দ্য ডিপ্লোম্যাটের প্রতিবেদন
বাংলাদেশে সরকার বদলায়, বদলায় না রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৭ এএম
গত ১৮ অক্টোবর রাতে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জ জেলার পাইস্কায় কয়েকজন ব্যক্তি রিপন মিয়াকে ধাওয়া করে। একপর্যায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ওপর হামলা চালানো হয়। পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
রিপন ছিলেন ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) যুব সংগঠন যুবদলের স্থানীয় নেতা। স্থানীয় বিএনপি কর্মীদের ভাষ্য, একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকায় কারা থাকবেন, তা নিয়ে সম্প্রতি দুই পক্ষের বিরোধ আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল।
রিপনের মেয়ে শীলা গণমাধ্যমকে বলেন, কয়েকজন লোক আমার বাবাকে তাড়া করে এবং কুপিয়ে হত্যা করে।
স্থানীয় বিএনপি সভাপতি এই হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্যের লড়াইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করেছেন। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমাঞ্চলের জেলা চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে দুই ভাই নিহত হন। পুলিশ জানায়, রমজানের ইফতারের পর একটি তর্কবিতর্ক সহিংসতায় রূপ নেয়।
কয়েক ঘণ্টা পর হাফিজুর রহমান মারা যান। তার ভাই, স্থানীয় জামায়াত নেতা মফিজুর রহমান গত ১০ মার্চ ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান।
এই সহিংসতার জন্য বিএনপি ও জামায়াত একে অপরকে দোষারোপ করে। পরিবার একটি হত্যা মামলা করার পর পুলিশ স্থানীয় এক বিএনপি নেতা ও দলটির স্বেচ্ছাসেবক শাখার সাবেক এক নেতাসহ তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে। বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সাম্প্রতিক এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য, একাডেমিক গবেষণা এবং সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রাজনৈতিক সহিংসতার একটি ধারাবাহিক চিত্র উঠে আসে।
এসব তথ্য দেখায়, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, নিজ দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা একের পর এক সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও অব্যাহত রয়েছে।
চলতি বছরের সহিংসতার চিত্র
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৬৭টি ঘটনায় ৯৪ জনের মৃত্যু এবং ৩ হাজার ৫৮৭ জন আহত হওয়ার তথ্য নথিবদ্ধ করেছে আসক।
এর মধ্যে ১১২টি সংঘর্ষকে ‘বিএনপি বনাম বিএনপি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব সংঘর্ষে ১৮ জন নিহত এবং ১ হাজার ২১৫ জন আহত হয়েছেন।
পরিসংখ্যানগুলোতে অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচিত সরকার—উভয় সময়ের ঘটনাই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিএনপিপ্রধান তারেক রহমান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ব্যাপক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর মূলত অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং একটি রাজনৈতিক সরকার গঠিত হয়।
কিন্তু এত পরিবর্তনের মধ্যেও একটি বিষয় অপরিবর্তিত রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, সেই লড়াইয়ে বাংলাদেশিদের প্রাণহানি এখনো অব্যাহত।
এটি কেবল কোনো একক সরকারের সমস্যা নয়; বরং একের পর এক সরকারকে অতিক্রম করে টিকে থাকা একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা।
২০০২ সাল পর্যন্ত পেছনের রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা নিয়মিত ঘটেছে।
একটি দলীয় পদ, একটি ব্যবসা, একখণ্ড জমি, এমনকি কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকাও একটি এলাকার ওপর কার কর্তৃত্ব থাকবে, তা নিয়ে বিরোধের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
এই ইতিহাস আরও দেখায়, সমস্যাটিকে কেবল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যকার শত্রুতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। ২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার। ওই সময় আসক বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ২৮৪টি ঘটনা এবং ৫৫ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ করেছিল। বিপরীতে, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৭ জনের মৃত্যু হয়।
এই পরিসংখ্যানগুলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের ২০১৪ সালের গবেষণাপত্র ‘পলিটিক্যাল পার্টিজ ইন বাংলাদেশ’-এ স্থান পেয়েছে। বর্তমানে বিরোধী দলে থাকা ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামী ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের শরিক ছিল। দলটির দুজন নেতা মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক জোটও দলীয় সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা ঠেকাতে পারেনি। রওনক জাহানের ২০১৪ সালের গবেষণায় উদ্ধৃত আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ১৩৪টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব সংঘর্ষে আটজন নিহত হন।
একই সময়ে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে ৪২টি সংঘর্ষে সাতজনের মৃত্যু হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সহিংসতা কমলেও নিপীড়ন বন্ধ হয়নি
২০০৭-২০০৮ সালের সামরিক বাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নিবন্ধিত দলীয় সংঘর্ষের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসে। বিএনপির অন্তর্কোন্দলে মাত্র আটটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যাতে দুজনের মৃত্যু হয়। আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দলে একটি সংঘর্ষের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়, যেখানে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যেও সংঘর্ষের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩২টিতে। এসব সংঘর্ষে সাতজনের মৃত্যু হয়। সব ঘটনাই ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার সংঘর্ষ।
তবে ২০০২-২০০৬ মেয়াদে কেবল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংঘর্ষেই ১১৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০০৭-২০০৮ সময়কালে রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট নয়জনের প্রাণহানি ঘটে।
তবে দলীয় সংঘর্ষ কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে মুক্তি মিলেছিল।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরি আইনের অধীনে পরিচালিত হয়েছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বেআইনি গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নথিবদ্ধ করে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও সীমিত করা হয়েছিল। অর্থাৎ, যে পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত হতে এবং সংঘর্ষে জড়াতে পারত, সেই কাঠামোটিই বদলে দেওয়া হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর অন্তর্কোন্দলে সহিংসতা
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর দলটির অভ্যন্তরীণ সহিংসতা আবারও বৃদ্ধি পায়। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আওয়ামী লীগের ৭৯৯টি অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ঘটনায় ৯৭ জন নিহত হন। একই সময়ে বিএনপির ক্ষেত্রে সংঘর্ষের সংখ্যা ছিল ২২৯টি এবং মৃত্যুর সংখ্যা ২১।
উল্লেখ্য, বিভিন্ন সরকারের মধ্যে কে এগিয়ে বা পিছিয়ে, তা নির্ধারণ করা এই পরিসংখ্যানের উদ্দেশ্য নয়। বরং জাতীয় ক্ষমতায় থাকা দলের অভ্যন্তরে কীভাবে মারাত্মক সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তা চিহ্নিত করাই এর লক্ষ্য।
জাতীয় রাজনৈতিক সংঘাতের ভয়াবহতা
স্থানীয় বিরোধ নিয়মিত ঘটনা হলেও জাতীয় রাজনৈতিক সংঘাত তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি প্রাণঘাতী প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ যখন একটি তীব্র বিতর্কিত নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছিল, তখন আসক রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫০৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ করে।
সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে হরতালজনিত সহিংসতায় ১৮৫ জনের মৃত্যু এবং ২৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া অবরোধ কর্মসূচিতে আরও ৮৫ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৩ সালে জামায়াত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যকার সংঘাত বিশেষভাবে মারাত্মক রূপ নেয়।
আসকের মূল বার্ষিক রেকর্ডে জামায়াত, তাদের ছাত্রসংগঠন শিবির এবং পুলিশের মধ্যকার সংঘর্ষে ৩৭ জনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষে আলাদাভাবে আরও ১১ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ করা হয়।
এছাড়া আওয়ামী লীগ-জামায়াত-শিবির সংঘর্ষে ১৩ জন, আওয়ামী লীগ-জামায়াত সংঘর্ষে ৯ জন, শিবির-পুলিশ সংঘর্ষে ৯ জন এবং আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষে পাঁচজনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, ওই বছর মোট যে ৫০৭ জন মারা যান, তার মধ্যে ৯৬ জনই নিহত হয়েছেন জামায়াত বা শিবির জড়িত থাকা সংঘাতগুলোতে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব ক্যাটাগরি কেবল সংঘর্ষে অংশ নেওয়া গোষ্ঠীগুলোকে চিহ্নিত করে। কোন পক্ষের কারণে মৃত্যুগুলো ঘটেছে, তা নিশ্চিত করে না।
পরবর্তী বছরগুলোতে জামায়াত ও শিবির-সংশ্লিষ্ট আলাদাভাবে চিহ্নিত ঘটনার সংখ্যা কমে আসে। ২০১৫ সালে দল দুটির নাম উল্লেখ থাকা নয়টি ঘটনায় তিনজন নিহত হন। ২০১৬ সালে দুটি ঘটনার তালিকা করা হয়, যেখানে একজনের মৃত্যু হয়।
২০১৭ সালের তালিকায় একটি শিবির-পুলিশ সংঘর্ষের ঘটনা রয়েছে, যাতে তিনজন আহত হন। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের তালিকায় জামায়াত বা শিবিরের নাম আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এই তথ্যের ঘাটতির কারণে ওই বছরগুলোতে জামায়াত বা শিবিরের ভূমিকা ঠিক কী ছিল, তা বার্ষিক হিসাব থেকে নিশ্চিতভাবে বোঝা কঠিন।
রাজনৈতিক মিত্রদের মধ্যেও সংঘর্ষ
এমনকি জাতীয় পর্যায়ে বড় দলগুলোর মধ্যে বড় কোনো লড়াই না থাকলেও, একই পক্ষের বা মিত্র দলগুলোর নিজেদের মধ্যকার মারামারিতেও মানুষ মারা গেছে। ২০১৭ সালে আসক রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫২ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ করে। কেবল ‘আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ’ ক্যাটাগরিতেই ২৯ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়।
এই পরিসংখ্যানে দলটির ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলোর সংঘাত-সংক্রান্ত পৃথক সারির হিসাব অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
স্থানীয় নির্বাচনগুলো ছিল প্রাণহানির আরেকটি নিয়মিত উৎস। ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় ১৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ করে আসক। সেই বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় রেকর্ড করা মোট ১৭৭টি মৃত্যুর সিংহভাগই ছিল এই নির্বাচনকেন্দ্রিক।
২০২১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট সহিংসতায় সারাদেশে নথিবদ্ধ ১৫৭ জনের মৃত্যুর মধ্যে ১১৩ জন প্রাণ হারান। এই সংখ্যাগুলো থেকে প্রতিটি হত্যাকাণ্ড কারা ঘটিয়েছে, তা নির্দিষ্ট করা যায় না। তবে এগুলো স্পষ্ট করে যে, সহিংসতা কেবল সংসদীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘটে না। স্থানীয় পদ ভাগাভাগি ঘিরেও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
সহিংসতার পেছনের কারণ নিয়ে গবেষণাগুলো এই সংযোগটি বুঝতে সাহায্য করে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একটি গবেষণায় ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে প্রতিবেদনভুক্ত রাজনৈতিক সহিংসতা পর্যালোচনা করা হয়।
২০০৮-২০১২ সালের কারণ বিশ্লেষণ করে গবেষণাটিতে দেখা যায়, দলগুলোর অভ্যন্তরে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই ছিল সবচেয়ে বড় ক্যাটাগরি। এ ছাড়া ঠিকাদারি, সম্পত্তি, জমি ও চাকরিসংক্রান্ত বিরোধও ছিল সহিংসতার অন্যতম কারণ।
এই গবেষণায় আলাদা তথ্য ব্যবহার করায় এর সংখ্যাগুলোকে সরাসরি ‘আসক’-এর হিসাবের সঙ্গে মেলানো যাবে না। তবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহিংসতার ধরনটি কেমন, তা বুঝতে এই তথ্যগুলো বেশ সাহায্য করে।
