রাজধানীর নিউমার্কেটে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাইম আহমেদ টিটন হত্যার তদন্ত নিয়ে গোলকধাঁধায় পড়েছেন গোয়েন্দারা। ঘটনার পর থেকেই এই মামলার ছায়া তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্তত দুটি ইউনিটের সদস্যরা। তবে মামলার এজাহার অনুযায়ী এই খুনে পিচ্চি হেলালকে আসামি করা হলেও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা।
এরইমধ্য এই খুনের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনেরই ভগ্নিপতি ইমনকে দায়ী করছেন পিচ্চি হেলাল। একই সাথে বসিলা হাটের ইজারা পেতে নয়ন নামে এক যুবদল নেতা সহায়তা করছে বলে ইমনের একটি বক্তব্যের রেকর্ড ছড়িয়ে পড়লে বেধেছে নতুন জটিলতা।
এই পশুর হাট নিয়েই খুনের ঘটনা ঘটেছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। সার্বিক এমন পরিস্থিতিতে নির্দেশ দাতার পেছনে না ছুটে কিলারকে গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। কারণ কিলার গ্রেপ্তার হলে নির্দেশদাতাকে সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে তদন্ত তদারক সূত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন খুনের ঘটনায় শ্যুটারদের শনাক্ত করার কাজ করছে গোয়েন্দারা। এরই মধ্যে দুই শ্যুটারসহ ব্যাকআপে থাকা আরো ৬জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। যে বাইকে দুই খুনি পালিয়েছে সেটিও শনাক্ত করা হয়েছে। এখন শ্যুটারদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলেই নির্দেশদাতাদের কাছে পৌঁছাবেন গোয়েন্দারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এরইমধ্যে খুনে সম্পৃক্ত থাকা দুইজনকে গোয়েন্দা জালে রাখা হয়েছে। যেকোন সময় তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, ঘটনার পর থেকে ডিবি ছাড়া তদন্ত করছে। এখনও এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। সম্ভাব্য কিছু কারণ সামনে রেখে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তদন্ত তদারক সূত্রমতে, টিটন খুনের ঘটনায় নিউমার্কেট থানায় দায়ের করা মামলায় পিচ্চি হেলালের নাম আসার পরই শুরু হয় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। বিদেশে অবস্থানরত পিচ্চি হেলালের দাবি, ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন ও তার বোনই পরিকল্পিতভাবে টিটনকে খুন করেছে। তার বোন লীনাও ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর এলাকায় চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত। অতিরিক্ত নেশাগ্রস্ত লোকরা সন্দেহপ্রবণ হয় এমনটা দাবি করে পিচ্চি বলেন, ইমনের জায়গা দখল করে নিতে পারে টিটন এই সন্দেহ থেকেই খুন করা হয়েছে টিটনকে। এই ঘটনায় টিটনের ভাই মামলা করলেও সব নির্দেশই দিচ্ছে ভগ্নিপতি ও বোন। অন্যদিকে মামলার বাদী টিটনের ভাই এজাহারে বছিলা গরুর হাঁটকে কেন্দ্র করে সমঝোতার জন্য ডেকে নিয়ে খুন করা হয়।
টিটন খুন নিয়ে পিচ্চি হেলাল বলেন, টিটনরা দুই ভাই যশোরে ছাত্রদল করতো। মোহাম্মদপুরে একটা বাসা ছিল। মাঝে মাঝে এখানে এসে থাকতো। আমি মোহাম্মদপুরে ছাত্রদল করতাম, ওরা যশোরে ছাত্রদল করতো। টিটন ফাস্ট ডিভিশনের ফুটবল খেলোয়াড় ছিল। ওই সুবাধেই ওর সাথে আমার পরিচয়-সম্পর্ক। পরবর্তীতে পর্যায়ে কারাগারে গিয়ে আবার দেখা। তারপর থেকেই ওর সাথে আমার সুসম্পর্ক। বের হওয়ার পরও ফোনে ওর সাথে আমার কথা হতো। সবশেষ গেল ঈদের আগে আমার কথা হয়েছে। তিনি বলেন, গরুর হাঁট নিয়ে যে এজাহারটা সাজানো হয়েছে, সেই গরুর হাটের সাথে আমি বা টিটন কেউই জড়িত না। গরুর হাট নেওয়ার বিষয়ে আমাদের কারও ইচ্ছেও নাই। কিন্তু মামলার এজাহারে বিষয়টি উঠে আসছে। এখানে প্রথম কথা হচ্ছে, টিটনকে ওই জায়গায় (নিউমার্কেট) কে নিলো। যে নিয়েছে সেই এ খুনের সঙ্গে জড়িত। সেটা নিউমার্কেট এলাকা, ইমনের অধ্যুষিত এলাকা। ওই এলাকায় চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে সন্ত্রাসবাদ সবই ইমন করে। প্রতিদিনের বাংলাদেশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা মাল্টিপ্ল্যান মার্কেটে ২ ব্যবসায়ীকে কোপানোর ঘটনার তথ্যে তিনি বলেন, এলিফ্যান্ট রোড নিয়ে আমার কোনো বিরোধ নেই। কিন্তু মিডিয়া লিখেছে এখানে দুই গ্রুপ। এখানে কোনো গ্রুপ নেই। ইমন বনাম ব্যবসায়ী, এখানে কোনো গ্রুপ নেই। এলিফ্যান্ট রোড কম্পিউটার সমিতির সভাপতি আমার ভাই। ইমন সেখানে চাঁদা চাইতে গিয়েছে। চাঁদা নিতে পারেনি। তাকে প্রত্যাখান করা হয়েছে। যে কারণে আমার বড় ভাইকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য এহতেশামকে কুপিয়ে আহত করে। আমার বড় ভাই না হয়ে অন্য কেউ সভাপতি হলে তাহলে দুটি গ্রুপের কথা আসতো না। যেহেতু আমার বড় ভাই সেখানকার সভাপতি সেহেতু ইমনরা মিডিয়া দিয়ে ওইটাকে দুটি গ্রুপ করে দিয়েছে। যাতে ওর ওপরে একা দোষারোপ না আসে।
তিনি বলেন, টিটন খুনে ইমন না শুধু ইমনের বউও জড়িত। ইমনের বউ চাপ দিয়ে টিটনের ভাইকে বাদী করে মামলা করেছে। টিটনের পরিবারও জানতো ইমন টিটনের ক্ষতি করার চেষ্টা করতেছে। তারা এটাও জানতো ইমন টিটনকে খুন করবে। কিন্তু ভগ্নিপতির সঙ্গে টিটনের বিরোধ কেন হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এই বিরোধটা আজকের না। আজ থেকে ২২ বছর আগে তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
ইমন যখন ভারতে ছিল, সেখানে বসে যখন দেশে বিভিন্ন খুন-খারাবি করাতো, তখন ইমনের সম্বন্ধী হিসেবে বিভিন্ন মামলা জড়িয়ে পড়ে টিটন। এ নিয়ে টিটন ইমনের সঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচি করেছিল। এটা নিয়ে ইমনের সঙ্গে টিটনের প্রথম সম্পর্ক নষ্ট হয়। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে সরকারের পুরস্কার ঘোষণার পর যখন টিটন গ্রেপ্তার হয়, তখন টিটন মনে এই পুরস্কার ঘোষণাও ইমনের জন্য।
টিটন এও মনে করে যে তার গ্রেপ্তারের নেপথ্যেও ইমন জড়িত। যে কারণে পরবর্তীতে তাদের সম্পর্কটা আর স্বাভাবিক হয়নি। ইমন অতিরিক্ত নেশা করতো। নেশাখোররা সন্দেহপ্রবণ হয়ে থাকে। সন্দেহের বশেই টিটন, তারিক সাইফ মামুনদের নিজের অবস্থানের জন্য হুমকি মনে করতো ইমন। যে কারণে সন্দেহ প্রবণতা থেকেই তাদেরকে খুন করে ইমন। ও মনে করতো ওর আধিপত্যের মধ্যে ওরা কখনো না কখনো ডিস্টার্ব হয়ে দাঁড়াবে। যে কারণে আগে থেকেই ওদের সরানোর জন্য চিন্তা করে রেখেছিল।
কিলিং মিশনে কারা ছিল এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা তো আমি বলতে পারবো না। আমি এই আইনেরই লোক না। আমাকে হয়তো নামের আগে শীর্ষ সন্ত্রাসী জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার একটা রাজনৈতিক পরিচয় আছে। ১৯৯৩ সালে আমি থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম।
তিনি বলেন, টিটনের বোন ইমনকে বাদ দিয়ে পরিবারকে চাপ দিয়ে আমাদের নামে মামলা করার চেষ্টা করেছে। দেখবেন সবগুলো আসামি কিন্তু মোহাম্মদপুরের, ধানমন্ডির কেউ নাই। পরিকল্পিতভাবে মামলার এজাহারটা লেখা হয়েছে। ইমন আর ইমনের বউয়ের নির্দেশে এজাহারটা হয়েছে। স্বাক্ষর দিয়েছে শুধু তার ভাই। তার ভাইয়ের কোনো কিছু বলার ক্ষমতা নেই।
তিনি আরও বলেন, ইমনের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ইমনের পুরো নেটওয়ার্ক দেখে দক্ষিণ যুবদল নেতা নয়ন। ওই নেতা বদ কাজ করতেছে। বদ লোকের সংস্পর্শে সে নষ্ট হয়েছে।
কি আছে ইমনের ভয়েজ রেকর্ডে: এদিকে প্রতিদিনের বাংলাদেশের হাতে আসা অপর এক অডিওতে শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনকে বলতে শোনা যায়, মাসুম ও অন্যান্যরা থাকবে থাকবে নয়ন এটা ডিসি হেডকোয়ার্টার এবং আমাদের তেজগাঁও ডিসি সবাইরে বলে দিয়েছে। মাসুম থাকবে। আর রনির সঙ্গে রনিকে ভালোভাবে আদর করে বুঝিয়ে কথা বলো। রনিকে আমাদের পক্ষে নিয়ে আসো। তাহলে মোহাম্মদপুরের হাঁটটার চিঠি নেওয়া যাবে। আর রাজেশ? নবীরে দিয়ে ফোন করালে মিল্টনরা এমনিই চলে আসবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন বলেন, ওই নয়ন (রেকর্ডে আসা) কি আমি কিনা, সেটা কি নিশ্চিত হয়েছেন? আমি নিজেই তো প্রশাসনের ভয়ে থাকি। আমাদের ভেতর থেকে তো ৫ই আগস্টের আগের ভয়ই এখনো যায়নি। আর প্রশাসনের সাথে আমার ওই রকম বেশি নেটওয়ার্ক নেই।
তিনি আরও বলেন, ইমনের রেকর্ডে উঠে আসা নয়ন আমি নাও হতে পারে। আমিই যে নয়ন সে নয়ন নাও হতে পারে। অন্য কেউ হতে পারে। আর আমার তো প্রশ্নই আসে না। যদি পদ-পদবি উল্লেখ করে বলতো কেউ তাহলে না হয় বুঝতাম যে- হয়তো আমার কথাই বলছে।
এদিকে ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার রাত ৮টার দিকে টিটনের মরদেহ তার যশোরের বাড়িতে পৌঁছায়। ওই সময় শহরের কারবালার বাড়িতে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। রাতেই জানাজা শেষে শহরের কারবালা কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে। নিহত টিটন যশোর শহরের খড়কি আপনমোড় এলাকার বাসিন্দা জুটমিল কর্মকর্তা কে এম ফকরউদ্দিনের ছেলে খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন।



