রিজার্ভ চুরি মামলায় ১০ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে চার্জশিট, গ্রেপ্তারের প্রস্তুতিতে সিআইডি
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ০৯:৫৮ পিএম
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলায় খসড়া চার্জশিটে নাম থাকা বাংলাদেশি ১০ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এরইমধ্যে ইমিগ্রেশনে ব্লক করা হয়েছে সবার পাসপোর্ট। যদিও গুঞ্জন ওঠেছে এরইমধ্যে দেশ ছেড়েছেন সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান, এএফএম আসাদ ও শুভঙ্কর সাহা। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি সিআইডির দায়িত্বশিল কর্মকর্তারা। এমন পরিস্থিতিতে আর কোন কর্মকর্তা যেন দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সেজন্য গোয়েন্দা নজরদারী বাড়ানো হয়েছে বলে সিআইডির দায়িত্বশিল সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি আলী আকবর খান বলেন, এই মামলার তদন্ত আসলে অন্যান্য মামলার মতোর তদন্তের মতোই চলমান। এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী সময় লেগেছে এটা সত্য। কিন্তু এটার টেকনিক্যাল কারণগুলাও আছে। যেহেতু এটা অর্ডিনারি কোন মামলা না। অনেক টেকনিক্যাল আসপেক্ট আছে। অনেক দেশী বিদেশী সংস্থার সহায়তা আমরা নিয়েছি। এটার অফিশিয়াল ভার্সনটা পেতে আমাদেরকে অনেক সময় লেগেছে রাষ্ট্রীয়ভাবে এটা এপ্রুভাল হয়ে।
তিনি বলেন, এফবিআই থেকে যখন একটা রিপোর্ট পাবেন ওদের তো একটা খুব হাইয়েস্ট লেভেল থেকে একটা এপ্রুভাল হওয়ার পরে ওরা দিবে, এই সভা এগুলো একটা টাইম কনজি সেই কারণে আমরা এখন গুছিয়ে এনেছি। আমরা এটা নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে যোগাযোগ করেছি উনাদের যদি কোনো মতামত প্রয়োজন হয়। এটা আমাদের রুটিং ওয়ার্কের মধ্যে ছিলো। এই মামলার তদন্ত ক্লোজ করে আনা হয়েছে আমরা আশা করি যে খুব বেশি দেরি হবে না অভিযোগপত্র দিতে।
অভিযোগপত্রে বাংলাদেশী যাদের নাম থাকবে তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে তিনি বলেন, হ্যাঁ সেটা সেটা আমরা দেখবো। এটা আমাদের কন্সিডারেশন আছে ওইটা আমরা এখনো কোনো ফাইনাল কনক্লুশনে আসিনি। ইনশাল্লাহ অভিযোগপত্র কনক্লুড হলে আমরা গ্রেপ্তার অবশ্যই করব। মামলার ক্ষেত্রে যা করা প্রয়োজনীয় সুষ্ঠু তদন্তের ক্ষেত্রে আমরা তাই করব।
জানা গেছে, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির অন্যতম বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি মামলার খসড়া অভিযোগপত্রে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের ৯ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে প্রস্তুত করা অভিযোগপত্রে অভিযুক্তদের দায়িত্বে অবহেলা, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি এবং ঘটনার পর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে বলে সিআইডি সূত্রে জানা গেছে।
সিআইডি সূত্র জানায়, রিজার্ভ চুরি মামলায় মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ জন সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাকে এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, আনিস এ খান, কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, শুভঙ্কর সাহা, রেজাউল করিম, জোবায়ের বিন হুদা, এ এফ এম আসাদুজ্জামান, মেজবাউল হক, আবুল কাসেম এবং মোঃ সুলতান মাসুদ আহম্মেদ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের ১০ অভিযুক্তের মধ্যে ৯ জনই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা।
সিআইডির দায়িত্বশিল সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর এই মামলার দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের সন্দেহভাজনদের পাসপোর্ট ব্লক করে দেয় ইমিগ্রেশনে। কিন্তু তার আগেই অন্তত তিনজন দেশ ছাড়েন। মূলত তারা ৫ আগস্টের আগেই দেশের বাইরে চলে যায়। বাকী সন্দেহভাজনরা এখনও দেশে আছেন। তবে তারা যেন দেশ ছাড়তে না পারে, সেজন্য এরইমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সজাগ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মূলত তারা এখন নজরবন্দি অবস্থায় আছেন।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। সুইফট পেমেন্ট ব্যবস্থায় ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা এ অর্থ সরিয়ে নেয়। ঘটনার ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংক রাজধানীর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে। শুরু থেকেই মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
তদন্তে সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘটনার দিন সুইফট সিস্টেমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ফিশিং লিংক থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলা এবং ঘটনার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের গাফিলতির তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার পর বিষয়টি জানার পরও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব হয়েছিল।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, মামলার তদন্তে দেখা গেছে বাংলাদেশের এই ১০ জন অভিযুক্ত আসামি এ ঘটনায় তাদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং দায়িত্ব অবলা প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া তারা অজানা কারণে ঘটনার দিনে সুইফ সিস্টেমের নিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত করেনি। ব্যাংকিং কার্যক্রম শেষে তারা হ্যাকারদের পাঠানো ফিশিং লিংকে ক্লিক করে সেটা ওপেন রেখে ব্যাংক থেকে বের হয়ে চলে যায়। তারা সিস্টেমের যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে বের হয়ে চলে যান। ফলে হ্যাকাররা ঐ লিংক ব্যবহার করে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি করে নিয়ে যায়। ঘটনার পর অভিযুক্তরা বিষয়টি জানতে পারলেও পরে কোনো ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করিনি। উল্টো তারা ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার নানা প্রচেষ্টা চালায়। এছাড়া তদন্তে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তাদের আরও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।
সিআইডি সূত্রে জানা যায়, গত ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা সুইফট পেমেন্ট পদ্ধতিতে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। ঘটনার ৩৯ দিন পর রাজধানীর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। শুরু থেকেই মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডি সূত্র আরও জানায়, গত বছরের ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে প্রধান করে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছয় সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ওই কমিটির তত্ত্বাবধানে রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। পরে গত ১ এপ্রিল খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে আইনি পরামর্শের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে হস্তান্তর করে সিআইডি। খসড়া অভিযোগপত্রে দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এর মধ্যে ফিলিপাইনের ৩৬, উত্তর কোরিয়ার ২, চীনের ৩, শ্রীলঙ্কার ৮, জাপানের ১, ভারতের ৪ এবং বাংলাদেশের ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনা ঘটে। অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা সুইফট পেমেন্ট ব্যবস্থায় ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে এই অর্থ সরিয়ে নেয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ঘটনার ৩৯ দিন পর বাংলাদেশ ব্যাংক রাজধানীর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে। শুরু থেকেই মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্টতা, অর্থপাচারের পথ ও প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।



