হরমুজ সংকটের পর বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক জ্বালানি মানচিত্র
অদিতি ভাদুড়ি
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৯:০৪ পিএম
একসময় বলা হতো, হরমুজ প্রণালিতে কোনো বিঘ্ন মানেই বিশ্ব অর্থনীতিতে ঝড়। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহের এই সংকীর্ণ জলপথকে ঘিরেই আবর্তিত হতো বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার বড় অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের অভিজ্ঞতা বিশ্বকে শিখিয়েছে বিকল্পের সন্ধান। ওমানের বন্দর, সৌদির পাইপলাইন, মধ্য এশিয়ার নতুন করিডোর কিংবা আজারবাইজান ও কাজাখস্তানের জ্বালানি— সব মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে পুরোনো সমীকরণ। তাই হরমুজ আবার খুললেও বিশ্ব হয়তো আর আগের জায়গায় ফিরে যাবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছে এবং শিগগিরই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। তবে যুদ্ধ শুরুর তিন মাসেরও বেশি সময় পর এ ঘোষণা এলেও বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে তাদের অর্থনীতি সচল রাখতে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বিকল্প বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।
ভারত-ওমান অংশীদারিত্ব
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারত অন্যতম। কারণ মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতের অধিকাংশ জ্বালানি আমদানি এই প্রণালি দিয়েই আসে। শুধু তেল ও গ্যাস নয়, সারসহ আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যও এই রুট ব্যবহার করে।
ভারতের কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী হারদীপ সিং পুরি সম্প্রতি জানান, যুদ্ধের কারণে দেশটির তেল বিপণন কোম্পানিগুলো প্রতিদিন প্রায় ১৬ হাজার কোটি রুপি ক্ষতির মুখে পড়ছে। একই সময়ে ভারতীয় রুপির মান ডলারের বিপরীতে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে ৯৫ রুপিতে পৌঁছেছে।
এই পরিস্থিতিতে ভারত-ওমান বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) কার্যকর হওয়ার খবর ভারতীয় অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা হিসেবে এসেছে। এ চুক্তির ফলে ভারতের রপ্তানি বাড়বে এবং ওমানের সঙ্গে বাণিজ্য আরও সম্প্রসারিত হবে।
ওমানের ভৌগোলিক অবস্থান বর্তমানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি হরমুজ প্রণালির বাইরে, আরব সাগর ও ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত। ফলে সালালাহ ও দুকম বন্দরে পণ্য পরিবহনের জন্য হরমুজের ওপর নির্ভর করতে হয় না।
দুই দেশ বর্তমানে ৪০ হাজার কোটি রুপি ব্যয়ে প্রস্তাবিত ওমান-গুজরাট গভীর সমুদ্র গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। ২ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সাবসি পাইপলাইন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে নিরাপদ ও সরাসরি গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে।
ওমানের কৌশলগত সুবিধা
বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এশিয়ার বাজারে জ্বালানি পৌঁছাতে এই পথ ব্যবহৃত হয়।
প্রণালি বন্ধ থাকায় ওমানের তেল রপ্তানি রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। পাশাপাশি দেশটির শুল্ক আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দুবাইগামী পণ্যের ঘোষণাপত্র থেকে আয় মার্চে ২৭ কোটি ডলার থেকে এপ্রিলে বেড়ে ২১৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।
এছাড়া ওমান এখন সমুদ্র ও আকাশপথে পরিবহন এবং লজিস্টিকসের একটি নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। উপসাগরীয় দেশগুলোতে খাদ্যপণ্য সরবরাহেও ওমানের বিকল্প রুট ব্যবহৃত হচ্ছে।
ফুজাইরাহ টার্মিনালের গুরুত্ব বাড়ছে
সংযুক্ত আরব আমিরাতও হরমুজের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করছে। দেশটি পশ্চিম-পূর্ব তেল পাইপলাইন সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে ফুজাইরাহ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৪০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে।
হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থিত ফুজাইরাহ অয়েল টার্মিনাল বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর ফলে ভারতেও আমিরাতের তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সৌদি আরব ও ইরাকের বিকল্প পথ
ওপেকের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক সৌদি আরব ইতোমধ্যে ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে রপ্তানি বাড়িয়েছে। দেশটির ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন, যা ‘পেট্রোলাইন’ নামেও পরিচিত, ১৯৮১ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহনের উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল।
বর্তমানে এই পাইপলাইন পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে এবং ইউরোপে সৌদি জেট জ্বালানির রপ্তানি বেড়েছে।
অন্যদিকে ইরাক সিরিয়ার বানিয়াস বন্দর ব্যবহার করে তেল রপ্তানি শুরু করেছে। সিরিয়ার স্থিতিশীলতা ফিরলে ভবিষ্যতেও এই রুট গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে টিকে থাকতে পারে।
নতুন সুবিধাভোগী: আজারবাইজান ও কাজাখস্তান
হরমুজ সংকটের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়ার দেশগুলো। ফলে তারা নতুন জ্বালানি উৎস খুঁজতে বাধ্য হয়েছে।
এর মধ্যে অন্যতম লাভবান দেশ আজারবাইজান। জাপান প্রথমবারের মতো আজারবাইজান থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। একই সঙ্গে তারা রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং কাজাখস্তান থেকেও জ্বালানি সংগ্রহ বাড়িয়েছে।
কাজাখস্তানও এই সংকটের বড় সুবিধাভোগী। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ঘাটতির কারণে দেশটির তেলের চাহিদা বেড়েছে। পাশাপাশি ট্রান্স-ক্যাস্পিয়ান আন্তর্জাতিক পরিবহন করিডোর বা ‘মিডল করিডোর’-এর গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই রুট মধ্য এশিয়া, কাস্পিয়ান সাগর ও দক্ষিণ ককেশাস হয়ে তুরস্ক, কৃষ্ণসাগর ও ইউরোপে পৌঁছায়। কাজাখস্তান ইতোমধ্যে ইউরোপ, জাপান এবং বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহ বাড়িয়েছে।
বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা
হরমুজ সংকট বিশ্বের দেশগুলোকে বিকল্প জ্বালানি উৎস, নতুন অংশীদারিত্ব এবং বিকল্প বাণিজ্যপথ গড়ে তুলতে বাধ্য করেছে। এসব নতুন রুট ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে স্থায়ী রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
হরমুজ প্রণালি এখনও বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলেও যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের মতো প্রভাবশালী অবস্থানে হয়তো আর ফিরতে পারবে না। কারণ অনেক দেশ ইতোমধ্যে বিকল্প পথ তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলায় সেগুলো ধরে রাখতে চায়।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ডলারকে ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় ‘ডি-ডলারাইজেশন’ প্রবণতা শুরু হয়েছিল, ঠিক তেমনি হরমুজ প্রণালিকে চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহার করাও শেষ পর্যন্ত ইরানের জন্য ‘আত্মঘাতী কৌশল’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।



