আস্থার সংকটই হতে পারে বিজয়ের সরকারের প্রধান দুর্বলতা
টিএস সুধির
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম
থালাপতি বিজয়
অভিনেতা থেকে নেতা হওয়া থালাপতি বিজয় অবশেষে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছেন। রাজ্যজুড়ে তার দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগমের (টিভিকে) সমর্থকদের মধ্যে এখন স্বস্তি ও উচ্ছ্বাসের আবহ।
চিত্রনাট্যের মোড়ে ভরা কোনো কোলিউড রাজনৈতিক থ্রিলারকেও হার মানিয়েছে নাটকীয় ঘটনা। এতোকিছুর পর টিভিকে প্রধান বিজয় এখন রাজ্যপাল রাজেন্দ্র আরলেকারের সামনে নিজের সমর্থনে থাকা ১২০ জন বিধায়কের সংখ্যা দেখাতে প্রস্তুত। বিদুতলাই চিরুথাইগল কাছির (ভিসিকে) সমর্থন এবং ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগের (আইইউএমএল) অবস্থান বদলের ফলেই শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণ্ডি পার করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আমন্ত্রণ চেয়ে বিজয়ের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। কারণ তার জোট তখনও প্রয়োজনীয় ১১৮ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দুই আসন পিছিয়ে ছিল। ভিসিকে তাদের সিদ্ধান্ত শনিবার পর্যন্ত স্থগিত রেখেছিল এবং আইইউএমএল প্রথমে সমর্থন দিতে অস্বীকার করেছিল। এর মধ্যেই এএমএমকে অভিযোগ তোলে যে, তাদের মান্নারগুডির একমাত্র বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করে টিভিকে সমর্থনের দাবি করেছে। এই অভিযোগ ভবিষ্যতে বিজয়ের জন্য আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত ভিসিকে প্রধান থোল থিরুমাভালাভনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিল টিভিকে। এই দীর্ঘ বিলম্ব ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয় যে, পর্দার আড়ালে কঠিন দর কষাকষি চলছে। যদিও ভিসিকে দাবি করেছে, কোনো শর্ত ছাড়াই তারা সমর্থন দিয়েছে। তবে বিলম্বের কারণ ছিল দলের এক বিধায়কের চেন্নাইয়ের বাইরে থাকা। তবে রাজনীতিতে বিনা মূল্যে মধ্যাহ্নভোজ বলে কিছু হয় না। ফলে মন্ত্রিসভা গঠন ও সরকারের প্রথম সিদ্ধান্তগুলোই বোঝাবে, এই সমর্থনের বিনিময়ে ভিসিকে কী পেয়েছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে—বিজয় কি স্থিতিশীল সরকার দিতে পারবেন? রাজনৈতিক মহলের বড় অংশই মনে করছে, সেটা অত্যন্ত কঠিন হবে। গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে গভীর অবিশ্বাসের ইঙ্গিত দিয়েছে।
প্রথম দু’বার রাজভবনকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়ে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হওয়ার পর টিভিকে ডিএমকের শরিক দল সিপিআই, সিপিএম, ভিসিকে ও আইইউএমএল—এই চারটি দলকে পাশে টানার চেষ্টা শুরু করে। প্রত্যেক দলেরই ছিল দুজন করে বিধায়ক।
ভিসিকে সাধারণ সম্পাদক সিন্থানাই সেলভন অভিযোগ করেন, ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিজয়ের দল প্রথমে হোয়াটসঅ্যাপে সমর্থন চেয়েছিল। তার প্রশ্ন ছিল, হোয়াটসঅ্যাপে সমর্থন চেয়ে কীভাবে বিষয়টাকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া যায়? পরে অবশ্য বিজয় নিজে ফোন করে থিরুমাভালাভনের সঙ্গে কথা বলেন।
এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস নেতৃত্বও সক্রিয় ভূমিকা নেয়। ডিএমকের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে টিভিকের পাশে দাঁড়ানোর কারণে কংগ্রেসকে বিশ্বাসঘাতক বলে কটাক্ষ করা হচ্ছিল। এমনকি ডিএমকে সাংসদ কানিমোঝি লোকসভার স্পিকারকে চিঠি দিয়ে জানান, ডিএমকে সাংসদরা আর কংগ্রেসের পাশে বসতে চান না। ফলে বিজয় সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হলে কংগ্রেসও চাপে পড়ত।
কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এবং বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী সরাসরি ফোন করে ভিসিকে, আইইউএমএল এবং বাম নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই চারটি দলই আগে ডিএমকে নেতৃত্বাধীন সেকুলার প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের অংশ ছিল।
ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিন নাকি এই দলগুলোর টিভিকের দিকে ঝুঁকে পড়া নিয়ে অস্বস্তিতে ছিলেন। কারণ, এই সমর্থনের ফলে বিজয় বিজেপি বিরোধী মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারেন। যে রাজনৈতিক পরিচয় এতদিন একমাত্র ডিএমকের দখলে ছিল। বিশেষ করে দলিত ও সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের ওপর এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গত ৪৮ ঘণ্টায় পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে, যখন ডিএমকের বাইরে থেকে সমর্থনপুষ্ট এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন সরকারের সম্ভাবনা সামনে আসে। সিপিএম সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবির দাবি, ডিএমকে চেয়েছিল বাম দলগুলো এআইএডিএমকে সরকারকে সমর্থন করুক। কিন্তু সিপিআই ও সিপিএম সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। কারণ তারা বুঝেছিল, তা হলে পরোক্ষভাবে এমন এক সরকার গঠনে সাহায্য করা হবে, যেখানে পিএমকের মতো দল থাকবে। যাদের উপস্থিতি ভিসিকের কাছে অগ্রহণযোগ্য।
অন্যদিকে, টিভিকের প্রস্তাব বাম দলগুলোর কাছে ছিল নতুন রাজনৈতিক সুযোগ। কেরলে পরাজয়ের ধাক্কা সামলাতে থাকা সিপিআই ও সিপিএম তামিলনাড়ুর ক্ষমতার কাঠামোয় নিজেদের প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ দেখেছে। ভিসিকেও আশঙ্কা করছিল তাদের দলিত ভোটব্যাঙ্ক ধীরে ধীরে বিজয়ের দিকে সরে যাচ্ছে। কারণ, টিভিকের হয়ে ২৮ জন তফসিলি জাতিভুক্ত বিধায়ক জয়ী হয়েছেন, যার মধ্যে চারজন সাধারণ আসন থেকেও জিতেছেন। বিজয়ের তরুণ দলিত ভোটারদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ভিসিকের কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল।
তবে বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই জোট কতদিন টিকবে? কারণ কংগ্রেসের মতো প্রকাশ্যে সম্পর্ক ছিন্ন না করলেও সিপিআই, সিপিএম, ভিসিকে ও আইইউএমএল এখনও ডিএমকের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। এমনকি তারা জানিয়েছে, স্ট্যালিনের অনুমতি নিয়েই টিভিকেকে সমর্থন দিয়েছে।
শুক্রবার রাতে যখন টিভিকে থিরুমাভালাভনের সমর্থনের অপেক্ষায় ছিল, তখন তিনি ডিএমকে নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন। ফলে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তৈরি হয়েছে। স্ট্যালিন কি পরোক্ষভাবে প্রশাসনের ওপর প্রভাব বজায় রাখবেন? সুপার সিএমের মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হবে কি না, তা আগামী কয়েক মাসেই স্পষ্ট হবে।
পাঁচ দিন ধরে চলা রাজনৈতিক নাটকের আপাত সমাপ্তিতে এখন স্বস্তি ফিরেছে তামিলনাড়ু রাজনীতিতে। বিজয়ের অনুরাগীরাও উদযাপন করছেন তার আসন্ন বিদায়ী ছবি ‘জনা নায়াগনের’ বিখ্যাত সংলাপ দিয়ে—আই অ্যাম কামিং। ছবিতে বিজয়ের চরিত্রের নাম ‘থালাপতি ভেত্রি কোন্ডান’—সংক্ষেপে টিভিকে।
এনডিটিভি থেকে ভাষান্তর: মাকসুদা রিনা



