ছবি: সংগৃহীত
শিশুকে সবজি খাওয়ানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন অনেক অভিভাবকই। কেউ জোর করেন, কেউ আবার অবলম্বন করেন নানা কৌশল। কিন্তু গবেষকরা বলছেন, বকা বা চাপ দিয়ে নয়, বরং ছোট ছোট কিছু অভ্যাস বদলালেই শিশু ধীরে ধীরে সবজি ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে। নিয়মিত পরিচয় করানো, খাবার পরিবেশনের ধরন বদলানো কিংবা পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়ার মতো সহজ কয়েকটি কৌশলই গড়ে তুলতে পারে শিশুর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস।
শিশুদের প্রতিদিনের খাবারের অভ্যাসে ছোট ছোট পরিবর্তনও ভবিষ্যতে তাদের খাদ্যাভ্যাসে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
অনেক বাবা-মায়ের কাছেই শিশুদের পর্যাপ্ত সবজি খাওয়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অভিভাবকদের বিভিন্ন অনলাইন ফোরাম ও চ্যাট গ্রুপে প্রায়ই এমন প্রশ্ন দেখা যায়— আমার সন্তান শুধু সাদা বা হালকা রঙের খাবারই খেতে চায়, এটা কি স্বাভাবিক?
এর একটি বড় কারণ হলো, শিশুদের মিষ্টি স্বাদের প্রতি আকর্ষণ গড়ে ওঠে খুব ছোটবেলা থেকেই। এমনকি মায়ের বুকের দুধেও প্রাকৃতিক চিনি থাকে, যা মিষ্টি স্বাদ দেয় দুধকে। ফলে শিশু যখন শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করে, তখন ব্রোকলি, পালং শাক কিংবা অন্যান্য সবজি খাওয়ানো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য ফল ও সবজিসমৃদ্ধ বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় দেখা গেছে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস শিশুদের চিন্তাশক্তি, মনোযোগ, আচরণ এবং শিক্ষাজীবনের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি শিশুদের স্থূলতার হারও বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি শিক্ষাগত ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সৌভাগ্যবশত, বিজ্ঞানীরা শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার কার্যকর কিছু উপায় খুঁজে পেয়েছেন। গবেষণা বলছে, নিচের ছয়টি সহজ কৌশল অভিভাবকদের জন্য হতে পারে বেশ কার্যকর।
১. বারবার একই সবজি খেতে দিন
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লিডসের বায়োসাইকোলজির অধ্যাপক ম্যারিয়ন হেদারিংটন বলেন, ছোটবেলা থেকেই শিশুদের বিভিন্ন ধরনের সবজি নিয়মিত খাওয়ানোর চেষ্টা করলে তারা ধীরে ধীরে সেগুলোর স্বাদে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
তার মতে, পাঁচ বছর বয়সের আগেই সবজির সঙ্গে পরিচিত করানো সবচেয়ে কার্যকর। এরপরও সম্ভব হলেও কাজটি তুলনামূলক কঠিন হয়ে যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, একটি নতুন খাবার গ্রহণ করতে শিশুদের একই খাবারের সঙ্গে পাঁচ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত পরিচয় করিয়ে দিতে হতে পারে। তবে এক বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কমবার চেষ্টা করলেই ইতিবাচক ফল পাওয়া যায়।
এমনকি গবেষণা বলছে, শিশুর জন্মের আগেও তার খাদ্যপছন্দের ভিত্তি তৈরি হতে শুরু করে। গর্ভাবস্থায় মা যে ধরনের খাবার খান, তার স্বাদ অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের মাধ্যমে ভ্রূণের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং ভবিষ্যতের খাদ্যরুচিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
২. খাবারের শুরুতেই সবজি পরিবেশন করুন
শিশুকে শুধু এটি স্বাস্থ্যকর বলে কোনো খাবার খাওয়াতে গেলে অনেক সময় উল্টো ফল হতে পারে। কারণ, তারা সুস্বাদু বলে পরিচিত খাবারই বেশি পছন্দ করে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, মূল খাবারের শুরুতেই সবজি পরিবেশন করুন। কারণ তখন শিশুর ক্ষুধা সবচেয়ে বেশি থাকে।
অধ্যাপক হেদারিংটন বলেন, শিশুরা সাধারণত তাদের সবচেয়ে পছন্দের খাবার আগে খেয়ে ফেলে। এরপর সবজির পালা এলে আর খেতে চায় না। তাই শুরুতেই সবজি দিলে তা খাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বারবারা রোলস বলেন, খাবারের শুরুতে সবজি খাওয়ার অভ্যাস অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতাও কমাতে সাহায্য করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সকালের নাস্তায়ও সবজি রাখা যেতে পারে। যেমন—অমলেটে পালং শাক বা মাশরুম, কিংবা মাফিনে কুচানো জুকিনি যোগ করা। ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের আটটি শিশু পরিচর্যা কেন্দ্রে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, সুযোগ পেলে ৬০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে শিশুরা সকালের নাস্তায়ও সবজি খেয়েছে।
