কর্মক্ষেত্রে সব মানুষ এক রকম নন। কেউ সহযোগিতাপূর্ণ, আবার কেউ নিজের স্বার্থে সমস্যায় ফেলেন অন্যকে। গুজব ছড়ানো, মানসিক চাপ তৈরি করা, অপমান করা কিংবা কৌশলে অন্যকে নিজের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হতে পারে তাদের আচরণের অংশ।
এমন টক্সিক সহকর্মীর কারণে কর্মপরিবেশ হয়ে উঠতে পারে অস্বস্তিকর ও বিষাক্ত। কিন্তু কীভাবে বুঝবেন, কে সত্যিই এমন মানুষ? আর তাদের আচরণের শিকার হলে কী করবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এই লেখা।
আমি পেশাদার মনোবিজ্ঞানী নই। তবে মনোবিজ্ঞান নিয়ে আমার পড়াশোনা আছে। গত ১২ বছরের পেশাগত জীবনে কাজ করার সুযোগ হয়েছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে। যেখানে অস্থির, অতিমাত্রায় নিয়ন্ত্রণপ্রবণ ও ‘টক্সিক’ ব্যক্তিত্বের মানুষের উপস্থিতিই বেশি। প্রতিষ্ঠান একটি হলো রেঁস্তোরা এবং চারটিই প্রিন্ট মিডিয়া।
আমার মনে হয়, এসব প্রতিষ্ঠানে টক্সিক মানুষের উপস্থিতি একটু বেশি। এর একটি কারণ হতে পারে এই প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত সৃজনশীল এবং তুলনামূলকভাবে কম নিয়ন্ত্রিত। তবে এটাও বলতে হয়, এসব প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য আমি সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মেধাবী কিছু মানুষের দেখা পেয়েছি।
এই লেখাটি অনেক দিন ধরেই তৈরি করার কথা ভাবছিলাম। সম্প্রতি আমাকেও একজন টক্সিক সহকর্মীর সঙ্গে মোকাবিলা করতে হয়েছে। ধরা যাক, আমার সেই টক্সিক সহকর্মীর নাম আকাশ। তাকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা যাক।
আকাশ দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় আছেন। তিনি আর তরুণ নন। অনেক কথা বলেন, কিন্তু কাজ করেন খুব কম। ফলে প্রশ্ন জাগে, এতবার তিনি কীভাবে কাজ পান। নিজের আকর্ষণীয় আচরণ দিয়ে সহজেই মানুষকে প্রভাবিত করেন তিনি।
কাউকে নিজের পক্ষে নিয়ে আসতে পারলেই তিনি তাকে এমন সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে শুরু করেন, যাদের তিনি পছন্দ করেন না। বিশেষ করে যারা তার ভালো মানুষ সত্তার আড়ালের আচরণ বুঝতে পেরেছেন, তারা তার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
কর্মক্ষেত্রের একজন টক্সিক বা বিষাক্ত ব্যক্তিত্ব কেমন হতে পারেন, তার উদাহরণ হিসেবে আকাশকে ধরা যায়।
আকাশ আমাকে পছন্দ করেন না। অথচ আমি কখনো তার সঙ্গে অসম্মানজনক বা অশোভন আচরণ করিনি। তারপরও বিভিন্ন সময় তিনি আমার বিরুদ্ধে সহকর্মীদের মধ্যে নানা গুজব ছড়িয়েছেন।
তার এসব প্রচেষ্টা কতটা সফল হয়েছে, তা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। তবে লক্ষ্য করেছি, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা এমন কিছু মানুষ, যাদের সঙ্গে আগে আমার কোনো সমস্যা ছিল না, তারা হঠাৎ আমার সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করতে শুরু করেছেন।
এরপর আমি কী করলাম?
আমার সামান্য উদ্বেগজনিত সমস্যা হয়। পরে কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের বিষয় দেখভালের দায়িত্বে থাকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আমি আকাশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করি। তাকে সতর্ক করা হয়।
কর্মক্ষেত্রে ‘টক্সিক’ ব্যক্তিত্ব চেনার উপায়
সমাজবিরোধী বা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রণপ্রবণ বৈশিষ্ট্য থাকা মানুষ অনেক সময় নিজের ভাবমূর্তি তৈরি করেন খুব সচেতনভাবে। সহকর্মী, বিশেষ করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে তারা নিজেদের উপস্থাপন করেন অত্যন্ত ভালো ও জনপ্রিয় কর্মী হিসেবে।
তারা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন বস ও প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে সেটিকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। কারণ, সবাই মনে করেন, ‘তিনি তো খুব ভালো মানুষ।’
সবচেয়ে বিষাক্ত ও নিয়ন্ত্রণপ্রবণ ব্যক্তিরাও অনেক সময় অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেন।
তারা গুজব ছড়াতে পছন্দ করেন
কর্মক্ষেত্রে গুজব ছড়িয়ে সহকর্মীদের সুনাম নষ্ট করা হতে পারে তাদের অন্যতম কৌশল।
কেউ কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত অন্য সহকর্মীদের পেছনে তাদের সম্পর্কে খারাপ কথা বলেন কি না, তা লক্ষ্য করুন। কারণ আজ তিনি যার সম্পর্কে আপনার কাছে খারাপ কথা বলছেন, ভবিষ্যতে আপনার সঙ্গে তার সম্পর্ক খারাপ হলে একইভাবে আপনার বিরুদ্ধেও কথা বলতে পারেন।
তারা ‘গ্যাসলাইটিং’ করতে পারেন
গ্যাসলাইটিং হলো এমন এক ধরনের মানসিক নিয়ন্ত্রণ, যার মাধ্যমে কাউকে তার নিজের স্মৃতি, উপলব্ধি বা বাস্তবতা নিয়ে সন্দেহে ফেলে দেওয়া হয়।
কোনো টক্সিক ব্যক্তি তার কথা বা আচরণের জন্য জবাবদিহির মুখে পড়লে বিষয়টি অস্বীকার করতে পারেন। বারবার অস্বীকার করে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন, যাতে ভুক্তভোগী নিজেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেন।
তারা নেতিবাচকতা ও নাটকীয়তা পছন্দ করেন
বিষাক্ত ব্যক্তিত্বের মানুষ অনেক সময় সমস্যার প্রকৃত সমাধান চান না। বরং বিরোধ, উত্তেজনা ও মনোযোগ তাদের আচরণের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
আপনি যতই ভদ্র ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করুন, তাতে সবসময় তাদের আচরণ পরিবর্তন হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
তারা অত্যন্ত কৌশলী হতে পারেন
টক্সিক ব্যক্তিত্বের মানুষ অনেক সময় মানুষের মনস্তত্ত্ব ও দুর্বলতা বুঝে তা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেন।
আকাশের ক্ষেত্রেও এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। একজন সহকর্মীকে আমার সামনে অপমান করার পর যখন তিনি বুঝতে পারেন যে বিষয়টি তার বিরুদ্ধে যেতে পারে, তখন তিনি ওই সহকর্মীর কাছে গিয়ে তাকে আলিঙ্গন করেন এবং বলেন, তিনি খুশি যে ওই ব্যক্তি তার দলে যোগ দিয়েছেন।
এ ধরনের আচরণ পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এবং ভুক্তভোগীকে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়েই সন্দেহে ফেলতে পারে।
তারা অন্যের প্রতি ঈর্ষান্বিত হতে পারেন
কখনো ব্যক্তিগত বা পেশাগত ঈর্ষা থেকেও কাউকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। আপনার চেহারা, বেতন, পদ, জনপ্রিয়তা কিংবা প্রতিষ্ঠানে আপনার গ্রহণযোগ্যতা, যেকোনো বিষয়ই কারও ঈর্ষার কারণ হতে পারে।
কর্মক্ষেত্রে কেউ আপনাকে লক্ষ্যবস্তু বানালে কী করবেন?
