বিদায় ২০২৫, প্রত্যাশার পথে ২০২৬, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজে নতুন আশার বছর
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৮ এএম
নানা ঘটনাপ্রবাহ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক চাপ ও সামাজিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে আরেকটি বছর পেরিয়ে ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নিয়েছে ২০২৫। বিদায়ী বছরের অভিজ্ঞতা পেছনে রেখে নতুন আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে সামনে এগিয়ে এসেছে ২০২৬। নতুন বছরকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজজীবনে রয়েছে বড় ধরনের প্রত্যাশা। বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ। রাজনীতির নানা সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত বিশ্লেষক ও বোদ্ধা মহল।
২০২৫ সালজুড়ে দেশের রাজনীতিতে নির্বাচন ছিল সবচেয়ে আলোচিত ও সংবেদনশীল ইস্যু। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, আন্দোলন-সমাবেশ এবং জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপ ও সুপারিশ দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, অংশগ্রহণমূলক ভোট এবং গণতান্ত্রিক চর্চা নিশ্চিত করার প্রশ্নে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাবি মিলিয়ে বছরজুড়েই রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল উত্তপ্ত, একই সঙ্গে সচেতন নাগরিক আলোচনায় মুখর।
নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও ছিল বিস্তর আলোচনা। পাশাপাশি রাজনীতিতে সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান উঠে এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। নতুন বছর ২০২৬-এ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আস্থার পরিবেশ ফিরবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সাধারণ মানুষের কণ্ঠে।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক দিক থেকেও ২০২৫ ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা একটি বছর। মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যহীনতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে। তবে একই সঙ্গে প্রবাসী আয়, কৃষি উৎপাদন এবং রপ্তানি খাতে ঘুরে দাঁড়ানোর কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিতও দেখা গেছে। সরকার বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা চালিয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার ওঠানামার মধ্যেও প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্বস্তি দিয়েছে। রেমিট্যান্স শুধু জাতীয় অর্থনীতিকেই শক্তিশালী করে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখা, দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবারগুলোর জীবনমান উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখে। সরকারি প্রণোদনা ও বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহ দেওয়ার ফলে প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক ধারা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সবশেষ তথ্যমতে, চলতি ডিসেম্বরে ২৯ দিনে দেশে এসেছে প্রায় ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয়, যা ডলার সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর দিন শেষে দেশের গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম–৬ হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো দেশের রিজার্ভ ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২১ সালের আগস্টে তা সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এরপর আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং চলতি হিসাব ঘাটতির কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ে। সংকট সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রি শুরু করলে ধীরে ধীরে রিজার্ভ কমতে থাকে।
সামাজিক ক্ষেত্রে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা আরও জোরালো হয়েছে। তরুণ সমাজের বড় অংশ কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, স্টার্টআপ সংস্কৃতি এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির প্রচেষ্টা আগামী দিনের বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল শুধু আরেকটি ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যাওয়ার গল্প নয়। এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক চর্চা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে। বিদায় ২০২৫—তোমার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাগত জানাই নতুন বছর ২০২৬-কে, যেখানে আশা, দায়িত্ব ও সম্ভাবনার এক নতুন অধ্যায় অপেক্ষা করছে বাংলাদেশের জন্য।



