প্রবাসী ভোটেই বদলাতে পারে ফল, পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন ছাড়াল ১৫ লাখ
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিতে ইতোমধ্যে ১৫ লাখের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন। নির্বাচন কমিশন ও বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুলসংখ্যক ভোট অনেক আসনেই নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেসব আসনে অতীতে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে, সেখানে পোস্টাল ব্যালট এবার ফল উল্টে দেওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপে এখন পর্যন্ত ১৫ লাখ ২০ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি এবং নারী ভোটার প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার। মোট ৬০টি দেশ থেকে প্রবাসীরা এই ব্যবস্থায় নিবন্ধন করেছেন। সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন হয়েছে বাংলাদেশ থেকেই, ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৪২৮ জন। প্রবাসী দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। আর ক্যামেরুন, কলম্বিয়া, গায়ানা, নাইজার ও জিম্বাবুয়ে থেকে একজন করে ভোটার নিবন্ধন করেছেন।
পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার বিধান আগেও আইনে থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা চালু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও এমআইএসটির বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এবং বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই পদ্ধতি তৈরি করা হয়।
এই ব্যবস্থায় ভোটাররা প্রথমে পোস্টাল ভোট বিডি অ্যাপে নিবন্ধন করেন। এরপর নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ঠিকানায় ডাকযোগে ব্যালট পেপার পাঠানো হয়। ভোটার ব্যালটে ভোট দিয়ে নির্ধারিত ফিরতি খামে তা পাঠালে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ব্যালট পৌঁছে যায়। প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রক্রিয়ার কারণেই একে আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট বলা হচ্ছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতীতে বহু সংসদীয় আসনে ১০ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয়ের নজির রয়েছে। অথচ এবার অনেক আসনেই পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে পোস্টাল ব্যালটের ভোট ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
পোস্টাল ব্যালটে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন হয়েছে ফেনী-৩ আসনে, যেখানে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১৬ হাজার ৯৩ জন। এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম-১৫, কুমিল্লা-১০, নোয়াখালী-১ ও নোয়াখালী-৩ আসন। ১০ হাজারের বেশি নিবন্ধন রয়েছে এমন আসনের সংখ্যা একাধিক, আর ৫ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে নিবন্ধন রয়েছে এমন আসন রয়েছে কয়েক ডজন।
জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ভোটার নিবন্ধন হয়েছে কুমিল্লা জেলায়, ১ লাখ ১২ হাজারের বেশি। এরপর রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী। সবচেয়ে কম নিবন্ধন হয়েছে বান্দরবান জেলায়। দেশভিত্তিক হিসাবে প্রবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন সৌদি আরবে, প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার। এরপর মালয়েশিয়া, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালি।
নারী ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও নির্বাচন কমিশনের আশা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবধান কমবে। পুরুষ ভোটার যেখানে ১২ লাখের বেশি, সেখানে নারী ভোটার প্রায় আড়াই লাখ।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থায় ভোটারপ্রতি ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭০০ টাকা। অ্যাপ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ৪৮ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে পোস্টাল ব্যালটে সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে ইসি কর্মকর্তা আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পোস্টাল ব্যালট চালু করা হয়েছে। এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে। ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, ডাক বিভাগের হিসাব অনুযায়ী সবচেয়ে দূরের দেশ থেকেও চিঠি আসতে সর্বোচ্চ ২৮ দিন সময় লাগতে পারে। সে কারণে প্রবাসী ভোটাররা দেশের ভোটের আগেই তাদের ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
সব দিক বিবেচনায়, ভোটার সংখ্যা ও আসনভিত্তিক বিস্তারের কারণে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে পড়া ভোটই হতে পারে নির্বাচনের সবচেয়ে বড় গেম চেঞ্জার বলে মনে করছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মহল।