এটি অনেকটাই নির্ভর করবে আপনার অবস্থান ও পরিস্থিতির ওপর।
প্রথমেই প্রমাণ সংগ্রহ করুন
কবে, কখন এবং কীভাবে আপনাকে হয়রানি বা অপমান করা হয়েছে, তার লিখিত রেকর্ড রাখুন। কারা ঘটনাগুলোর সাক্ষী ছিলেন, সেটিও নোট করুন।
তবে কথোপকথন রেকর্ড করার ক্ষেত্রে স্থানীয় আইন অবশ্যই মেনে চলতে হবে। কোথাও নিজের অংশগ্রহণ থাকা কথোপকথন রেকর্ড করা বৈধ হতে পারে, আবার কোথাও অন্যের সম্মতি প্রয়োজন হতে পারে। তাই আইন না জেনে গোপনে রেকর্ড করা উচিত নয়।
এইচআর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান
কর্মক্ষেত্রে এ ধরনের আচরণ বন্ধ করার দায়িত্ব যাদের, তাদের কাছে অভিযোগ করুন।
তবে বাস্তবতা সবসময় আদর্শ পরিস্থিতির মতো নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন, অথবা অভিযোগ করার পর প্রতিশোধমূলক আচরণ শুরু করেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
তাই অভিযোগ করার পাশাপাশি নিজের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
প্রয়োজনে কর্মক্ষেত্র ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবুন
অনেকের কাছে এটি মনে হতে পারে যে, কর্মক্ষেত্র ছেড়ে দিলে নির্যাতনকারী ব্যক্তিই জিতে গেলেন। কিন্তু কিছু পরিস্থিতিতে নিজের মানসিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সরে আসাই ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে।
যদি প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা কার্যকর না হয় এবং কর্তৃপক্ষও অভিযুক্ত ব্যক্তির আচরণ নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী না থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে সেখানে থাকা আপনার জন্য কতটা ভালো হবে, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
প্রয়োজনে আইনি পরামর্শ নিন
কোনো সহকর্মী যদি পরিকল্পিতভাবে আপনার বিরুদ্ধে অপমানজনক প্রচারণা চালান, আপনার সুনাম ক্ষুণ্ন করেন বা ধারাবাহিকভাবে আপনাকে হয়রানি করেন, তাহলে পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
এ ক্ষেত্রে মানসিক ক্ষতি, মানহানি বা অন্য কোনো আইনি বিষয় প্রযোজ্য কি না, তা জানতে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। এখানে প্রমাণের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।
প্রতিক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়বেন না
বুলিরা অনেক সময় ভুক্তভোগীর কাছ থেকে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া আদায় করতে চায়। তাই যতটা সম্ভব সরাসরি সংঘাতে না জড়িয়ে নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করুন।
‘গ্রে-রক’ পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যেতে পারে। এর মূল ধারণা হলো, উসকানিদাতার প্রতি আবেগহীন ও নিরুত্তাপ থাকা এবং অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ এড়িয়ে চলা।
কখনোই মৌখিক বা শারীরিক সংঘর্ষে জড়ানো উচিত নয়। আপনার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ প্রতিক্রিয়া দেখা গেলে তা পরবর্তীতে আপনার অভিযোগকেই দুর্বল করতে পারে।
হুমকি বা শারীরিক ও যৌন হয়রানির ক্ষেত্রে পুলিশকে জানান
কোনো সহকর্মী যদি যৌন হয়রানি করেন, শারীরিকভাবে আক্রমণ করেন বা হুমকি দেন, তাহলে স্থানীয় আইন অনুযায়ী পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা যেতে পারে।
এ ধরনের আচরণ শুধু কর্মক্ষেত্রের শৃঙ্খলা ভঙ্গই নয়, বরং আপনার নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।