রাজনৈতিক দলগুলো যেমন ভোটে দাঁড়ানো ও জনগণের কথা বলার সুযোগ দেয়, তেমনই স্থানীয় নেতাদের বড় বড় সরকারি ক্ষমতাধরদের কাছে পৌঁছানোর পথও বানিয়ে দেয়। ক্ষমতাধর মানুষদের সাথে এই পরিচয় কাজে লাগিয়ে যখন টাকা আয়ের সুযোগ তৈরি হয় বা নিজের ব্যবসা রক্ষা করা যায়, তখন দলের ভেতরের মারামারি আর শুধু নির্বাচন জেতার মধ্যে আটকে থাকে না—এর পেছনে অনেক বড় সুযোগ আর স্বার্থ জড়িয়ে পড়ে।
গণঅভ্যুত্থানের পরও বদলায়নি স্থানীয় ক্ষমতার লড়াই
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানো গণঅভ্যুত্থান একটি ভিন্ন ধারার রাজনীতির প্রত্যাশা জাগিয়েছিল। আন্দোলনকারী ও রাজনৈতিক নেতারা একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার কথা বলেছিলেন।
অথচ সরকারের পতন হলেও স্থানীয় ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্পদ দখলের লড়াই বন্ধ হয়নি। তবে একের পর এক সরকার বদল হওয়ার পরও একের পর এক খুনখারাপি হতে থাকার মানে এই নয় যে, সব সরকারই এক রকম কিংবা সব মারামারি বা সহিংসতার ধরন একই।
যেমন: শেখ হাসিনাকে সরানোর সময়ের আন্দোলন-সহিংসতাকে আর দশটা সাধারণ দলের ভেতরের মারামারির সাথে এক করে দেখলে চলবে না, দুটো আলাদা বিষয়।
জাতিসংঘের তদন্তে দেখা গেছে, তৎকালীন সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা পরিকল্পিতভাবে মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া প্রতিবেদনে জাতিসংঘ জানায়, ওই জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রায় ১৪ শ জনের মতো মানুষ মারা গিয়ে থাকতে পারেন। সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের গায়ের জোরে ও হিংস্রভাবে দমন করাই ছিল তৎকালীন সরকারের নীতি।
২০২৪ সালের জন্য আসকের সাধারণ রাজনৈতিক সহিংসতার তালিকায় ১০০টি মৃত্যুর কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে এই সংখ্যা পুরো গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের মোট সংখ্যা নির্দেশ করে না।
আসক আন্দোলনের সময়কার মৃত্যুগুলো আলাদাভাবে হিসাব করেছিল। তাই প্রতিদিনের সাধারণ মারামারির হিসাব দিয়ে ওই সময়ের মূল আন্দোলন আর সরকারের ভয়াবহ দমন-পীড়নের আসল রূপটা বোঝা যাবে না।
২০২৪ সালের আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের সমাপ্তি ঘটে। আর এর পরপরই আগে তারা যেসব স্থানীয় পদপদবী ও ব্যবসা-বাণিজ্য দখল করে রাখত, সেগুলো নিজেদের দখলে নেওয়ার জন্য নতুন করে কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে খেলার মাঠ নিয়ে বিরোধের জেরে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁও এলাকায় বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী দুটি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে জুবায়ের উদ্দিন বাবু নামে একজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
পুলিশ জানায়, একটি কৃত্রিম ঘাসের টার্ফ বা খেলার মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গ্রুপ দুটি নিজেদের মধ্যে লড়াই করছিল। দৈনিক পত্রিকা ‘প্রথম আলো’ চট্টগ্রামে হত্যাকাণ্ড, হামলা, সংঘর্ষ ও জমি দখলের ১৫টি ঘটনা পর্যালোচনা করেছে।
তাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকার পরিবর্তনের ফলে অবৈধ আয়ের উৎসগুলোর নিয়ন্ত্রণও হাতবদল হয়েছে।
এসব বিরোধের সঙ্গে পরিবহন, বাজার, জমি এবং রেলওয়ের ঠিকাদারি জড়িত ছিল। আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পূর্বে নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্কগুলো দখল করার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে ওঠে, তাদের মধ্যে বিএনপি নেতা এবং দলটির সহযোগী সংগঠনের সদস্যরাও ছিলেন।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসব ঘটনা ঘটে। বিএনপি তখনো জাতীয় ক্ষমতায় ফিরে আসেনি।
ক্ষমতায় ফেরার আগেই বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ
বিএনপি সরকারে ফেরার দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল রাজনৈতিক প্রাণহানির একটি প্রধান উৎসে পরিণত হয়। ২০১৫ সালে আসক বিএনপির বিভিন্ন উপদলের মধ্যে ১৯২টি সংঘর্ষের ঘটনা নথিবদ্ধ করে, যাতে ৪০ জন নিহত হন।
