১০ মাসে রাকসুর ৪২ কর্মসূচি
১ কোটি ২৯ লাখ টাকার মধ্যে ভাউচার নেই ৬২ লাখেরই
রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৬ এএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) বর্তমান কমিটি ১০ মাসে ৪২ কর্মসূচি বাবদ তহবিল থেকে খরচ করেছে ১ কোটি ২৯ লাখ ১৪ হাজার ৬৮৯ টাকা। এগুলোর মধ্যে তিন কর্মসূচি চলমান থাকলেও বাকিগুলো আগেই শেষ হয়েছে। এরপরও ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৮ টাকার বিল বা ভাউচার জমা দেননি সম্পাদকরা। অথচ নিয়ম হচ্ছে কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি জমা দেওয়া। তাৎক্ষণিকভাবে জমা না দেওয়ায় এ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত কোষাধ্যক্ষ কার্যালয়ের নথি বিশ্লেষণে এসব তথ্য জানা যায়।
জিএস আম্মার জমা দেননি ১৮ লাখ টাকার হিসাব : রাকসুর সবচেয়ে বেশি খরচ করেছেন জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার। তিনি সাত ধাপে ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ লাখ ৩৯ হাজার টাকা খরচের ভাউচার জমা দেননি। জিএস আম্মার বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষার বুথ বসানো ৩ লাখ ২ হাজার টাকা ছিল প্রথমদিকের বাজেট। তখন ব্যয়ের ওপর ভ্যাট যোগ করার বিষয়টি জানা ছিল না। ফলে এই হিসাব সমন্বয় করে বিল করা একটু সমস্যা হয়েছে। ছাত্র সাংসদদের জন্য নেওয়া ১৩ লাখ ৭৭ হাজার টাকার মধ্যে বিজ্ঞান সম্পাদকের হিসাব না আসায় বিলটি জমা দেওয়া হয়নি। বাকি হিসাব জমা দেওয়া হয়েছে।’
ভিপি ১৩ লাখের মধ্যে হিসাব দিয়েছেন মাত্র ৯৯ হাজারের : ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ ৬ ধাপে ১৩ লাখ ৪০ হাজার ৩২৪ টাকা নিয়েছেন। ১২ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ টাকার হিসাব দেননি তিনি। এর মধ্যে গত ১৩ এপ্রিল ভিপি দেড় লাখ টাকার দাপ্তরিক খরচ নেন। এর হিসাব না দিয়েই ১৯ জুলাই ফের দাপ্তরিক খরচ ২ লাখ টাকা নিয়েছেন। ভিপি মোস্তাকুর বলেন, ‘একেবারে কোনো বিল জমা দেওয়া হয়নি বিষয়টি এমন নয়। এটি দ্রুত দেওয়া ভালো। তবে মেয়াদের মধ্যে জমা দিলেও হবে। আমাদের মেয়াদের এখনও ৬০ দিন বাকি।’
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খরচ ক্রীড়া সম্পাদকের : জিএসের পরেই সর্বোচ্চ ব্যয় করেছেন ক্রীড়া সম্পাদক মোছা. নার্গিস খাতুন। তিনি ৭ ধাপে ১৫ লাখ ৭১ হাজার ৬২৬ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৯৭ হাজার ১২৬ টাকার ভাউচার জমা দেননি তিনি। তবে গত মাসে শুরু হওয়া ছয় কর্মসূচির ‘রাকসু গেমস’ চলমান থাকায় এই বিল জমা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন সম্পাদক নার্গিস খাতুন।
অন্যরা কে কত নিলেন : বিতর্ক ও সাহিত্য সম্পাদক ইমরান লস্কর ৬ ধাপে ৮ লাখ ৪২ হাজার ৭৬৫ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ২টি ভাউচার জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমার বাজেট অনেকগুলো সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে করতে হয়। ফলে দুটি কর্মসূচি বিল জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমি আজকে বা কালকে বিলগুলো জমা দেব। সংস্কৃতি সম্পাদক জাহিদ হোসেন জোহা ৩ ধাপে ৭ লাখ ৯৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান উদ্যাপন বাবদ নেওয়া ৪ লাখ ৬৫ হাজার টাকার কোনো ভাউচার জমা দেননি। তবে ভাউচার জমা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুল সাকিব ৩ ধাপে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার সবশেষ বাজেটের হিসাব দেওয়া হয়নি। সব হিসাব বুঝে নিয়ে কাল-পরশু বিল জমা দিয়ে দেব।’ মিডিয়া ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. মুজাহিদ ইসলাম ৩ ধাপে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৪৪৮ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে প্রকাশনার জন্য নেওয়া ১ লাখ টাকার ভাউচার জমা হয়নি। মহিলাবিষয়ক সম্পাদক সায়িদা হাফসা ২ ধাপে ১ লাখ ৮৮ হাজার ২৭৬ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকার হিসাব জমা পড়েনি। তিনি বলেন, ‘কালই জমা দিয়ে দেব।’
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক তোফায়েল আহমেদ তোফার ২ ধাপে নেওয়া ৮৭ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে ৩৭ হাজার ৫০০ টাকার হিসাব জমা পড়েনি। পরিবেশ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ কোনো খাত না দেখিয়েই ৮২ হাজার টাকা নিয়েছেন। তবে তিনি এর কোনো হিসাব দেননি। এজিএস এস এম সালমান সাব্বির গত ৫ মার্চ ৬০ হাজার টাকা দাপ্তরিক খরচ নেন। তবে এর হিসাব তিনি দেননি।
কর্তৃপক্ষ যা বলছেন : রাকসুর সাবেক নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, কোনো সরকারি ব্যয় অগ্রিম নেওয়া হলে, সেখানে নির্ধারিত তারিখে হিসাব সমন্বয়ের শর্ত থাকে। একটি বিল সমন্বয়ের পরেই কেবল দ্বিতীয় ধাপের টাকা উত্তোলন করা যায়। কোনো সম্পাদক আগের বিলের হিসাব সমন্বয় ছাড়া পরবর্তী বিল উত্তোলন করলে সেখানে নির্দ্বিধায় আর্থিক অনিয়ম হয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি সম্পাদকীয় পদের বিপরীতে একদম মানে ফিক্সড বরাদ্দ দেওয়া থাকবে। সব অর্থের হিসাব রাকসুর সভায় উপস্থাপন করতে হবে, যেখানে সভাপতি ও কোষাধ্যক্ষ উপস্থিত থাকবেন। তাদের কাজ এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা এবং অনিয়ম হলে ফাইল আটকে দেওয়া। শিক্ষার্থীরা ভুল করতে পারেন। তবে কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব বিষয়টি মনিটরিং করা।
অনেক বিল জমা না পড়ার তথ্য স্বীকার করে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, ‘আসলে যে কোনো কর্মসূচি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাউচার জমা দেওয়া উচিত। আমরা তাদের সঠিক নিয়মে জমা দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছি।’
উপাচার্য ও রাকসু সভাপতি অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলছেন, প্রতিটি সভায় হিসাবের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে মনে করিয়ে দিয়েছি। প্রতিনিধিরা সময় চেয়েছেন। রাকসুকে অবশ্য প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে।



