ছবি : সংগৃহীত
আজকের বাস্তবতায় সমাজে রাষ্ট্রে ও বিশ্বের প্রত্যেক দেশেই জনগণের মত প্রকাশ ও বাকস্বাধীনতা সংকুচিত হয়ে আসছে। পৃথিবীর কোনো দেশেই এখন কোনো নতুন চিন্তা-চেতনা পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন দরকার। কিছু লোক অনুভব করছে, কিন্তু কার্যকর কোনো ভুমিকা গ্রহণ করতে উদ্যোগ নিচ্ছে না। দেশে যখন আইনের শাসন, সংস্কৃতিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকে না তখন গণতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্র বলা যায় না। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংস্কৃতিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে প্রত্যেক সরকারই মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
সংবিধান আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। বিশেষ করে রাজনৈতিক মত প্রকাশের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট। ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা, রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করাকে প্রায়ই সন্দেহের চোখে দেখা হয়। ফলে নাগরিক অধিকার হিসেবে মত প্রকাশ ধীরে ধীরে ‘ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে’ পরিণত হচ্ছে। চলমান সময়ে দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে কোনো লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ সকলেই তাঁদের মত প্রকাশ করতে নীরব ভূমিকা পালন করছে। সমাজে মব সহিংসতার যে সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে, তাতে কিছু মানুষের সত্য বলার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও ভয়ে তা বলতে পারছে না। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংকটজনক বা ক্রাইসিস পর্যায়ে রয়েছে। UK- ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন Article- 19 এর Global Expression Report এ- বাংলাদেশ ১৬১টি দেশের মধ্যে ১২৮তম অবস্থানে আছে। একই রিপোর্টে দেখানো হয়, South Asia- তে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতও 'ক্রাইসিস' পর্যায়ে রয়েছে- পাকিস্তান 'হাইলি' রেস্ট্রিক্টেড। আরেকটি বিশ্বমানের সূচকে World Press Freedom Index-এ বাংলাদেশ ১৮০ দেশের মধ্যে ১৬১তম অবস্থানে রয়েছে, যা প্রতিবছরই নিচের দিকে যাচ্ছে। দেশের ঘটনা প্রবাহের কিংবা রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল। সেরকম একটিও রাজনৈতিক দল আমাদের দেশে নেই। দেশে জনগণের সর্বজনীন কল্যাণে একটিও রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠেনি। উন্নত চরিত্রের রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব গড়ে তুলতে না পারলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। প্রয়োজন নতুন রাজনীতি ও নতুন নেতৃত্ব। ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক জনতার গণ-অভ্যুত্থানে দেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার জন্য আমাদের নতুন প্রজন্মের নিকট নতুন আদর্শিক রাজনৈতিক দল গঠনের সুযোগ এসেছিল, কিন্তু তাদের আদর্শিক তত্ত্ব, সৎ উদ্দেশ্য, ন্যায়পরায়ণতা না থাকার কারণে ও জনগণের চিন্তা-চেতনাকে উপেক্ষা করে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের নীতি গ্রহণ করার কারণে সে সুযোগ বিলীন হয়ে গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কী করতে চায়? বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা কোনো রাজনৈতিক নেতা বাংলাদেশে আছে। চরম রাজনৈতিক দুর্বলতা নিয়ে কোনো জাতি কী উন্নতি করতে পারে? তবে আমি প্রত্যাশা করি এ রাষ্ট্র একদিন জনগণের হবে। জনগণের নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। তবে সেটা সময়ের ব্যাপার। সে আশা নিয়ে নিস্ক্রিয় থাকলে চলবে না। কাজ করতে হবে। জনগণের ভিতর থেকে জনগণের পক্ষ অবলম্বন করে তাদের আরও সক্রিয় ও সাহসী হতে হবে। সক্রিয়তা এবং সাহসের বিকল্প নেই।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রত্যেক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মানদণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। যে সমাজে মানুষ নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে, ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারে এবং ক্ষমতার সমালোচনা করতে পারে—সেই সমাজই মূলত জীবন্ত ও সচল। অথচ আমাদের বাস্তবতায় এই মত প্রকাশের স্বাধীনতা আজ নানা শর্ত, ভয় ও অনিশ্চয়তার বেড়াজালে আবদ্ধ। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা। এখানে সমালোচককে সহজেই ‘বিরোধী’, কিংবা ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যুক্তির বদলে চলে আক্রমণ, বিতর্কের বদলে চলে চরিত্রহনন। এই প্রবণতা কেবল রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সমাজের সর্বস্তরে এর প্রতিফলন দেখা যায়। ফলে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। স্বাধীন মত প্রকাশ সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বিষয়টি আরও গভীর। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্রে প্রশ্ন করা বা ভিন্ন মত দেওয়াকে অনেক সময় ‘অবাধ্যতা’ হিসেবে ধরা হয়। ছোটবেলা থেকেই আমাদের শেখানো হয়—চুপ থাকাই ভদ্রতা, প্রশ্ন করাই সমস্যা। এর ফলে একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে মানুষ সত্য জানলেও তা বলতে সাহস পায় না। এই নীরবতা শেষ পর্যন্ত অন্যায়কে শক্তিশালী করে। আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতার সীমা কোথায়? নিঃসন্দেহে এই স্বাধীনতা অন্যের সম্মান, নিরাপত্তা ও অধিকার ক্ষুণ্ন করার হাতিয়ার হতে পারে না। ঘৃণা, সহিংসতা বা বিদ্বেষ ছড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য, ‘সীমা’র অজুহাতে যদি যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা, গবেষণালব্ধ মতামত কিংবা ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানকে দমন করা হয়, তবে তা সর্বজনীন গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। দেশে সুস্থধারার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হলে মত প্রকাশের ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত হবে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর অতিবাহিত হলেও দেশে সুস্থধারার রাজনীতি গড়ে ওঠেনি। কোনো রাজনৈতিক নেতা সুস্থধারার রাজনীতি গড়ে তোলার চেষ্টাও করেনি।
খালেদা জিয়া সম্পর্কে গত তিন মাস ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে যে বিপুল প্রচার চালানো হয়েছে, তার মর্মে কোনো মতলব আছে বলে মনে হয়। কিন্তু মতলব কাদের এবং কী? তা কেউ প্রকাশ করছে না। ফলে আমরা রহস্যটা বুঝতে পারছি না এবং বাংলাদেশের রাজনীতির সম্পর্কে ভুল ধারণার মধ্যে পড়ে গিয়েছি। খালেদা জিয়ার প্রতি আমাদের বিরূপ মনোভাব নেই। কিন্তু গত তিন মাস ধরে যে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে, তাতে অনেক মিথ্যা আছে। মতলববাজদের এবং মিথ্যাচারদের কেউ এসম্পর্কে একটা কথাও বলছে না। আমাদের রাজনীতি এমনিতেই দুর্বল, তারপর মিথ্যাচারীরা হীনস্বার্থে যে প্রচার চালাচ্ছে তার দ্বারা আমাদের মন-মানসিকতা রাজনীতি নিয়ে দুর্বল থেকে আরও দুর্বল হচ্ছে। আমরা এই প্রচার সম্পর্কে কিছু জানি না। যারা জানে তারা জাতীয় রাজনীতির উন্নতির জন্য সর্বজনীন কল্যাণে প্রচারকারীদের স্বরূপ উন্মোচন করলে দেশের ও দেশবাসীর অশেষ কল্যাণ হবে। যদি আমরা ১৯৭২ সাল থেকে রাজনীতির গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অনুসন্ধান চালাই এবং রহস্য বুঝতে চাই, তাহলে বুঝতে পারবো যে এই প্রচার-প্রচারণার মর্মে কোনো হীন-স্বার্থনিশি মহলে স্বার্থ সাধনের পরিকল্পনা আছে। আমাদের প্রকৃত তথ্য অবলম্বন করে সত্য সন্ধান করতে হবে।
একটি রাষ্ট্র যত শক্তিশালীই হোক, প্রশ্নহীন সমাজ কখনোই সুস্থ হতে পারে না। গণতন্ত্র টিকে থাকে প্রশ্নের ওপর, ভিন্নমতের ওপর এবং মতবিনিময়ের ওপর। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো- সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে সংশোধনের সুযোগ হিসেবে নেওয়া। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্ব রয়েছে- দায়িত্বশীল ভাষায়, তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে মত প্রকাশ করা। বিশ্বের কিছু দেশ আজও স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষেত্রে মাপকাঠিতে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত অবস্থানে আছে: ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, এস্তোনিয়া- এই দেশগুলো ৮০/১০০ বা তার বেশি স্কোর পেয়ে ওপেন ক্যাটাগরি আছে। যুক্তরাষ্ট্রও ওপেন ক্যাটাগরিতে আছে, যদিও প্র্যাকটিস নিয়ে বিতর্ক আছে। দুর্ভাগ্যবশত শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী মত প্রকাশের স্বাধীনতা গত দশকগুলোতে ক্রমান্বয়ে কমে এসেছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নাগরিক মর্যাদার ভিত্তি মজবুত করে।প্রয়োজন আইনের শাসন, সংস্কৃতিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ। এই স্বাধীনতা সংকুচিত হলে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা যদি সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সর্বজনীন গণতান্ত্রিক উন্নতিশীল রাষ্ট্র চাই, তাহলে ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে সম্প্রীতিময় সহনশীলতা, সহমর্মিতা, যুক্তি ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হবে সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি।
লেখক: এম এ আলীম সরকার
প্রাবন্ধিক ও রাজনীতিবিদ
সভাপতি, বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)।