৩. স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিমাণ বাড়ান
খাবারের প্লেটে মাংস বা উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত খাবারের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে তার জায়গায় সবজির পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।
গাজর, জুকিনি বা অন্যান্য সবজি কুচি করে সস বা রান্নার সঙ্গে মিশিয়েও পরিবেশন করা সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর প্লেটে ফল ও সবজির পরিমাণ ৫০ শতাংশ বাড়ালে তারা সেগুলোও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি খায়। আবার একসঙ্গে কয়েক ধরনের সবজি পরিবেশন করলেও শিশুদের সবজি খাওয়ার আগ্রহ বাড়ে।
৪. সবজি পরিবেশনের ধরন বদলান
খাবারের প্রতি আগ্রহ অনেকটাই নির্ভর করে সেটি দেখতে কেমন লাগছে তার ওপর।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রজাপতি, ফুল বা টেডি বিয়ারের মতো আকৃতিতে ফল ও সবজি কেটে পরিবেশন করলে শিশুরা সেগুলো বেশি খেতে আগ্রহী হয়।
একইভাবে, সবজি সহজে চোখে পড়ে এমনভাবে সাজিয়ে রাখা কিংবা ছোট ছোট ভাগে পরিবেশন করলেও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্লেটের আলাদা অংশে ভাগ করে পরিবেশন করলে প্রাক্-প্রাথমিক বয়সী শিশুরা প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি সবজি খায়।
৫. পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খান
শিশুরা সবচেয়ে বেশি শেখে বাবা-মাকে দেখে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব অভিভাবক নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খান, তাদের সন্তানরাও ফল ও সবজি বেশি খেতে আগ্রহী হয়। অন্যদিকে, যারা নিয়মিত ফাস্ট ফুড খান বা সকালের নাস্তা এড়িয়ে যান, তাদের সন্তানদের মধ্যেও একই অভ্যাস গড়ে ওঠার সম্ভাবনা বেশি।
নিউজিল্যান্ডে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণকারী অভিভাবকদের সন্তানরা কেক, চকলেট ও অস্বাস্থ্যকর নাশতা তুলনামূলক কম খায়।
সপ্তাহে অন্তত তিন দিন পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাবার খেলে শিশুদের ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব পড়ে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
৬. খাবারকে আনন্দের বিষয় বানান
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের জোর করে কোনো খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করলে উল্টো সেই খাবারের প্রতি অনীহা তৈরি হতে পারে। একইভাবে, ভালো খাবার খাওয়ার পুরস্কার হিসেবে অতিরিক্ত চিনি বা চর্বিযুক্ত খাবার দিলে সেই অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতিই তাদের আকর্ষণ বাড়ে।
বরং শিশুদের খাবার ছুঁতে, গন্ধ নিতে, দেখতে এবং তা নিয়ে খেলতে উৎসাহিত করলে নতুন খাবারের ভয় কমে যায়।
এক গবেষণায় শিশুদের বিটরুট, ছোলা ও পাক চয়ের মতো উপকরণ শুধু স্পর্শ ও পর্যবেক্ষণ করতে দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো খাওয়ার কোনো চাপ ছিল না। পরে দেখা যায়, তারা এসব নতুন খাবার চেখে দেখতে আগের তুলনায় অনেক বেশি আগ্রহী হয়েছে।
শিশুদের রান্নার কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিলেও নতুন খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ে।
এই গবেষণায় যুক্ত পরীক্ষামূলক শেফ জোজেফ ইউসুফ বলেন, শিশুদের কাছে খাবারের অভিজ্ঞতাকে আনন্দদায়ক করে তুলতে হবে।
তার ভাষায়, খেলাধুলার মতো পরিবেশ তৈরি করে এবং খাবারকে স্পর্শ, গন্ধ ও স্বাদের মাধ্যমে আবিষ্কারের সুযোগ দিলে শিশুরা কোনো চাপ ছাড়াই নতুন খাবার চেখে দেখতে অনেক বেশি আগ্রহী হয়।
বিশেষজ্ঞদের আশা, এসব সহজ কৌশল অনুসরণ করলে শিশুদের খাদ্যতালিকা শুধু একঘেয়ে খাবারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং ফল ও সবজির মতো পুষ্টিকর খাবারও তাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হয়ে উঠবে।
বিবিসি থেকে ভাষান্তর: মাকসুদা রিনা



