Logo
Logo
×

জাতীয়

চারবার প্রত্যাখানের পর আবারও ৬৫ পদ নিয়ে জনপ্রশাসনের দরজায় ইসি

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:১৫ পিএম

চারবার প্রত্যাখানের পর আবারও ৬৫ পদ নিয়ে জনপ্রশাসনের দরজায় ইসি

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে চারবার অসম্মতি প্রকাশ করে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার পরও হাল ছাড়েনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মাঠপর্যায়ের কাজের গতিশীলতা বৃদ্ধি, প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা চরম পদমর্যাদা বৈষম্য দূর করতে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তাদের মোট ৬৫টি পদ ৬ষ্ঠ থেকে ৫ম গ্রেডে উন্নীত করার পুনর্প্রস্তাব পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক স্থবিরতা ও শৃঙ্খলা কাটাতে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার ৪৫টি পদ এবং অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার ২০টি পদ ৬ষ্ঠ গ্রেড থেকে ৫ম গ্রেডে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এই উদ্যোগের প্রস্তাব এর আগে চারবার প্রত্যাখান করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ গত ১২ জুলাই নির্বাচন কমিশনের এই প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়েছে জনপ্রশাসন। এরই প্রেক্ষিতে আবারও প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

বর্তমানে জেলা নির্বাচন অফিসার পদে কর্মকর্তারা ৬ষ্ঠ গ্রেডে ৩৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬৭ হাজার ১০ টাকা বেতন স্কেলে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রস্তাবিত কাঠামোতে তাদের গ্রেড-৫ এবং বেতনস্কেল ৪৩ হাজার থেকে ৬৯ হাজার ৮৫০ টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে বর্তমানে ১৯টিতে ৫ম গ্রেডের সিনিয়র জেলা নির্বাচন অফিসার এবং বাকি ৪৫টি জেলায় ৬ষ্ঠ গ্রেডের জেলা নির্বাচন অফিসার কাজ করছেন। একই কাজের পরিধি হওয়া সত্ত্বেও এই বৈষম্য যেমন প্রশাসনিক সমন্বয়ে বাধা তৈরি করছে, তেমনি সম্প্রতি ৪৫টি জেলায় ৬ষ্ঠ গ্রেডের অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার নতুন পদ তৈরি হওয়ায় নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা ও অধীন কর্মকর্তা একই গ্রেডের হয়ে পড়েছেন।

অন্যদিকে, অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার ২০টি পদ বর্তমানে ৬ষ্ঠ গ্রেডে রয়েছে, যা ৫ম গ্রেডে উন্নীত করা প্রয়োজন। আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার অবর্তমানে তারা মূল দায়িত্ব পালন করেন এবং অন্যান্য বিভাগীয় দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পদমর্যাদার সমতা আনতেই এই সুপারিশ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই ৬৫টি পদের গ্রেড ও বেতনস্কেল উন্নীত করা হলে সরকারের বাড়তি কোনো আর্থিক ব্যয় হবে না এবং এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ, এম, এম, নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশনের পূর্ণ সম্মতি রয়েছে।

ইসি সচিবালয়ের তথ্যমতে, মাঠপর্যায়ের এই জটিলতার মূল উৎস বেতন ও পদমর্যাদার চরম বৈষম্য। অনেক জেলায় ৬ষ্ঠ গ্রেডের জেলা অফিসারের অধীনে পদায়ন করা হয়েছে ৫ম গ্রেডের অতিরিক্ত জেলা নির্বাচন অফিসারকে। আবার ১৯টি জেলার বেশিরভাগে ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তারা পদে আসীন থাকলেও সেসব জায়গায় ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের পদায়ন থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এই অব্যবস্থাপনা ও দাপ্তরিক অসংগতি নিরসনে কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

২০০৫ ব্যাচের দুই দশকের জট ও পদোন্নতিহীনতা

ইসির সর্বশেষ গ্রেডেশন তালিকায় ৭৩৮ জন কর্মকর্তার মধ্যে মাঠপর্যায়ে ৭২১ জন কর্মরত আছেন। এর মধ্যে ২০০০ ও ২০০৪ ব্যাচের পদোন্নতি সম্পন্ন হলেও বড় বিপত্তি বেঁধেছে ২০০৫ ব্যাচকে ঘিরে। এই ব্যাচের ১০০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা দীর্ঘ ২১ বছর ধরে একই পদে আটকে আছেন। আইনি লড়াই শেষে সম্প্রতি প্রায় ৮০ জন কর্মকর্তা যোগদান করলেও তারা আগের পদেই থেকে গেছেন।

জ্যেষ্ঠতার বিধিমালা অনুযায়ী ২০০৫ ব্যাচের জট না খুললে পরবর্তী সময়ে নিয়োগ পাওয়া ২০০৫-এর পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত যোগদানকারী ৪২০ জন উপজেলা নির্বাচন অফিসারের পদোন্নতির দুয়ার খুলছে না। দীর্ঘদিন পদোন্নতি না পেয়ে ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা সামাজিক ও পারিবারিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছেন। কর্মকর্তাদের মতে, অনেকে টাইমস্কেল পেয়ে উচ্চতর গ্রেডের স্কেলেই বেতন পাচ্ছেন, তাই এটি আর্থিক দাবির চেয়ে সামাজিক মর্যাদা ও মানবিকতার দাবি।

আট বছরে চারবার প্রত্যাখ্যানের ইতিহাস

কর্মকর্তাদের উচ্চতর গ্রেড দেওয়ার এই চেষ্টার সূত্রপাত ২০১৮ সালে। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ ৪৫টি জেলা নির্বাচন অফিসারের পদ ৫ম গ্রেডে উন্নীত করা এবং ইটিআই মহাপরিচালকের পদ ৩য় থেকে ২য় গ্রেডে নেওয়ার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আধা-সরকারি পত্র পাঠান। কিন্তু ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি ফিডার পদের অসংগতির অজুহাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তা নাকচ করে। পরে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার এবং ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট তৃতীয়বার পূর্ণ কমিশনের অনুমোদনে চিঠি পাঠানো হলেও ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পুনরায় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

সর্বশেষ, গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর ইসির বর্তমান সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ চতুর্থবারের মতো ৪৫টি জেলা অফিসারের পদ ও ২০ জন অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার পদ ৫ম গ্রেডে উন্নীত করার জন্য চিঠি পাঠান। কিন্তু গত ১২ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংস্থাপন ও ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ (সওব্য-১৩)-এর উপসচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তানিয়া সুলতানা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে চতুর্থবারের মতো অসম্মতির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়।

আইনের আলোতে ইসির অনড় অবস্থান ও আশাবাদ

চারবার প্রত্যাখ্যানের পর পুনরায় প্রস্তাব পাঠানোর বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, কমিশন তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। প্রস্তাবটি অত্যন্ত যৌক্তিক হওয়ায় প্রয়োজন হলে নতুন করে কমিশনের অনুমোদন নিয়ে অথবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আবারও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে।

বাংলাদেশ ইলেকশন কমিশন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারাও আশা ছাড়ছেন না। সম্প্রতি পাস হওয়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইনের কথা উল্লেখ করে তারা জানান, এই আইনের মাধ্যমে ইসি এখন ক্যাডার বা নন-ক্যাডার ব্যবস্থার বাইরে একটি স্বতন্ত্র ‘সার্ভিস’ হিসেবে গণ্য হবে। একটি পূর্ণাঙ্গ সার্ভিস বাস্তবায়ন করতে গেলে পদ আপগ্রেডেশন ও কাজের সমন্বয় করা অপরিহার্য।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন