Logo
Logo
×

মতামত

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের উষ্ণতায় পাকিস্তানের রহস্যময় ভূমিকা

Icon

দিব্যম শর্মা

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম

যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের উষ্ণতায় পাকিস্তানের রহস্যময় ভূমিকা

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং

বিশ্ব রাজনীতিতে যখনই বড় কোনো পালাবদল ঘটে, তখনই নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পাকিস্তান। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করলেই ইসলামাবাদ আবারও কৌশলগত খেলায় জায়গা করে নেয়। ইয়াহিয়া খানের সময়ে যেমন যুক্তরাষ্ট্র-চীন গোপন যোগাযোগের সেতু হয়েছিল পাকিস্তান। তেমনি আজ ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর ও নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে ইসলামাবাদের নাম।

৯ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফরে গিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ট্রাম্প এবার শি জিনপিংকে মহান নেতা বলে অভিহিত করেছের। যা চীন ও তার প্রেসিডেন্ট সম্পর্কে তার সাধারণ বক্তব্যের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একাধিক বৈশ্বিক কারণ। যেমন—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ভারতের উত্থান ও ইউরোপের প্রভাব হ্রাস, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, ইউক্রেনে চলমান রাশিয়ার যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত পররাষ্ট্রনীতি।

তবে এই কূটনৈতিক উষ্ণতা আরেকটি পুরনো ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। ওয়াশিংটন যখনই বেইজিংয়ের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে চায়, তখনই পাকিস্তানের গুরুত্ব বেড়ে যায়।

১৯৭০-এর পুনরাবৃত্তি?

বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ১৯৭০ সালের নানা ঘটনার মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। যদিও গত ৫৬ বছরে বিশ্ব রাজনীতির চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। তবুও কিছু কৌশলগত ধারা যেন একই রয়ে গেছে।

১৯৬১ সালে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বিভক্তি শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার দ্রুত চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ খুঁজতে থাকেন। কিন্তু যোগাযোগের পথ ছিল জটিল।

সেই সময় পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান গোপন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেন। তার সহায়তায় কিসিঞ্জার ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে গোপনে বেইজিং সফর করেন। এর বিনিময়ে পাকিস্তান সামরিক সহায়তা পায় এবং পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত নীরব থাকে।

যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর ভারত ও পাকিস্তানের ওপর যে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জন্য তাতে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। পাকিস্তানকে সাঁজোয়া যান ও বি-৫৭ ক্যানবেরা বোমারু বিমান বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়।

১৯৭১-এর গণহত্যা ও মার্কিন ভূমিকা

১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর পাকিস্তানে রাজনৈতিক সংকট শুরু হয়। পরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইট চালায়, যা ইতিহাসে গণহত্যা হিসেবে পরিচিত।

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কূটনীতিক আর্চার ব্লাড তখন ওয়াশিংটনকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিখ্যাত ব্লাড টেলিগ্রাম পাঠান। যদিও যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তবুও পুরোনো লাইসেন্সের আওতায় পাকিস্তানে অস্ত্র রপ্তানি চলতে থাকে।

আবারও পাকিস্তানের গুরুত্ব

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালের অপারেশন সিন্দুরর পরও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে। যুদ্ধবিরতির ঠিক আগে আইএমএফ পাকিস্তানের জন্য ১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা অনুমোদন করে।

কারণ, পাকিস্তানকে ব্যর্থ হতে দিতে চায় না যুক্তরাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার এবং ইসলামপন্থি জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় উদ্বেগ।

ট্রাম্প, চীন ও পাকিস্তান

চীন সফরের আগে ট্রাম্প পাকিস্তানের ভূমিকাকে প্রশংসা করে বলেন, পাকিস্তান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের মধ্যস্থতাকারী হতে পারে।

তিনি বলেন, পাকিস্তানিরা অসাধারণ। আমি মনে করি ফিল্ড মার্শাল এবং প্রধানমন্ত্রী দারুণ কাজ করছেন।

যদিও মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসিম মুনিরকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ ইরানের সামরিক বাহিনী ও আইআরজিসির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

বর্তমানে পাকিস্তান এমন এক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তারা একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারছে।

পাকিস্তানের কৌশল

পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মালিহা লোধি বলেছেন, পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সাম্প্রতিক উষ্ণতা নতুন সূচনা হতে পার। তবে এটিকে স্থায়ী পরিবর্তন হিসেবে দেখা উচিত নয়।

তিনি মনে করেন, পাকিস্তানের বর্তমান নীতি অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি রাখা, ব্যবসায়িক চুক্তি করা এবং মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাল মেলানোর ওপর নির্ভর করছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের এফ-১৬ যুদ্ধবিমান আধুনিকীকরণের জন্য প্রায় ৪৮৮ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি দিয়েছে। একই সঙ্গে আইএমএফও পাকিস্তানের সংস্কার কর্মসূচির অনুমোদন দিয়ে ১.৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে।

তবে বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা সংকট এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা পাকিস্তানের উন্নয়নের বড় বাধা হয়ে আছে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি?

১৯৭০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে গিয়েছিল। আর আজ, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সামলে সীমিত সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় ওয়াশিংটন।

এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান আবারও নিজেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের মাধ্যমে চীনের বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু করতে না পারলেও ইসলামাবাদকে একটি বিকল্প কৌশলগত অংশীদার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় ওয়াশিংটন যখন বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন ইসলামাবাদও আবার আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসে।

এনডিটিভি থেকে ভাষান্তর: মাকসুদা রিনা

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন