বিদ্যুতের দাম ও কয়লার সূচক নিয়ে বিরোধ
আদানি-পিডিবি দ্বন্দ্ব গড়াল সিঙ্গাপুরের সালিসি আদালতে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:১৫ এএম
জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত কয়লা ও উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে চলমান বিরোধের নিষ্পত্তি চেয়ে সিঙ্গাপুরের একটি আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে ভারতের আদানি পাওয়ার। এর বিপরীতে বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকারও।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, সিঙ্গাপুরের ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে (এসআইএসি) আদানির দায়ের করা প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করতে একটি প্যানেল গঠন করা হচ্ছে। এতে কারিগরি বিশেষজ্ঞ হিসেবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) চেয়ারম্যান এবং আইনি বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আজকের পত্রিকা। তবে আওয়ামী লীগ আমলের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি পর্যালোচনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আদানির সঙ্গে চুক্তি পুনর্মূল্যায়নে কোনো ব্রিটিশ আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়া হয়নি বলে দাবি করেছেন সরকারি কর্মকর্তারা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুতের মূল্য সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে সরকার সিঙ্গাপুরের সালিসি আদালতের প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবি যৌথভাবে ইতোমধ্যে কারিগরি ও আইনি বিশ্লেষণের জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের নভেম্বরে পিডিবি ও আদানি পাওয়ারের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে আদানি। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সেখান থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হয়।
তদন্ত কমিটির অভিযোগ অনুযায়ী, চুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ থেকে ৫ সেন্ট বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ আইনের আওতায় করা এসব চুক্তিতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে কারসাজির ফলে আদানি প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার আদায় করছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, চুক্তির সময় ইন্দোনেশিয়ার কয়লার বাজারদরকে সূচক হিসেবে ধরা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই সূচকে পরিবর্তন এলেও আদানি বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করেনি। এর ফলে পিডিবির সঙ্গে বিল পরিশোধ নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। বর্তমানে দুই পক্ষের হিসাবের ব্যবধান প্রায় ৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আদালতে যাওয়ার আগে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হলেও আদানি তা গ্রহণ না করে এসআইএসি-তে গেছে। সালিসি আদালতের নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমে আদালতের বাইরে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা হবে। সেটি ব্যর্থ হলে আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু হবে।
পিডিবি সূত্র জানায়, বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিদলে রয়েছেন পিজিসিবির চেয়ারম্যান রেজওয়ান খান এবং ব্যারিস্টার এহসান আব্দুল্লাহ সিদ্দিক। তবে এ বিষয়ে তাঁদের সরাসরি বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে আদানি পাওয়ারের জনসংযোগ প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তাদের দাবি, আদানি প্রতিযোগিতামূলক দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে এবং বিপুল বকেয়া থাকা সত্ত্বেও সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। বকেয়া অর্থ পরিশোধে বিলম্বে তাদের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়ে দ্রুত পাওনা পরিশোধের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।