দলটির যুবসংগঠন যুবদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আরও আটজন প্রাণ হারান। সার্বিকভাবে, সেই বছর রাজনৈতিক সহিংসতার ৪০১টি ঘটনায় ১০২ জনের মৃত্যুর তথ্য নথিবদ্ধ করে সংস্থাটি।
হাসিনাকে উৎখাত করা গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের দ্বারা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আধিপত্যে থাকা রাজনীতির বিকল্প হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
সহিংসতার রেকর্ডে তাদের উপস্থিতিও দেখায়, রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি থেকে জন্ম নেওয়া একটি দলও এসব সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে।
২০২৫ সালে এনসিপি-সংশ্লিষ্ট নয়টি সংঘাতের ঘটনায় ১৭১ জন আহত এবং পাঁচজন নিহত হন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটি আরও ২৯টি ঘটনাওয়াই ২২০ জন আহত হওয়ার তথ্য নথিবদ্ধ করে। এসব ঘটনার বেশিরভাগই ছিল বিএনপির সঙ্গে সংঘর্ষ।
বিএনপি ক্ষমতায় ফেরার আগেই দলটির অভ্যন্তরে মারাত্মক সংঘাত শুরু হয়। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে স্থানীয় গ্রুপগুলো ব্যাপকভাবে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কিছু পরিবারের ওপর আঘাতটা এলো এমন সব মানুষের কাছ থেকেই, যাদের তারা এতদিন নিজেদের রাজনৈতিক মিত্র মনে করত।
চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ২০২৫ সালের ৮ মার্চ বিএনপির অন্তর্কোন্দলের কারণে সংঘর্ষে নিহত হন। তার একটি ছোট দোকান ছিল। তার স্ত্রী নাহিদা খাতুন স্থানীয় একটি ক্লিনিকে কাজ করতেন।
তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ৩৬ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেন।
নাহিদা জানান, তার স্বামী বহু বছর ধরে মামলার কারণে বাড়ি ফিরতে পারেননি। এরপর তিনি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, রফিকুল মারা গেলেন নিজ দলেরই মানুষের হাতে।
বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের নতুন চিত্র
সাম্প্রতিক রেকর্ডগুলোতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি এবং জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে ক্রমাগত সহিংসতার চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালে আসক দুই দলের মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষের ঘটনা নথিবদ্ধ করে। এসব সংঘর্ষে তিনজন নিহত এবং ৫২০ জন আহত হন।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটি এ ধরনের ১৩৭টি সংঘর্ষ নথিবদ্ধ করে। এতে ১০ জনের মৃত্যু হয় এবং ১ হাজার ৫৪ জন আহত হন।
সময়সীমা তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়া সত্ত্বেও সংঘর্ষের সংখ্যা এবং মৃতের সংখ্যা উভয়ই বেশি ছিল।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরের একই তালিকায় ‘দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলি’ শিরোনামের একটি ক্যাটাগরিতে ৫১ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ায় বিএনপি অফিস ভাঙচুর। ফাইল ছবিচলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন আইন প্রয়োগের দায়িত্ব সরাসরি দলটির সরকারের ওপর নিয়ে এসেছে। দলটির নেতারাও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন।
অক্টোবরে এক সংসদীয় দলের বৈঠকে তারেক রহমান চাঁদাবাজি ও জমি দখলের বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। তিনি জানান, সংসদ সদস্যদেরও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
পুলিশও এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে যে, রাজনৈতিক পরিচয় আইন থেকে সুরক্ষা দেয়। চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার জানান, দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে পুলিশ মামলা দায়ের করছে এবং গ্রেপ্তার অভিযান চালাচ্ছে।
তবে দৈনিক ‘প্রথম আলো’র অনুসন্ধানে এমন ঘটনাও পাওয়া গেছে, যেখানে আইনি পদক্ষেপের পরিবর্তে কেবল দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার বা কমিটি বিলুপ্ত করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সহিংসতার চক্র কীভাবে টিকে থাকে?
