সমুদ্রের গভীরে প্রতি রাতেই শুরু হয় এক নীরব মহাযাত্রা
ক্যাথরিন ল্যাথাম
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম
প্রতি রাতেই পৃথিবীর মহাসাগরের গভীরে ঘটে এক বিস্ময়কর ঘটনা। সূর্যের আলো মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যের খোঁজে সমুদ্রের গভীর অন্ধকার থেকে ওপরে উঠে আসে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণী। এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক প্রাণী-অভিবাসন।
শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ক্ষুদ্র প্রাণীদের প্রতিদিনের যাতায়াত পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সমুদ্রে কার্বন সংরক্ষণেও।
পৃথিবীর মহাসাগরের টোয়াইলাইট জোন বা গোধূলি অঞ্চল। যেখানে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় সূর্যের আলো। সেখানে প্রতি রাতেই শুরু হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাণী-অভিবাসন।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনা শুধু সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যই নয়, পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোনার প্রযুক্তিবিদরা এক বিস্ময়কর ঘটনার মুখোমুখি হন। তাদের ইকো-সাউন্ডারের সংকেত এমন একটি স্তরে প্রতিফলিত হচ্ছিল, যেটিকে প্রথমে সমুদ্রের তলদেশ বলে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা যায়, প্রকৃত সমুদ্রতল তার চেয়ে অনেক নিচে। আরও আশ্চর্যের বিষয় ছিল, এই তথাকথিত তলদেশ দিন-রাতের সঙ্গে সঙ্গে ওপরে-নিচে চলাচল করছিল।
পরে গবেষণায় জানা যায়, এটি আসলে সমুদ্রের গোধূলি অঞ্চলের অসংখ্য প্রাণীর সম্মিলিত চলাচল। রাতে খাদ্যের সন্ধানে তারা পানির উপরের স্তরে উঠে আসে এবং দিনের আলো ফুটতেই আবার গভীরে ফিরে যায়। কোটি কোটি সামুদ্রিক প্রাণীর এই ঘন স্তর এতটাই ঘন যে, সোনারের শব্দতরঙ্গ প্রতিফলিত হয়ে সেটিকে যেন কঠিন কোনো বস্তুর মতো দেখায়।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০ মিটার (৬৫৬ ফুট) গভীরতায় শুরু হয় এই গোধূলি অঞ্চল। যত গভীরে নামা যায়, সূর্যের আলো ততই ক্ষীণ হয়ে আসে এবং প্রায় ১,০০০ মিটার (৩,২৮০ ফুট) গভীরতায় পৌঁছে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। সেখানে একমাত্র আলোর উৎস হলো বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর দেহ থেকে নির্গত রহস্যময় জৈব-আলোক।
পৃথিবীজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল জলস্তর জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। ধারণা করা হয়, বিশ্বের মোট মাছের জীবভরের প্রায় ৯৫ শতাংশ এই অঞ্চলে বাস করে। এখানে প্রায় ১০ হাজার মিলিয়ন টন মাছ রয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের অনুমান।
প্রতি রাতে এই অঞ্চলের ট্রিলিয়ন সংখ্যক জুপ্ল্যাঙ্কটন খাদ্যের সন্ধানে সমুদ্রপৃষ্ঠের দিকে উঠে আসে। এই দৈনন্দিন উল্লম্ব চলাচলকে বলা হয় ডায়েল ভার্টিক্যাল মাইগ্রেশন বা ডিভিএম। আনুমানিক ১০ বিলিয়ন টন জীবভরের এই অভিবাসন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক প্রাণী-অভিবাসন হিসেবে পরিচিত।
পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর ঘূর্ণায়মান হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন মহাসাগরে রাতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এই অভিবাসনও এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। স্কটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর মেরিন সায়েন্সের আর্কটিক সামুদ্রিক বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক লরা হবস বলেন, আমি একে স্টেডিয়ামের মেক্সিকান ওয়েভের সঙ্গে তুলনা করি। রাতের অন্ধকারকে অনুসরণ করে প্রাণীগুলো পৃথিবীজুড়ে একসঙ্গে ওপরে ওঠে এবং আবার নিচে নেমে যায়।
তিনি জানান, জুপ্ল্যাঙ্কটন সমুদ্রের উপরের স্তরে উঠে আসে কারণ সেখানেই থাকে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন—অর্থাৎ উদ্ভিদজাত প্ল্যাঙ্কটন। ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের বেড়ে ওঠার জন্য সূর্যালোক প্রয়োজন, তাই তারা সমুদ্রের উপরের স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকে।
হবস বলেন, সূর্য ওঠার পর বড় মাছ ও অন্যান্য শিকারিরা জুপ্ল্যাঙ্কটনকে সহজে দেখতে পারে। তাই তারা দ্রুত অন্ধকার গভীর পানিতে ফিরে যায়, সেখানে খাদ্য হজম করে এবং বর্জ্য ত্যাগ করে। সন্ধ্যা নামলে আবার খাদ্যের খোঁজে ওপরে উঠে আসে।
যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্র অনুসন্ধানবিষয়ক অধ্যাপক জন কপলি বলেন, পৃথিবীকে আমরা সাধারণত নীল গ্রহ বলে থাকি, কিন্তু বাস্তবে পৃথিবীর অধিকাংশ সমুদ্রই চিরঅন্ধকারে ঢাকা।
তার ভাষায়, ‘আমরা বলি পৃথিবী একটি মহাসাগরের গ্রহ। কিন্তু সমুদ্রের নীল রঙ কেবল সূর্যালোকিত উপরের স্তরের প্রতিফলন। সমুদ্রের অধিকাংশ অংশই সূর্যের আলো থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। তাই এটি শুধু মহাসাগরের গ্রহ নয়, বরং এক গভীর ও অন্ধকার মহাসাগরের গ্রহ।’
কপলি মেক্সিকো উপসাগরে প্রায় ৬৫০ মিটার গভীরতায় গবেষণা শেষে সন্ধ্যায় সাবমার্সিবল দিয়ে ওপরে ওঠার সময় এই অভিবাসন প্রত্যক্ষ করেন। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সাবমার্সিবলের সব আলো নিভিয়ে রাখা হয়েছিল। চারপাশে কেবল অসংখ্য ক্ষুদ্র জৈব-আলোকিত প্রাণীর ঝলকানি দেখা যাচ্ছিল।
তিনি বলেন, ‘দৃশ্যটি যেন তুষারঝড়ের মতো ছিল—চারদিকে শুধু আলোর ঝিলিক। পরে বুঝতে পারি, অসংখ্য প্রাণী আমাদের পাশ দিয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে।’
পরে সাবমার্সিবলের স্ট্রোব লাইট জ্বালানো হলে আশপাশের প্রায় সব প্রাণীই আলো বিচ্ছুরণ করতে শুরু করে। কপলির ভাষায়, ‘তখন মনে হলো আমরা যেন শুধু পানিতে নই, বরং এক বিশাল জীবন্ত স্যুপের মধ্যে ভাসছি।’
গোধূলি অঞ্চলের প্রাণীরা সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। টুনা, সোর্ডফিশসহ মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত অনেক বড় মাছের প্রধান খাদ্য এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো। এছাড়া তারা সমুদ্রের গভীর ও অগভীর স্তরের মধ্যে পুষ্টি উপাদান পরিবহনেও সহায়তা করে।
এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী হলো কোপিপড —ক্ষুদ্র এক ধরনের ক্রাস্টেশিয়ান, যাদের অনেক সময় সমুদ্রের পোকামাকড় বলা হয়। জীবভর ও সংখ্যার দিক থেকে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে প্রচুর প্রাণীর মধ্যে অন্যতম।
লরা হবস বলেন, বিশ্বের সব মহাসাগরেই কোপিপড রয়েছে। অণুবীক্ষণযন্ত্রে দেখলে কিছু দেখতে বেশ মজার লাগে, আবার কিছু এত বড় ও ভয়ংকর যে তাদের বিশাল মুখাঙ্গ দেখে মনে হয় তারা সত্যিই হিংস্র শিকারি।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই অতি ক্ষুদ্র প্রাণীরা সম্মিলিতভাবে সমুদ্রের পানির মিশ্রণ এবং পুষ্টি পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডায়েল ভার্টিক্যাল মাইগ্রেশন প্রতি বছর প্রায় ৬ গিগাটন কার্বন সমুদ্রের উপরিভাগ থেকে গভীর সমুদ্রে নিয়ে যায়। এই পরিমাণ কার্বন বিশ্বের সব মোটরগাড়ির সম্মিলিত বার্ষিক নির্গমনের দ্বিগুণেরও বেশি।
জন কপলি বলেন, জুপ্ল্যাঙ্কটন যখন উপরিভাগে খাদ্য গ্রহণ করে, তখন সেই জৈব পদার্থ তাদের শরীরের ভেতরে চলে যায়। পরে তারা গভীর সমুদ্রে নেমে গেলে সেই কার্বনও নিচে পৌঁছে যায়। ফলে কার্বন দ্রুত গভীর সমুদ্রে সঞ্চিত হয়, যা পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞানীদের মতে, একবার কার্বন যদি সমুদ্রের প্রায় ১,০০০ মিটার গভীরতায় পৌঁছে যায়, তবে তা হাজার হাজার বছর ধরে বায়ুমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে।
তবে এই গোধূলি অঞ্চল এখন নানা হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মেরু অঞ্চলের সমুদ্রবরফ দ্রুত গলে যাওয়ায় সূর্যের আলো আরও গভীরে পৌঁছাচ্ছে। ফলে জুপ্ল্যাঙ্কটন দীর্ঘ সময় গভীরে আটকে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। এছাড়া সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল পরিবর্তন করে খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে মৎস্যশিল্পও এখন এই গভীর অঞ্চলের মাছ ধরার দিকে নজর দিচ্ছে।
বর্তমানে হাওয়াই, ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল, নোভা স্কশিয়া এবং আজোরেসের কিছু গভীর সমুদ্র অঞ্চল সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষিত হলেও সেগুলোর সুরক্ষা মূলত সমুদ্রতল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ মেসোপেলাজিক অঞ্চলে বাণিজ্যিক মাছ ধরা সম্প্রসারণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মোশন ০৩৫ অনুযায়ী, সমুদ্রের শুধু তলদেশ নয়, পুরো জলস্তরকে সুরক্ষার আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গবেষণা চললেও এই বিশাল অভিবাসন সম্পর্কে এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর অজানা। লরা হবস বলেন, জুপ্ল্যাঙ্কটনের বিভিন্ন প্রজাতি কি একইভাবে আচরণ করে, নাকি ভিন্নভাবে? কোন প্রজাতি বেশি প্রভাব ফেলছে? জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যদি কোনো অঞ্চলে প্রধান প্রজাতি বদলে যায়, তাহলে কার্বন পরিবহন ও শিকারি-শিকারের সম্পর্ক কীভাবে বদলাবে—এসব বিষয় এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। জানার মতো আরও অনেক কিছু বাকি রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি



