মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির পর উন্মোচিত
বিমানবন্দরের আশপাশে জাল ছাড়পত্রে গড়া বহুতল
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৩ এএম
গত বছর রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৩৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। হযরত শাহজালাল ও তেজগাঁও বিমানবন্দরের আশপাশে গত এক দশকে উচ্চতাসীমা লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠা পাঁচ শতাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ভেঙে, এমনকি জাল ছাড়পত্র ব্যবহার করেও নির্মিত হয়েছে এসব স্থাপনা। এসব ভবন অপসারণে বছরখানেক আগে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) চিঠি দিয়েও দৃশ্যমণ কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় যে কোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারান ৩৫ জন এবং গুরুতর আহত হন অন্তত ৬৫ জন। তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, কেবল যান্ত্রিক ত্রুটিই নয়; বরং বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) উপেক্ষা করে স্কুল ভবন নির্মাণের কারণেও হতাহতের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এই ট্র্যাজেডি দীর্ঘদিনের নীতিমালা লঙ্ঘন, দুর্বল এভিয়েশন আইন প্রয়োগ ও রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর চরম দায়িত্বহীনতার ধারাবাহিক পরিণতি।
বেবিচক সূত্র জানায়, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় গত এক দশকে নিয়ম লঙ্ঘন করে অন্তত ৫২৫টি উঁচু ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যা বিমান চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রায় এক বছর আগে এসব ভবন অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে রাজউককে চিঠি দেয় বেবিচক; কিন্তু আজও রাজউকের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) মানদণ্ড অনুযায়ী বিমানবন্দরের আশপাশের এলাকায় নির্ধারিত উচ্চতার বেশি স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ নেই। কিন্তু বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এসব বিধিনিষেধ কার্যকরভাবে মানা হয়নি; ফলে উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় বিমানের নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়েছে। তার মতে, শুধু অবৈধ ভবন শনাক্ত করলেই হবে না, দ্রুত আইন অনুযায়ী সেগুলো অপসারণ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো অননুমোদিত উচ্চ ভবন নির্মাণ না হয়, সেজন্য রাজউক, বেবিচক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানান, ভবন অপসারণ বা ভেঙে ফেলার আইনগত এখতিয়ার বেবিচকের নেই। তিনি বলেন, বিমান চলাচলের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনুমোদিত উচ্চতার বেশি ভবনগুলো চিহ্নিত করে একাধিকবার রাজউককে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এখন এসব ভবনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব রাজউকের।
এ বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, উচ্চতাসীমা অতিক্রম করা ভবনগুলোর বিষয়ে বেবিচক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে এবং সমন্বিতভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি এসব ভবনকে রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের আওতায় নিয়মিত পরিদর্শন করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
বেবিচকের ৬০ পৃষ্ঠার নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, কখনো রাজউকের নজর এড়িয়ে আবার বেবিচকের জাল বা ভুয়া ছাড়পত্র ব্যবহার করে বিমানবন্দরের রানওয়ের আশপাশে এসব অতিরিক্ত উচ্চতার ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী, রানওয়ের ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্টাকল লিমিটেশন সারফেস (ওএলএস) বজায় রাখতে হয় এবং এ এলাকায় দূরত্বভেদে ভবনের উচ্চতা শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ ফুট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকার কথা; কিন্তু বাস্তবে প্রভাব খাটিয়ে তিনতলার অনুমোদন নিয়ে ছয়-সাততলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দরের ওএলএস এলাকায় অবস্থিত হলিডে ইন হোটেল—যার অনুমোদিত উচ্চতা ১৫০ ফুট থাকলেও বাস্তবে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ২০০ ফুট, অর্থাৎ নিরাপত্তাসীমা লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত ৫০ ফুট উঁচু করা হয়েছে ভবনটি। এর চেয়েও গুরুতর অনিয়ম দেখা গেছে নিকুঞ্জ-২ এলাকায় অবস্থিত পাঁচতারকা হোটেল লা মেরিডিয়ানের ক্ষেত্রে; বেবিচকের অনুমোদন অনুযায়ী ভবনটির সর্বোচ্চ উচ্চতা ১৫০ ফুট হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে এর উচ্চতা প্রায় ১৮০ ফুট এবং বেবিচকের নথিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, হোটেল কর্তৃপক্ষ যে ছাড়পত্র উপস্থাপন করেছে, তা সম্পূর্ণ জাল।
এ ছাড়া সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও বেবিচকের যৌথ সমীক্ষায় তেজগাঁও বিমানবন্দরের রানওয়ে-১৭ এপ্রোচ পাথ এবং ভিভিআইপি হেলিপ্যাডসংলগ্ন এলাকার চিত্রও ভয়াবহ। কাফরুল ও শেওড়াপাড়া এলাকায় যেখানে ভবনের সর্বোচ্চ অনুমোদিত উচ্চতা শূন্য থেকে ১১ ফুট, সেখানে ২০ থেকে ১০৪ ফুট পর্যন্ত উচ্চতার ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যার মধ্যে মেসার্স বিল্ডার্স ও গ্রীন ভিউ হোমল্যান্ডের নয়তলা ভবন রয়েছে। এসব ভবনের কারণে হেলিকপ্টার ও বিমান ওঠানামা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে বলে রাজউককে সতর্ক করেছে বিমানবাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। একই ধরনের অনিয়ম দেখা গেছে উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরেও, যেখানে ৫ নম্বর সড়কের ২, ৯, ২১, ২৬, ৫৩ ও ৭০ নম্বর প্লটে নির্মিত ভবন ও টাওয়ার নির্ধারিত উচ্চতার সীমা অতিক্রম করে ১৮ থেকে ২৬ ফুট বেশি উঁচু করা হয়েছে।



