Logo
Logo
×

জাতীয়

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি আপনার পকেটে যেভাবে চাপ বাড়াতে পারে

Icon

বিবিসি বাংলা

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ১১:২৮ এএম

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি আপনার পকেটে যেভাবে চাপ বাড়াতে পারে

ঢাকার মিরপুর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন। চাকরি করেন একই এলাকায় অবস্থিত বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে। সেখানে যত টাকা বেতন পান, উচ্চমূল্যের বাজারে সেটি দিয়ে বাবা মা, স্ত্রী সন্তানসহ পাঁচজনের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর খবর তাকে রীতিমত দুশ্চিতায় ফেলে দিয়েছে।

‘এমনেই জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে বাজারে গেলে ঘাম ছুটে যায়। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর সাথে সাথে সেগুলোর দাম আবারও বেড়ে যাবে। কিন্তু আমাদের মতো মানুষের আয় তো বাড়ছে না। তাহলে আমরা বাঁচবো কীভাবে?,’ বিবিসি বাংলাকে বলেন মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন।  

তার এই উদ্বেগ যে মোটেও অমূলক নয়, অর্থনীতিবিদদের কথাতেও সেটির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে

তারা বলছেন, সাড়ে ১৪ লাখের বেশি সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারির বেতন বৃদ্ধি ফলে কেবল মূল্যস্ফীতিই বাড়বে না, সেইসঙ্গে বৈষম্য, দারিদ্র, তারল্য সংকটসহ আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে নানান ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে।

অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ‘সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন, সরকার সেদিকে দৃষ্টি না দিলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট আরও বেড়ে যেতে পারে।’ 

কার কত বাড়ছে?

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষিত হয়েছিল ২০১৫ সালে।

এরপর প্রতিবছর মূল বেতন পাঁচ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলেও নতুন করে আর পে স্কেলে ঘোষণা করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা।

২০২৫ সালে নতুন একটি বেতন কমিশন গঠন করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিশন বেতন কাঠামো পর্যালোচনা শেষে গত জানুয়ারি মাসে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন।

সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।

কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান সর্বনিম্ন বেতন স্কেল আট হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করেন কমিশনের সদস্যরা।

এছাড়া বৈশাখী ভাতার হার ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার পাশাপাশি যাতায়াত ভাতাও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।

নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করার জন্য অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

কমিশন গঠন করে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করলেও সেটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত পরবর্তী সরকারের হাতে ছেড়ে দেন অধ্যাপক ইউনূসের সরকার।

গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর আগের কমিশনের পরামর্শগুলো পর্যালোচনা করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে দশ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে বিএনপি সরকার।

সেই কমিটি ইতোমধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর একটি খসড়া রূপরেখা তৈরি করেছে, যেখানে ১১ থেকে ২০তম গ্রেড, অর্থাৎ মধ্যম ও নিম্ন পদের কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি গ্রেডে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য খুব শিগগিরই খসড়া রূপরেখাটি মন্ত্রিসভায় পাঠানোর কথা রয়েছে। অনুমোদন শেষে চলতি মাসেই গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে পারে বলে বলেও জানা যাচ্ছে।

‘মুদ্রাস্ফীতি উস্কে দিবে’

প্রতি পাঁচ বছর পরপর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ভাতা পর্যালোচনার বিধান থাকলেও গত দশ বছরে একবারও সেটি করা হয়নি। ফলে নতুন পে স্কেল ঘোষণার উদ্যোগকে যৌক্তিক বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর, ‘বিশেষ করে, গত এক দশকে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ খরচা যেভাবে বেড়েছে, সেই বিবেচনায় নতুন পে স্কেল ঘোষণার এই উদ্যোগ অত্যন্ত যৌক্তিক।’

কিন্তু উদ্যোগটি এমন একটি সময় নেওয়া হয়েছে, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

‘ফলে সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক হলেও আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে সেটি কী ধরনের প্রভাব ফেলবে বা নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে কি না, সেই প্রশ্নটি সামনে চলে আসছে,’ বলেন ড. মাহফুজ কবীর।

গত কয়েক বছর ধরেই দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতির হার উচ্চ। গত জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার আগের মাসের চেয়ে কিছুটা কমলেও এখনো সেটি নয় শতাংশের ওপরে রয়েছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘এর মধ্যে নতুন পে স্কেল ঘোষণা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উস্কে দিবে।’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, নতুন পে স্কেলে কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন দিতে গিয়ে যে বাড়তি বেতনের অর্থের প্রয়োজন হবে, সেটির জন্য সরকারকে ঋণ নিতে হবে বা নতুন করে টাকা ছাপাতে হবে।

বাড়তি ওই টাকা অর্থনীতিতে যোগ হলেই সার্বিক মুদ্রাস্ফীতি আরও বেড়ে যাবে।

‘তখন সেটা সামাল দেওয়া সরকারের জন্য আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াবে,’ বলেন ড. সেলিম রায়হান। 

বাড়তে পারে জিনিসপত্রের দাম

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বেড়ে যাওয়ার ফলে তাদের ক্রয় ক্ষমতা বেড়ে যাবে।

এর ফলে আগের চেয়ে বেশি কেনাকাটা করার কারণে বাজারে পণ্যের চাহিদাও বেড়ে যাবে।

‘ফলে স্বাভাবিকভাবেই জিনিসপত্রের দামও বেড়ে যেতে পারে,’ বলেন অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান।

তবে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ঠিক রেখে পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব।

‘কিন্তু আমাদের দেশের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চাহিদা বাড়লেই বরং ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম কয়েকগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়,’ বলছিলেন ড. মাহফুজ কবীর।

ফলে নতুন পে স্কেল ঘোষণার পর বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

‘এক্ষেত্রে সরকার যদি নিত্যপণ্যের সংকট বা লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে ভোগান্তি থেকে তাদের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ তৈরি হতে পারে,’ বলেন মাহফুজ কবীর।

বৈষম্য ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির শঙ্কা

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হিসেবে, বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন পদে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা সাড়ে ১৪ লাখের কিছু বেশি। নতুন পে স্কেলের আওতায় মূলত তাদেরই বেতন ভাতা বাড়তে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, বেসরকারিখাতের শ্রমশক্তির সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি ৯৭ লাখ।

‘অর্থাৎ মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতে কাজ করছে, অথচ সরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে তাদের বেতন ভাতা বাড়ছে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দুই অংশের মধ্যে একটা বৈষম্য তৈরি হচ্ছে,’ বলছিলেন অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হান।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আয়ের বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে। সেইসঙ্গে, বাড়ছে দারিদ্র্যের হার।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালে দেশটিতে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক সাত শতাংশ, ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে ২১ দশমিক চার শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

‘সরকারির পাশাপাশি বেসরকারিখাতের কর্মজীবীদের বেতন ভাতা না বাড়লে আয় বৈষম্য আরও বেড়ে যেতে পারে, যার ফলে দেশে দারিদ্র্যের হারও বৃদ্ধি পেতে পারে,’ বলেন অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর।

তারল্য সংকট

২০২৬ ২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ প্রায় ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন ও গ্রাচুইটিসহ যা এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।

বাজেটের ‘জনপ্রশাসন নিট’ খাতে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত অর্থের অন্তত ৪৪ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে মূলত সরকারি কর্মচারী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক এবং পেনশনভোগীদের জন্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য।

‘কিন্তু বাড়তি এই ব্যয়ের বিপরীতে সরকার আয় তো সেভাবে বাড়ছে না, বরং নতুন বাজেটে যে বিপুল আর্থের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, সেটা মেটাতেই সরকারকে দেশে বিদেশে ঋণের দিকে ঝুঁকতে হবে,’ বলেন অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর।

এক্ষেত্রে বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে হলে অর্থনীতি বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন তিনি।

‘আবার দেশি ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিলে সেখানে তারল্য সংকট দেখা দিবে, সেটাও আরেক সমস্যা,’ বলেন মাহফুজ কবীর।

সরকার কী বলছে?

দেশে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন যে চ্যালেঞ্জিং হবে, বিএনপি সরকারও সেটা স্বীকার করছে।

তারপরও ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই তারা নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করতে চান বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

‘ইশতাহারে বলা হয়েছে যে যথাসময়ে বাস্তবায়ন করা হবে এবং সেই অনুযায়ীই একটা রিভিউ করা হয়েছে,’ সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে বলেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

এক্ষেত্রে বেতন ভাতা একবারে না বাড়িয়ে সেটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে সরকার।

‘আমরা কয়েকটা ধাপে এটা করবো, প্রথমেই বেতন বা বেসিকটা বাড়ানো হবে,’ বলেন মাহমুদ তিতুমীর।

আর আগে, গত জুনে সংসদে দেওয়া বাজেট বক্তব্যে নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন পে স্কেল কয়েক ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী।

‘সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর যাবৎ একই বেতন কাঠামোতে বেতন ভাতা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতিজনিত কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো আগামী পহেলা জুলাই ২০২৬ হতে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি,’ সংসদে বলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

পে স্কেল পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশে প্রথম দুই অর্থবছরে মূল বেতন ৫০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি এবং তৃতীয় বছরে ভাতা কার্যকরের কথা বলা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।

সরকার মনে করে, এভাবে ধাপে ধাপে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ভাতা বৃদ্ধির ফলে অর্থনীতির ওপর তুলনামূলকভাবে চাপ কম পড়বে।

Swapno

Abu Al Moursalin Babla

Editor & Publisher

Major(Rtd)Humayan Kabir Ripon

Managing Editor

Email: [email protected]

অনুসরণ করুন