একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে রাষ্ট্রপতি–প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৫ এএম
রক্তস্নাত ঐতিহাসিক ২১ ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পরিণত হয় গভীর শোক ও গৌরবের এক নীরব সমাবেশে। রাত ১২টা ০১ মিনিটে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাত ১২টায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে প্রথমে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন রাষ্ট্রপতি। এরপর প্রধানমন্ত্রী ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে তারা কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর সম্মান জানান।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রীসহ উপস্থিত হাজারো মানুষ ভাষা শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন। মোনাজাত শেষে প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে পুনরায় শ্রদ্ধা জানান। পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষ নেতারা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা শ্রদ্ধা জানান।
এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন ও নির্বাচন কমিশনাররা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। তিন বাহিনীর পক্ষে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরাও ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান জানান।
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
প্রথম প্রহরের আনুষ্ঠানিকতা চলাকালে নিরাপত্তা বেষ্টনির বাইরে অপেক্ষা করেন হাজারো মানুষ। মধ্যরাত ছোঁয়ার আগেই ফুল হাতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন তারা। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শহীদ মিনার সবার জন্য খুলে দেওয়া হলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষ একে একে বেদিতে ফুল অর্পণ করেন।
শ্রদ্ধা নিবেদনের আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দীর্ঘদিনের ‘ফ্যাসিস্ট শাসনের’ অবরোধ কাটিয়ে এবারের একুশ মুক্ত পরিবেশে পালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের নেতৃত্বে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। ইনসাফভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি। ভাষা আন্দোলনের চেতনায় দেশ, গণতন্ত্র ও সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করার কথাও তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব।
১৯৫২ সালের এই দিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নেমে ছাত্রদের রক্তে রচিত হয়েছিল ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর ও জব্বারসহ নাম না জানা অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগে অর্জিত হয় মাতৃভাষার মর্যাদা। সেই আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করা হয়, যা আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে।
অমর একুশে উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন।
দিবসটি উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটি। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে এবং উত্তোলন করা হয়েছে কালো পতাকা। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণীতে ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
শোক ও গৌরবের সংমিশ্রণে একুশ আজও মনে করিয়ে দেয়, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও অমর অঙ্গীকার।



