একটি পিঁপড়া, একটি ফাঁদ এবং এক বিস্ময়কর শিকার কৌশল। উত্তর অস্ট্রেলিয়ার বৃষ্টি অরণ্যে আবিষ্কৃত নতুন প্রজাতির এক মাকড়সা শিকার ধরে ক্যাটাপল্ট বা বিশাল টানের মতো রেশমি ফাঁদ বানিয়ে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি নির্দিষ্ট শিকারকে লক্ষ্য করে এমন জাল এবং আগে কখনও দেখা যায়নি এমন শিকার পদ্ধতিও।
গবেষকদের ধারণা, আক্রমণাত্মক ও বিপজ্জনক পিঁপড়াকে নিরাপদে শিকার করার জন্যই এই নিশাচর শিকারি বিকাশ করেছে এমন অভিনব শিকার কৌশল। সাধারণত পিঁপড়া মাকড়সার জন্য অস্বাভাবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ শিকার হিসেবে বিবেচিত হয়।
গবেষণার প্রধান বিজ্ঞানী অধ্যাপক অজয় নারেন্দ্র জানান, এই ফাঁদের অসাধারণ শক্তি বিশাল বেগে ছুড়ে ফেলে পিঁপড়াকে। যা যুদ্ধবিমান চালকদের অভিজ্ঞ সর্বোচ্চ জি-ফোর্সের তুলনায় প্রায় ১৫ গুণ বেশি।
মাকড়সাটির এখনো আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয়নি। তবে গবেষকরা এর ডাকনাম দিয়েছেন ‘ব্যালিস্তা’। এটি করা হয়েছে প্রাচীনকালে যুদ্ধে পাথর নিক্ষেপের জন্য ব্যবহৃত অস্ত্রের নাম অনুসারে।
গবেষক ড. জোনাস উলফ বলেন, ‘এই ফাঁদ ব্যবস্থাটি সম্ভবত এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যাতে মাকড়সাটি সম্ভাব্য বিপজ্জনক শিকারকে একে একে ধরে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতে পারে, যেখানে পিঁপড়ার চলাচলের পথ বা বাসা নেই।’
অধ্যাপক নারেন্দ্র ব্যাখ্যা করেন, পিঁপড়ার রাসায়নিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। কিছু প্রজাতি হুল ফুটাতে পারে এবং বিপদের সময় দ্রুত অসংখ্য অন্যান্য পিঁপড়াকে সহায়তার জন্য ডেকে আনতে সক্ষম।
অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল উত্তর কুইন্সল্যান্ডের উষ্ণমণ্ডলীয় বৃষ্টি অরণ্যে টানা ১০ রাত অবস্থান করে উচ্চগতির ও ইনফ্রারেড ক্যামেরার সাহায্যে মাকড়সাটির আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন।
গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে কারেন্ট বায়োলজি সাময়িকীতে। এতে দেখা যায়, ‘ব্যালিস্তা’ মাকড়সা আক্রমণাত্মক ও এলাকা-নিয়ন্ত্রণকারী সবুজ গাছপিঁপড়া, ওইকোফিলা স্মারগডিনার বসবাস করা গাছে থাকে। দিনের বেলায় এটি আশ্রয় নেয় পাতার নিচের দিকে লুকানো জালে।
রাত নামলে মাকড়সাটি প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার নিচে নেমে একটি পাতা, ডাল বা বনভূমির মাটিতে রেশমের সুতা দিয়ে একটি নোঙর বিন্দু তৈরি করে। এরপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ডজনখানেক টানটান সুতার সাহায্যে নির্মাণ করে শঙ্কু-আকৃতির একটি কাঠামো। সবশেষে এর চারপাশে আরও পাতলা ধরনের রেশম পেঁচিয়ে সরে যায় ওপরের দিকে।
গবেষকরা দেখেছেন, অল্প সময়ের মধ্যেই সবুজ গাছপিঁপড়াগুলো ফাঁদের কাছে এসে সেটিকে কামড় দেয়। সঙ্গে সঙ্গে ফাঁদটি সক্রিয় হয়ে পিঁপড়াকে প্রচণ্ড বেগে ছুড়ে নিক্ষেপ করে মাকড়সার জালে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সবুজ গাছপিঁপড়াই ছিল এই মাকড়সার একমাত্র শিকার। গবেষকরা যখন অন্য নিশাচর পিঁপড়াকে ফাঁদের কাছে ছেড়ে দেন, তখনও ধরা পড়েনি সেগুলো।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, মাকড়সাটি সম্ভবত ফাঁদে বিশেষ ফেরোমোন ব্যবহার করে, যা শুধু সবুজ গাছপিঁপড়াকেই আকৃষ্ট ও উত্তেজিত করে।
অধ্যাপক নারেন্দ্র বলেন, ‘এটি সম্ভবত প্রথম ঘটনা, যেখানে একটি মাকড়সার জাল কেবলমাত্র একটি নির্দিষ্ট শিকার ধরার জন্য তৈরি হয়েছে এবং যেখানে ফাঁদটি সক্রিয় হয় শিকারের মাধ্যমে, শিকারির মাধ্যমে নয়।’
মাকড়সাটি প্রোপোস্টিরা গণভুক্ত। এটি প্রথম পর্যবেক্ষণ করেন বায়োমেডিক্যাল গবেষক, মাকড়সা বিশেষজ্ঞ ও আলোকচিত্রী গ্রেগ অ্যান্ডারসন।
বিবিসি থেকে ভাষান্তর: মাকসুদা রিনা



