পুলিশের শীর্ষ পদে রদবদলের প্রস্তুতি, গণহারে বদলি নয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৪ এএম
নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ পদগুলোতে পরিবর্তনের আভাস মিলেছে। মহাপরিদর্শকসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে নতুন নিয়োগের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে আপাতত সব স্তরে গণহারে বদলি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদায়ন ও দায়িত্ব প্রদান হবে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে দক্ষতা ও পেশাগত সক্ষমতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। নির্বাচনের পর কিছু ইউনিটে অভ্যন্তরীণ বদলি হতে পারে, তবে তা হবে নিয়মমাফিক ও পর্যায়ক্রমে।
সরকার গঠনের পর প্রথম কর্মদিবসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বলেন, কে কোন দলকে ভোট দিয়েছেন, তা ভুলে গিয়ে এখন সবাইকে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হবে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মহাপরিদর্শক ছাড়াও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনীর মহাপরিচালক, পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধান, অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধানসহ কয়েকটি শীর্ষ পদে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে উপমহাপরিদর্শক, পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আপাতত এসব পদে ঢালাও বদলির পরিকল্পনা নেই।
পুলিশপ্রধান বাহারুল আলম দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভাব্য নিয়োগ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মহাপরিদর্শক ও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের পদে নতুন নিয়োগের ফাইল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। শীর্ষ দুই পদে নিয়োগ সম্পন্ন হলে অন্য পদগুলোতেও সিদ্ধান্ত আসবে।
পুলিশের অভ্যন্তরে সম্ভাব্য নিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলছে। শীর্ষ ছয় পদে নিয়োগ পেতে পারেন—এমন কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম ঘুরছে আলোচনায়। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক দেলোয়ার হোসেন মিঞা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির, অপরাধ তদন্ত বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ছিবগাত উল্লাহ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনীর মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার হাসিব আজিজ, রেলওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান, দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনীর অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফারুক আহমেদ, পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এ কে এম আওলাদ হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মতিউর রহমান শেখ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সাবেক সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠান এবং অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোসলেহ উদ্দিন আহমদ।
অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে তদবিরও শুরু হয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, নিয়োগ হবে সম্পূর্ণ যোগ্যতার ভিত্তিতে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কেউ আত্মগোপনে গেছেন। এমন প্রেক্ষাপটে আবার গণহারে বদলি করলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে সরকার। গত ১৭ মাসে বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে, সেই ধারাবাহিকতা ভাঙতে চায় না প্রশাসন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন হলেও নিচের স্তরে এখনই বড় ধরনের রদবদল হবে না। মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিবও জানান, সরকার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
তবে কিছু জেলায় নিয়মিত বদলি কার্যক্রম চলছে। যেমন, বগুড়া জেলা পুলিশ সম্প্রতি মাঠপর্যায়ের ১৬ জন কর্মকর্তার থানাভিত্তিক বদলি করেছে। জেলা পুলিশ জানিয়েছে, এটি ছিল নিয়মিত প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ মনে করেন, নতুন সরকার যদি পুলিশকে জনগণের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে চায়, তবে অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য। তাঁর মতে, সুশৃঙ্খল ও স্বচ্ছ পদায়ন প্রক্রিয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং তার সুফল সরকার ও জনগণ উভয়ই পাবে।



