মাফিয়া, প্রতারণা ও দলবদল
কীভাবে পথ হারালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
জয়ন্ত ঘোষাল
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬, ১২:১৩ এএম
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
নির্বাচনের ফলাফল কখনোই একক কোনো কারণে নির্ধারিত হয় না। মানুষের ভোটদানের পেছনে সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা বহুস্তরীয় প্রভাব কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ভোটার। এই পরিসংখ্যান যাচাইযোগ্য হলেও মূল বিষয়টি হলো, এত বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন একক কারণে ব্যাখ্যা করা যায় না।
গত দুই বছরে রাজ্যের প্রায় প্রতিটি জেলায় ঘোরার অভিজ্ঞতা থেকে একটি পরিষ্কার চিত্র সামনে আসে।
প্রথম ও সবচেয়ে দৃশ্যমান কারণ ছিল তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’। টানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি হয়। ক্ষমতার এই চক্র প্রায় প্রকৃতির নিয়মের মতো। উত্থানের পর একসময় পতন আসবেই।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উঠে আসে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর উত্থান। অনেক জায়গায় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় ‘দাদাগিরি’ বা গুণ্ডাবাহিনীর প্রভাব দেখা যায়। ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং ধীরে ধীরে চাঁদাবাজির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট খাতে—বালি, সিমেন্ট থেকে শুরু করে নানা সরবরাহ ব্যবস্থায় এই প্রভাব বিস্তৃত হয়। অনেকের কাছে এটি জীবিকার উৎস হয়ে উঠলেও সাধারণ মানুষের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। যেখানে স্থানীয় নেতা এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পুলিশকেও ‘কাটমানি’ দিতে হতো।
ছোট ছোট পার্টি অফিস অনেক জায়গায় স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে, যেখানে কিছু ব্যক্তি ‘দালাল’ বা ক্ষমতার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন। বিষয়টি গোপন ছিল না, বরং প্রকাশ্যেই চলত। এমনকি ই-রিকশা চালানোর মতো সাধারণ ক্ষেত্রেও অনানুষ্ঠানিক অর্থপ্রদানের বিষয় জড়িয়ে পড়ে। অনেক চালক—যাদের বৈধ কাগজপত্রও ছিল না—স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের টাকা দিয়ে কাজ চালাতেন। এই ব্যবস্থাগুলো একবার গড়ে উঠলে তা ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ সহ্য করলেও এর বিরুদ্ধে একটি নীরব ক্ষোভ জমতে থাকে।
তৃতীয় বড় কারণ ছিল নাগরিক সমাজের একটি অংশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশা। এই অসন্তোষ সবসময় উচ্চস্বরে প্রকাশ পায়নি, কিন্তু তা ছিল স্পষ্ট।
এর সঙ্গে যুক্ত ছিল শিক্ষা দুর্নীতি সংক্রান্ত বিতর্ক, যা সরকারের ভাবমূর্তিকে বড় ধাক্কা দেয়। পাশাপাশি আরজি কর ঘটনার মতো বিষয় নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দেয়। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নারী ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম প্রধান সমর্থনভিত্তি ছিলেন।
এই সমর্থন হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। রেলমন্ত্রী থাকাকালীন সময় থেকেই তিনি কর্মজীবী নারীদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা চালু করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর স্বাস্থ্যসেবা, ভাতা এবং ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের’ মতো প্রকল্প তার এই সমর্থনভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে।
তবে এবার সেই ভিত্তিতে ভাঙন দেখা যায়। এর একটি কারণ ছিল নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে পাল্টা প্রচার। যিনি নারী ভোটারদের মধ্যেও শক্তিশালী প্রভাব রাখেন। নারী নিরাপত্তার ইস্যু এবং প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভোটের সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখে। ২০২১ সালে যেসব জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সমালোচনা করা হয়েছিল। সেই অবস্থান থেকে সরে এসে বিজেপি কৌশলগতভাবে নিজের অবস্থান বদলায়।
চতুর্থ কারণ ছিল আইনশৃঙ্খলার অবনতি। নির্বাচনের সময় সহিংসতা বেড়ে যায়, যা বাংলার রাজনীতিতে নতুন নয়। অতীতে কংগ্রেস থেকে সিপিএম এবং পরে সিপিএম থেকে তৃণমূলে ‘স্থানান্তরিত’ হওয়া প্রভাবশালীদের সংস্কৃতি এই পরিস্থিতিকে আরও জোরদার করে।
শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বা ‘ভদ্রলোক’ সমাজেও একটি বড় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। একসময় কংগ্রেস, পরে বামপন্থীদের সমর্থন করা এই শ্রেণি ধীরে ধীরে তৃণমূলের দিকে ঝুঁকেছিল। কিন্তু শিল্পোন্নয়নের ব্যর্থতা, বিশেষ করে টাটা প্রকল্পের প্রস্থান, সরকারের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়।
ভবানীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রেও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যায়। একইসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান বিজেপিকে একটি কার্যকর মুখ দেয়। বিশেষ করে হিন্দু ভোট একত্রিত করতে।
ধর্মীয় মেরুকরণও একটি বড় ভূমিকা পালন করে। মুসলিম ভোট দীর্ঘদিন তৃণমূলের পক্ষে থাকলেও বিজেপির প্রচার কৌশল এই মেরুকরণকে তীব্র করে তোলে। পাল্টা হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্মীয় প্রতীক ও মন্দির পরিদর্শনের মাধ্যমে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেন, কিন্তু তা পুরোপুরি সফল হয়নি। অনেকের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে সরকার কিছু ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছে। সত্য-মিথ্যা যাই হোক, এই ধারণার প্রভাব ভোটে পড়ে।
সবশেষে, কাঠামোগত কিছু বিষয়ও ভূমিকা রাখে। ভোটার তালিকা সংশোধনসহ (যা রাজনৈতিক মহলে SIR নামে পরিচিত) কিছু প্রক্রিয়া সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হয়।
সব মিলিয়ে, এটি কোনো একক ঢেউ ছিল না, বরং একাধিক স্রোতের মিলন। অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি, সংগঠনগত দুর্বলতা, ভোটারদের মনোভাবের পরিবর্তন, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি এবং কৌশলগত প্রচার। সব মিলেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক চিত্র পাল্টে দিয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একক কোনো ভুলের কারণে পিছিয়ে পড়েননি। বরং ধীরে ধীরে জমে ওঠা নানা পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবই এই ফলাফল নির্ধারণ করেছে।
এনডিটিভি থেকে ভাষান্তর: মাকসুদা রিনা



