমার লাশ জেলখানা থেকে বের করে নিয়ে আসতে হবে।’
রুহুল কবির রিজভী কোনো রাজনৈতিক রাজপরিবার থেকে উঠে আসা নেতা নন। নিজের মেধা, শ্রম আর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভালোবাসাকে সম্বল করে কুড়িগ্রামের মাটি থেকে তাঁর উঠে আসা। ১৯৮৯ সালে পুরো প্যানেল হেরে গেলেও তিনি একা রাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি থেকে শুরু করে ১/১১-এর সেনাসমর্থিত সরকারের আমল কিংবা স্বৈরাচারের নির্মম দমনপীড়ন—প্রতিটি ক্রাইসিসে তিনি রাজপথে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন।
সেদিন সিএমএম কোর্টে বিচারক তাঁকে জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেননি বটে, কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে প্রতিদিন কোর্টের বারান্দা আর অন্ধ কারাকক্ষই ছিল তার প্রধান ঠিকানা। কুড়িগ্রামের সাধারণ শিক্ষক থেকে রাজনীতির মাঠে আসা আমার ৪৪ বছরের রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিমাঝে আদাবরের সেই এপ্রিলের সকালটি চিরকাল অমলিন থাকবে- যা ক্ষমতার মোহ নয়, কেবল গণতন্ত্রের জন্য আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় এক রাজপথের বীরের নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
লেখক: শফিকুল ইসলাম বেবু
১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক, কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপি ও সাবেক কলেজ শিক্ষক।



