১৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায় সরকার: নৌমন্ত্রী
যুগের চিন্তা ২৪ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৯ পিএম
দেশে প্রাকৃতিকভাবে প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথ থাকলেও এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন নৌপরিবহন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছেন, সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ করতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করা যাবে না। এ খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নিয়ন্ত্রিত সম্পদ ব্যবহার, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর কুড়িলে আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) তিন দিনব্যাপী ‘অষ্টম বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল মেরিন অ্যান্ড অফশোর এক্সপো—বিমক্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শেখ রবিউল আলম বলেন, নদী, সমুদ্র ও জলরাশির প্রাচুর্যের কারণে বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবেই সম্ভাবনাময় একটি দেশ। প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথ থাকা সত্ত্বেও এ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। সরকার সামুদ্রিক খাতের প্রতিটি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চায়।
তিনি আরও বলেন, সমুদ্রের সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার করতে গিয়ে পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমুদ্র সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই নির্বিচারে সম্পদ আহরণ বন্ধ করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে এসব সম্পদ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে গুরুত্ব
দেশের সামুদ্রিক খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাতারবাড়ীতে আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি পায়রা সমুদ্রবন্দরকে কার্যকরভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যদিও এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটিকে বাংলাদেশে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লালদিয়া ও পানগাঁওসহ বিভিন্ন বন্দর ও টার্মিনালে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বাড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
জাহাজ নির্মাণ ও তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আধুনিক প্রযুক্তির তাগিদ
মন্ত্রী বলেন, সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে জ্বালানি, লজিস্টিকস, বন্দর ব্যবস্থাপনা, জাহাজ নির্মাণ এবং জাহাজ পুনর্ব্যবহারসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। মাছ আহরণ থেকে শুরু করে সমুদ্রের তলদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলো সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অগ্রসর হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে এখনো প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
সামুদ্রিক খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে উদ্যোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ফিলিপাইনের মতো দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতার আশ্বাস
বাংলাদেশের সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কারিগরি জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগাতে সরকার আগ্রহী। এ খাতের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে সহযোগিতা করতে চায়, সরকার সে অনুযায়ী সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
ফসিল জ্বালানি থেকে পরিবেশবান্ধব সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তরের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বে এ বিষয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নতুন প্রযুক্তিতে দ্রুত রূপান্তর অনেক সময় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তাই পরিবেশ সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে যেতে হবে।
তিন দিনব্যাপী সামুদ্রিক প্রযুক্তি প্রদর্শনী
সেভর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের আয়োজনে তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীতে সামুদ্রিক ও অফশোর শিল্পের আধুনিক প্রযুক্তি, পণ্য ও সেবা তুলে ধরা হচ্ছে। এতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের পাশাপাশি ব্যবসায়িক বৈঠক, সেমিনার ও প্যানেল আলোচনার আয়োজন রয়েছে।
সামুদ্রিক পরিবহন, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ পুনর্ব্যবহার, বন্দর পরিচালনা এবং অফশোর কার্যক্রমে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরা এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ ও সামুদ্রিক খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিতেও প্রদর্শনীটি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।



