ইলন মাস্ক
ইলন মাস্ক তার অসাধারণ ক্যারিয়ারে অসংখ্য ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছেন। বিস্ফোরিত হয়েছে তার রকেট। টেসলার গাড়িতে দেখা দিয়েছে ত্রুটি। বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা অবস্থান নিয়েছে তার বিরুদ্ধে। মামলা করেছে বিনিয়োগকারীরা। আর সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধও হয়েছে তার। তবুও প্রতিটি সংকটের পর আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছেন মাস্ক। অর্থের চেয়েও মূল্যবান হয়ে উঠেছিল তার অপরিহার্য ব্যক্তিত্বের ভাবমূর্তি।
কিন্তু এবার আঘাত লেগেছে সেই ভাবমূর্তিতে।
ওপেনএআই এবং স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আদালত–পরাজয় হয়তো টেসলার ক্ষতি করবে না বা স্পেসএক্সের অগ্রযাত্রা থামাবে না। কিন্তু প্রতীকীভাবে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে। এক মাসব্যাপী প্রতিদিনের শুনানিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এই মামলার মূল প্রশ্ন ছিল—এআইয়ের ভবিষ্যৎ কে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং কে সেটিকে গড়ে তুলবে।
দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্বের বিচারে আমি এটিকে হরমুজ প্রণালি সংকটের সঙ্গে তুলনা করব। যদিও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। হরমুজ আজকের বৈশ্বিক অর্থনীতির ভঙ্গুরতার প্রতীক। কারণ আধুনিক বিশ্ব এখনো তেলের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত্তি, কারণ ডেটা, অ্যালগরিদম এবং মেশিন ইন্টেলিজেন্স খুব শিগগিরই চাকরি, যুদ্ধ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। একটি সংকীর্ণ পথ আজকের জ্বালানির নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। অন্যটি হয়তো আগামী দিনের এআই ব্যবস্থাকে নির্ধারণ করবে।
গত সোমবার ক্যালিফোর্নিয়ার একটি আদালত মাস্কের অভিযোগ খারিজ করে দেয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির জন্য বড় ধরনের আইনি ও ভাবমূর্তিগত ধাক্কা। মাস্ক দাবি করেছিলেন, ওপেনএআই তাদের প্রতিষ্ঠাকালীন অলাভজনক লক্ষ্য থেকে সরে এসেছে। তার অভিযোগ ছিল, স্যাম অল্টম্যান এবং ওপেনএআই মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে গঠিত একটি সংস্থাকে কার্যত মাইক্রোসফট ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যে পরিণত করেছে। তিনি ১৫০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ, ওপেনএআইয়ের লাভজনক কাঠামোয় রূপান্তরে নিষেধাজ্ঞা এবং অল্টম্যানকে বোর্ড থেকে অপসারণের দাবি জানান।
কিন্তু আদালত তার যুক্তিতে সন্তুষ্ট হয়নি। আমি প্রায় প্রতিদিন মামলার শুনানি অনুসরণ করেছি। কখনো মাস্কের পক্ষে, কখনো অল্টম্যানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। কারণ আমি জানতাম, এই রায় আগামী দশকে এআই শিল্পের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
স্বল্পমেয়াদে প্রযুক্তি বিশ্ব সম্ভবত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে। জনসাধারণের কাছে এটি মাস্ক বনাম অল্টম্যান দ্বন্দ্ব মনে হলেও, এর পেছনে ছিল প্রকৃত শিল্প–উদ্বেগ। যদি মাস্ক জিতে যেতেন, তবে বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বিস্ফোরক বাণিজ্যিক মুহূর্তে ওপেনএআইয়ের করপোরেট কাঠামো অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারত।
চ্যাটপিটিটি কেবল একটি চৌকস চ্যাটবট নয়। ওপেনএআই এখন এমন এক প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। যেখানে সরকার, করপোরেশন, সামরিক বাহিনী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও আর্থিক বাজার জড়িত। আজ এআইকে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট কিংবা শিল্পবিপ্লবের মতোই যুগান্তকারী প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যে পক্ষ ভিত্তিমূলক এআই সিস্টেমে আধিপত্য বিস্তার করবে। তারা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, মিডিয়া ও শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
এই খাতে অর্থের পরিমাণও বিস্ময়কর। মাইক্রোসফট এরইমধ্যে ওপেনএআইয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এনভিডিয়ার বাজারমূল্য এআই চাহিদার কারণে আকাশছোঁয়া হয়েছে। গুগল নিজেকে এআই–কেন্দ্রিকভাবে পুনর্গঠন করছে। অ্যামাজন, মেটা, অ্যাপল এবং ওয়াশিংটন থেকে বেইজিং পর্যন্ত সরকারগুলোও বিপুল সম্পদ ঢালছে এই খাতে।
এই প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে কম যা চেয়েছিল। তা হলো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এআই প্রতিষ্ঠানের আইনি অনিশ্চয়তা।
এই রায় ওপেনএআইকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। বাজার আশ্বস্ত হয়েছে যে কোম্পানিটির কাঠামো ও বাণিজ্যিক অগ্রযাত্রা আপাতত আদালতের লড়াইয়ে থমকে যাবে না। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এআই উন্নয়নের জন্য বিপুল পুঁজি প্রয়োজন। আধুনিক এআই মডেল তৈরিতে বিশাল কম্পিউটিং অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, দক্ষ জনবল ও ডেটা প্রক্রিয়াকরণ দরকার। এটি আর গ্যারেজ–স্টার্টআপের যুগ নয়, এটি শিল্প–মাত্রার প্রযুক্তি, যেখানে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অপরিহার্য।
তাই সিলিকন ভ্যালির অনেকেই নীরবে স্থিতিশীলতাকেই মাস্কের আইনি অভিযানের চেয়ে বেশি পছন্দ করেছে। যদিও ব্যক্তিগতভাবে অনেকে তাঁর কিছু বক্তব্যের সঙ্গে একমত ছিলেন। কারণ বৃহত্তর প্রশ্নে মাস্ক পুরোপুরি ভুলও ছিলেন না।
ওপেনএআই ২০১৫ সালে একটি অলাভজনক উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। যার লক্ষ্য ছিল মানবকল্যাণে এআই ব্যবহার এবং এআই ক্ষমতার বিপজ্জনক কেন্দ্রীকরণ রোধ করা। মাস্ক নিজেও এটি প্রতিষ্ঠায় যুক্ত ছিলেন। কারণ তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে গুগল উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ওপেনএআই সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। এখন এটি গভীরভাবে বাণিজ্যিক, মাইক্রোসফটের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এবং বিপুল করপোরেট ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
যে সংস্থাটি একসময় এআইয়ের কেন্দ্রীকরণ ঠেকাতে গঠিত হয়েছিল, সেটিই হয়তো মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এআই ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। আর এই দ্বন্দ্ব মাস্কের পরাজয়ের সঙ্গে শেষ হচ্ছে না। বরং মামলাটি আরও গভীর এক প্রশ্ন উন্মোচন করেছে। এআইয়ের ভবিষ্যৎ কার মালিকানায় থাকবে? মডেল নিয়ন্ত্রণ করবে কে? ডেটার নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? এখনকার আসল যুদ্ধ সেখানেই।
সব নাটকীয়তা ও বিতর্কের মাঝেও মাস্ক অনেক আগেই বুঝেছিলেন যে এআই ২১শ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে। তার এআই–সংক্রান্ত সতর্কবার্তা শুধু কথার কথা ছিল না। তিনি বুঝেছিলেন, উন্নত এআই ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ মানে শিল্প, শ্রমবাজার, রাজনৈতিক কাঠামো এমনকি সামরিক সক্ষমতার ওপরও প্রভাব বিস্তার করা।
এ কারণেই তিনি পরে নিজের এআই কোম্পানি এক্সএআই প্রতিষ্ঠা করেন।
আদালতে মাস্ক নিজেকে এমন একজন আদর্শবাদী হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। যিনি ওপেনএআইয়ের মূল লক্ষ্য রক্ষার চেষ্টা করছেন। কিন্তু একইসঙ্গে তিনি এখন ওপেনএআইয়ের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বীও। এই দ্বৈত অবস্থান তার মামলাকে রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে জটিল করে তোলে। সমালোচকদের মতে, তিনি মানবতার চেয়ে বরং ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে নিজের প্রভাব হারানোর বিষয়েই বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন।
আর সত্য হলো—দুটো বিষয়ই একসঙ্গে সত্য হতে পারে।
এই আদালত–লড়াই আধুনিক সিলিকন ভ্যালির এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাও উন্মোচন করেছে। এখন তাদের আদর্শিক যুদ্ধও মূলত বাজার–নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। এক দশক আগে প্রযুক্তি নেতারা উদার মূল্যবোধ, উন্মুক্ততা ও বিশ্ব পরিবর্তনের কথা বলতেন। আজ এআই ক্রমশ তেল, পারমাণবিক প্রযুক্তি কিংবা সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের মতো ভূরাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে। রাষ্ট্রগুলো এটি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। করপোরেশনগুলো একচেটিয়া আধিপত্য চায়। বিনিয়োগকারীরা এতে অংশীদার হতে চায়।
ওপেন–সোর্স আদর্শবাদ ধীরে ধীরে ট্রিলিয়ন ডলারের প্রণোদনার সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। মাস্ক–অল্টম্যান বিরোধ সেই রূপান্তরেরই প্রতীক।
আর মাস্ক নিজে? স্বল্পমেয়াদে এটি নিঃসন্দেহে তার জন্য বড় ধাক্কা। এই পরাজয় তার সাম্প্রতিক আইনি ব্যর্থতার তালিকাকে আরও দীর্ঘ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তিনি টুইটার বিনিয়োগকারী, বিজ্ঞাপনদাতা ও সাবেক নির্বাহীদের সঙ্গে মামলায় হেরেছেন। আর নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও তার ব্যবসা নিয়ে নজরদারি বাড়িয়েছে। তার আইনি অপরাজেয়তার ভাবমূর্তি দুর্বল হয়েছে।
তবে তার ক্যারিয়ারের পুনরাবৃত্ত একটি শিক্ষা হলো—পরাজয়ের পর তিনি খুব কমই পিছু হটেন। বরং ব্যর্থতা যেন তাকে আরও উদ্দীপ্ত করে। আইনি বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যে আপিলের সম্ভাবনার কথা বলছেন, আর মাস্ক নিজেও প্রকাশ্যে রায়ের সমালোচনা করে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তিনি কি শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যেতে পারেন?
সম্ভব। যদিও সেখানে সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত। তবে মাস্কের বড় চ্যালেঞ্জ শুধু আইনি নয়, কাঠামোগতও। আজকের ওপেনএআই আর দুর্বল স্টার্টআপ নয়। এটি বিশাল করপোরেট জোট, সরকারি সম্পর্ক ও আর্থিক শক্তির একটি বৃহৎ ব্যবস্থার অংশ। এখন ওপেনএআইকে চ্যালেঞ্জ করা মানে ক্রমবর্ধমান এক এআই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই দাঁড়ানো।
এই রায় এআই–নির্দোষতার যুগেরও সমাপ্তি নির্দেশ করে। একসময় এআই নিয়ে আলোচনায় মানবতা, নৈতিকতা ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার আদর্শবাদ ছিল। এখন পরিবেশ বদলে গেছে। এআই হয়ে উঠেছে কৌশলগত অবকাঠামো। জনকল্যাণের ভাষার পাশাপাশি এখন শোনা যাচ্ছে শেয়ারহোল্ডার মুনাফা, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বাজার–দখলের ভাষাও।
ওপেনএআই নিজেই এই রূপান্তরের প্রতীক। এক দশকেরও কম সময়ে গবেষণাভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে এটি বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান বাণিজ্যিক সংস্থাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। এই পরিবর্তনের গতি একইসঙ্গে বিস্ময়কর এবং ভীতিকর।
প্রযুক্তি বিশ্ব আজ স্বস্তি পেতে পারে, কারণ রায়টি স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে। বিনিয়োগকারীরা বিশৃঙ্খলা পছন্দ করে না, বাজার ধারাবাহিকতা চায়। কিন্তু এই মামলায় যে গভীর উদ্বেগগুলো সামনে এসেছে, সেগুলো এখনো রয়ে গেছে। আদালতে হেরে গেলেও ইলন মাস্ক নিশ্চিত করেছেন যে এই প্রশ্নগুলো দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকবে।
এনডিটিভি থেকে ভাষান্তর: মাকসুদা রিনা