২০০৯ সালে ‘সাউথ এশিয়ান সার্ভে’-তে প্রকাশিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এম. মনিরুজ্জামানের ‘পার্টি পলিটিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স ইন বাংলাদেশ: ইস্যুজ, ম্যানিফেস্টেশন অ্যান্ড কনসিকুয়েন্সেস’ শীর্ষক গবেষণায় যুক্তি দেওয়া হয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা একটি চক্র মেনে চলে।
এসব সংঘর্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৈরিতা গভীর করে তোলে। ফলে আপস বা সমঝোতা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
সরকারগুলো বিরোধীদের দমনে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে, আর বিরোধী দলগুলো আরও বেশি আন্দোলনের মাধ্যমে এর জবাব দেয়।
ফলে সহিংসতা রাজনৈতিক সংঘাতের ফল এবং তা অব্যাহত থাকার কারণ উভয়ই হয়ে ওঠে। গবেষণায় একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিণতিও চিহ্নিত করা হয়েছে।
বারবার সহিংসতা ঘটার ফলে নতুন প্রজন্মের কর্মীরা বলপ্রয়োগকে রাজনৈতিক দাবি আদায়ের একটি স্বীকৃত পথ হিসেবে দেখতে শিখতে পারে। ছাত্র ও শ্রমিক সংগঠনগুলো ক্যাম্পাস, কর্মক্ষেত্র এবং রাজপথে এই সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটায়।
মনিরুজ্জামান যুক্তি দেন, এটি সহনশীলতা, জবাবদিহি এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার মতো গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য প্রয়োজনীয় চর্চাগুলোকে দুর্বল করে দেয়।
বাংলাদেশে একের পর এক সরকার বদলালেও রাজনৈতিক সহিংসতার ধরণ বারবার বদলেছে। বড় জাতীয় সংঘাত বা নির্বাচনের সময় সাধারণত সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়। আর অন্য সময়গুলোতে নিজেদের দলের ভেতরের মারামারিতেই বেশির ভাগ প্রাণহানি ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকারসহ সব আমলেই এই মারামারি চলতে থাকার মানে হলো শুধু দেশের মূল নেতা বা সরকার বদলালেই স্থানীয় পদপদবী, ব্যবসা আর সম্পদ দখলের মারামারি থামে না।
বিএনপি আইন প্রয়োগের দায়িত্ব নেওয়ার পরও দলটির সরকারে ফেরার পরপরই নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা গেছে। দল থেকে বহিষ্কার এবং পুলিশের গ্রেপ্তার দেখাচ্ছে যে কিছু ঘটনার পর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও যেহেতু হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে, তাই সরকারের প্রতিক্রিয়ার ধরন আসলেই বদলেছে কি না, তা মূল্যায়ন করা বেশ কঠিন।
সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট



