Logo
Logo
×

মতামত

সেন্টমার্টিন ভ্রমণের আগে যে সতর্কতাগুলো জানা জরুরি

Icon

আবু আল মুরসালিন বাবলা

প্রকাশ: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ পিএম

সেন্টমার্টিন ভ্রমণের আগে যে সতর্কতাগুলো জানা জরুরি

বাংলাদেশের একমাত্র নীল পানির দ্বীপ হিসেবে সেন্টমার্টিনের জনপ্রিয়তা আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটকের আগমনে দ্বীপটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। নানা জল্পনা-কল্পনার পর এ বছর আবারও সেন্টমার্টিনের সঙ্গে সব রুটে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। কেউ প্রথমবার, কেউ বহুবারের অভিজ্ঞতা নিয়ে ছুটছেন এই নীল জলের টানে। তবে প্রতিটি মৌসুমের শুরুতেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা নতুন করে বলা প্রয়োজন, যাতে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ কারও জীবনে দুঃখজনক স্মৃতিতে পরিণত না হয়।

অনেকেরই মনে থাকার কথা, কিছুদিন আগে ভাইরাল হওয়া ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’ নাটক কিংবা কয়েক বছর আগে সেন্টমার্টিনে আহ্ছানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা। এসব ঘটনার পেছনে যে প্রাকৃতিক বাস্তবতা কাজ করে, সেটিই আজ আলোচনার বিষয়।

সেন্টমার্টিন দ্বীপের মানচিত্র দেখলে লক্ষ্য করা যায়, দ্বীপের মাথা বা কোণার দিকেই অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে উত্তরের দিকে সরু ও বেরিয়ে থাকা অংশটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক গঠনই মৃত্যুঝুঁকির প্রধান কারণ।

বাংলাদেশের সৈকতগুলোর সঙ্গে বিশ্বের অনেক দেশের সৈকতের একটি বড় পার্থক্য হলো জোয়ার-ভাটার সময় ব্যবস্থাপনা। অনেক দেশে ভাটার সময় সমুদ্রে নামতেই দেওয়া হয় না। অথচ বাংলাদেশে ভাটার সময় অসচেতনভাবে পানিতে নামার কারণে মানুষ ভেসে যায় এবং প্রাণ হারায়। তাই কক্সবাজার, কুয়াকাটা বা সেন্টমার্টিনে যাওয়ার আগে জোয়ার-ভাটার সময়সূচি জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ভাটার সময়ের ঝুঁকির পাশাপাশি আরও একটি ভয়ংকর বিষয় আছে, যা সম্পর্কে আমাদের সচেতনতা খুবই কম। সেটি হলো ‘রিপ কারেন্ট’, সহজ ভাষায় যাকে বলা যায় উলটো স্রোত। বিশ্বজুড়ে সমুদ্র সৈকতে ঘটে যাওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ মৃত্যুর পেছনে এই রিপ কারেন্ট দায়ী। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশেও প্রতি বছর গড়ে ২২ জন মানুষ রিপ কারেন্টের কারণে প্রাণ হারান। বাংলাদেশেও সমুদ্র সৈকতের বেশির ভাগ মৃত্যুর পেছনে এই উলটো স্রোতই প্রধান কারণ বলে ধারণা করা হয়।

রিপ কারেন্ট হলো এমন এক ধরনের স্রোত, যেখানে ঢেউ তটে আঘাত করে সরু একটি পথ দিয়ে দ্রুতগতিতে গভীর সমুদ্রে ফিরে যায়। এই পথে কেউ থাকলে স্রোত তাকে মুহূর্তের মধ্যে গভীর পানিতে টেনে নিয়ে যেতে পারে। ভয়ংকর বিষয় হলো, রিপ কারেন্ট দেখতে বেশ শান্ত মনে হয়। অনেক সময় পানির রং তুলনামূলক গাঢ় নীল হয়, আশপাশের ঢেউয়ের মাথা ভেঙে যায় বা ভাসমান কিছু সমুদ্রের দিকে টেনে নিয়ে যেতে দেখা যায়। এই শান্ত চেহারাই পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত করে।

রিপ কারেন্টে পড়লে যারা সাঁতার জানেন, তাদের কখনোই সরাসরি তীরের দিকে ফেরার চেষ্টা করা উচিত নয়। বরং সৈকতের সমান্তরালভাবে সাঁতরে স্রোতের বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ স্রোতের বিপরীতে শক্তি প্রয়োগ করে ফেরা প্রায় অসম্ভব।

রিপ কারেন্ট সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে—ফিক্সড, হঠাৎ সৃষ্ট এবং টপোগ্রাফিক। সেন্টমার্টিনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো হেডল্যান্ড বা দ্বীপের কোণাকৃতির অংশের কারণে তৈরি হওয়া টপোগ্রাফিক রিপ কারেন্ট। দ্বীপের উত্তরের বিচ, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব দিকটি দেখতে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলেও এখানেই রয়েছে সবচেয়ে ভয়ংকর উলটো স্রোত। স্থানীয় বাসিন্দারা জানেন, এই এলাকায় সাঁতার কাটা বিপজ্জনক এবং তারা অনেক সময় পর্যটকদের সতর্ক করেন। কিন্তু সব পর্যটকের কাছে এই তথ্য পৌঁছায় না। আর এই সামান্য অসচেতনতার ফলেই ঘটে প্রাণহানির মতো ঘটনা।

সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই রিপ কারেন্ট নিয়মিত তৈরি হয়। তাই এখানে ঘটে যাওয়া মৃত্যুকে নিছক দুর্ঘটনা বলার সুযোগ কম। এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সম্পর্কে জানা এবং অন্যকে জানানো আমাদের সবার দায়িত্ব, যাতে অজ্ঞতার কারণে আর কোনো প্রাণ না হারায়।

উল্লেখ্য, রিপ কারেন্ট পৃথিবীর সব সমুদ্র সৈকতেই দেখা যায়। তাই এর ভয়ে সমুদ্রভ্রমণ বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা ও সতর্কতা।

দেশবাসী ভ্রমণে যান, ট্যুরে যান, ট্রেকিংয়ে যান—যেখানে মন চায়, যেভাবে মন চায়। তবে প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল থাকুন, আর নিজের নিরাপত্তাকে কখনোই অবহেলা করবেন না।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন