চীনের বাজারে বাংলাদেশের জন্য দরজা অনেকটাই খোলা। ২০২০ সালে বাংলাদেশি পণ্যের ৯৭ শতাংশের জন্য শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা চালু করে বেইজিং। পরে ২০২৪ সালে সেই সুবিধা সম্প্রসারণ করে প্রায় সব পণ্যের আওতায় আনা হয়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির বাজারে প্রবেশের এমন সুযোগ তৈরি হলেও প্রত্যাশিত সুফল পায়নি বাংলাদেশ।
চীন থেকে প্রতিবছর প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করলেও দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও এক বিলিয়ন ডলারের নিচে অবস্থান করছে। এ বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরকে নতুন সম্ভাবনার জানালা হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে ৭৪২ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে, যা দেশের মোট আমদানির প্রায় ২৭ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈষম্যের অন্যতম কারণ বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা। দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। অথচ চীন নিজেই বিশ্বের বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ এবং বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক বিদেশে রপ্তানি করে। ফলে বাংলাদেশের প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের জন্য সেখানে বড় বাজার তৈরি করা সহজ নয়।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র্যাপিড)-এর চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, শুধু শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেই রপ্তানি বাড়ে না। চীনা ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন, বাজার সম্পর্কে জ্ঞান এবং শক্তিশালী বাণিজ্যিক সংযোগ গড়ে তোলা জরুরি।
তার মতে, চীনের খুচরা বিক্রয় নেটওয়ার্ক, সুপারমার্কেট চেইন, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ও আমদানিকারকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারলে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য সেখানে বড় বাজার তৈরি করা কঠিন হবে। এজন্য বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও চীনা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগভিত্তিক উৎপাদন ও বিপণন মডেল গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।
বাংলাদেশ-চীন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মো. খোরশেদ আলম বলেন, বিকল্প উৎসের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ কম দামে চীনা পণ্য পাওয়া যায়। ফলে শিল্প খাতের জন্য চীনের ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমানো বাস্তবসম্মত নয়।
একই মত প্রকাশ করেন সিকম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক। তিনি বলেন, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য, উন্নত সরবরাহব্যবস্থা, দ্রুত লিড টাইম এবং কম রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের কারণে শিল্প উপকরণের প্রধান উৎস হিসেবে চীনের বিকল্প খুঁজে পাওয়া কার্যত অসম্ভব।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও চীন সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা করছে। এ বিষয়ে যৌথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হলেও আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের জন্য এফটিএ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এমন চুক্তি দেশীয় শিল্পের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং সরকারের রাজস্ব আয়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বাজারে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশকে নতুন কৌশল নিতে হবে। সম্ভাবনাময় ২০ থেকে ৩০টি পণ্য চিহ্নিত করে সেগুলোর মানোন্নয়ন, সার্টিফিকেশন, আধুনিক প্যাকেজিং এবং বাজার উপযোগী উন্নয়নের পাশাপাশি চীনের প্রধান শহরগুলোতে শক্তিশালী বাণিজ্যিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রাংশ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম, কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালকা প্রকৌশল শিল্পে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনা বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব ছাড়া চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন কঠিন।
তাদের ভাষায়, শুল্কের দরজা ইতোমধ্যে খুলেছে। এখন সেই দরজা দিয়ে প্রবেশের জন্য দরকার প্রতিযোগিতামূলক পণ্য, কার্যকর বাজারসংযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগভিত্তিক অংশীদারিত্ব।



